প্রথম আলোর ‘জঙ্গি’ ন্যারেটিভ: পুরনো কৌশলের নতুন রূপ
ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এবং সামগ্রিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চলছে। কিন্তু ঠিক এই সংবেদনশীল সময়ে প্রথম আলোর মতো প্রভাবশালী গণমাধ্যমে ‘জঙ্গি’ শব্দটির সুকৌশলী ও বারবার ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তাদের সতর্ক, নিয়ন্ত্রিত ও প্রেক্ষাপটসম্মত বক্তব্যকে শিরোনাম ও প্রতিবেদনে এমনভাবে ফ্রেম করা হচ্ছে যে, তা পুরনো আওয়ামী লীগ আমলের ‘জঙ্গি তকমা’র ন্যারেটিভকে পুনরুজ্জীবিত করছে।
মন্ত্রী ও উপদেষ্টার বক্তব্যের বিকৃত উপস্থাপনা
এপ্রিলের শেষভাগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কোস্টগার্ড অনুষ্ঠানে স্পষ্টভাবে বলেন, তিনি ‘জঙ্গি’ শব্দটিকে রিকগনাইজ করেন না। দেশে সংগঠিত জঙ্গি তৎপরতা নেই, শুধু সব দেশেই থাকা উগ্রপন্থী গ্রুপের মতো কিছু উপাদান আছে। তিনি এটিকে ফ্যাসিবাদী আমলের রাজনৈতিক হাতিয়ার বলে অভিহিত করেন।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে জঙ্গি সমস্যাকে অতিরঞ্জিত করে ক্ষমতা ধরে রাখার ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের ‘জঙ্গি নেই’ বক্তব্যও চরমপন্থী ছিল। দেশে সীমিত মিলিট্যান্সি আছে, সরকার তা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনবে — তবে এটি এমন ঝুঁকি নয় যে ভয় পেতে হবে।
প্রথম আলো এসব বক্তব্যকে শিরোনামে “দেশে জঙ্গি আছে”, “জঙ্গি শব্দ রিকগনাইজ করেন না”, “জঙ্গি সমস্যা মোকাবিলায়...” ইত্যাদি করে এমনভাবে উপস্থাপন করছে যে, পাঠকের মনে জঙ্গি উপস্থিতির একটি স্থায়ী ধারণা তৈরি হয়। মূল বক্তব্যের সূক্ষ্মতা (অতিরঞ্জনের সমালোচনা ও বর্তমানে তৎপরতা নেই) চাপা পড়ে যাচ্ছে।
বৃহত্তর উদ্দেশ্য: আন্তর্জাতিক ন্যারেটিভ ও রাজনৈতিক এজেন্ডা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশলের পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক লাভের চেয়েও বৃহত্তর উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
প্রথমত, বিরোধী দল দমনের পুরনো খেলা। আওয়ামী লীগ আমলের মতো ইসলামী রাজনৈতিক দল, ছাত্র-যুব সংগঠন এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডকে ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে কোণঠাসা করা। এতে নতুন সরকারকে চাপে ফেলে কঠোর পদক্ষেপ নিতে উস্কানি দেওয়া হয়, যাতে সরকার জনপ্রিয়তা হারায়।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশকে আস্তে আস্তে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জঙ্গিবাদী দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা। পশ্চিমা দেশ, দাতা সংস্থা ও বিনিয়োগকারীদের মনে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। এটি দেশের ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং নতুন সরকারের উন্নয়ন এজেন্ডাকে বাধাগ্রস্ত করবে।
তৃতীয়ত, পলাতক আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এবং ভারতীয় মিডিয়া-কূটনৈতিক ন্যারেটিভকে কৌশলে প্রতিষ্ঠিত করা। আওয়ামী লীগের পতনের পর যে ‘জঙ্গি উত্থানের’ ভয় দেখানো হয়েছিল, সেই একই বয়ানকে দেশীয় মাধ্যমের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া। এতে আওয়ামী লীগকে আবার ‘স্থিতিশীলতার রক্ষক’ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হয় এবং ভারতের আঞ্চলিক এজেন্ডা সহায়তা পায়।
গণমাধ্যমের দায়িত্ব ও নৈতিকতা
প্রথম আলোর মতো প্রভাবশালী গণমাধ্যমের দায়িত্ব হওয়া উচিত নিরপেক্ষ তথ্য পরিবেশন ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট শব্দকে বারবার এমনভাবে ব্যবহার করা, যা রাজনৈতিক এজেন্ডা সেবা করে এবং দেশের আন্তর্জাতিক ইমেজ ক্ষুণ্ণ করে, তা গণমাধ্যমের পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে। এটি শুধু সরকারের নয়, পুরো জাতির বিরুদ্ধে একটি অদৃশ্য অপপ্রচারের অংশ বলে মনে হয়।
সবশেষে, নতুন সরকার দেশকে স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এমন সময়ে পুরনো বিভেদমূলক ন্যারেটিভ ফিরিয়ে আনা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। সরকারের উচিত তথ্যের স্বচ্ছতা ও দ্রুত জবাবের মাধ্যমে এ ধরনের প্রচারণা মোকাবিলা করা। গণমাধ্যমকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে যাতে তারা অজান্তে বিদেশি বা পলাতক শক্তির এজেন্ডার হাতিয়ার না হয়। জনগণেরও দায়িত্ব মূল বক্তব্য যাচাই করে শিরোনামের ফাঁদ এড়ানো। দেশের স্থিতিশীলতা সবার উপরে — এই চেতনায় সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment