Showing posts with label চলমান ইস্যু. Show all posts
Showing posts with label চলমান ইস্যু. Show all posts

পরীক্ষার খাতায় পাওয়া নম্বর তোমার পুরো জীবন নয়


পরীক্ষার খাতার কয়েকটি সংখ্যা তোমার পুরো জীবন নয়

প্রিয় এসএসসি পরীক্ষার্থী,

আজ হয়তো তোমার হাতে ফলাফল এসেছে। কারও মুখে হাসি, কারও চোখে জল। কেউ জিপিএ-৫ পেয়েছে, কেউ প্রত্যাশার চেয়ে কম পেয়েছে, আবার কেউ হয়তো ফেলও করেছে।

যে ছেলেটা বা মেয়েটা আজ মনে করছে—“আমার জীবন শেষ”, তাকে একটা কথা বলতে চাই:

না, জীবন শেষ হয়নি। বরং জীবনের আসল পরীক্ষাগুলো এখনো শুরুই হয়নি।

এসএসসির ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ—এটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ভালো ফলাফল তোমাকে কিছু দরজা খুলে দিতে পারে। কিন্তু একটা পরীক্ষার ফলাফল তোমার বুদ্ধি, সৃজনশীলতা, সাহস, নেতৃত্ব, পরিশ্রম কিংবা ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি মাপতে পারে না।

ইতিহাসের দিকে তাকাও।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথাগত স্কুলশিক্ষার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। তিনি নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করেননি; ইংল্যান্ডে গিয়েও তাঁর আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষ হয়নি। অথচ সেই মানুষটিই পরে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে নিয়ে গেলেন এবং ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন।

বিল গেটস হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু ডিগ্রি শেষ না করেই বেরিয়ে আসেন। সেই সিদ্ধান্তের পর তিনি মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রযুক্তি জগতের অন্যতম প্রভাবশালী উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন।

আরেকটি দারুণ উদাহরণ উইনস্টন চার্চিল। সামরিক কলেজ স্যান্ডহার্স্টে ভর্তি হওয়ার পরীক্ষায় তিনি প্রথমবার ব্যর্থ হন; শেষ পর্যন্ত তৃতীয় চেষ্টায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে তিনিই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন।

আলবার্ট আইনস্টাইন সম্পর্কেও একটি প্রচলিত গল্প আছে যে তিনি স্কুলে ফেল করতেন। আসল ঘটনা এতটা সরল নয়। ১৮৯৫ সালে জুরিখের পলিটেকনিকে ভর্তি পরীক্ষায় তাঁর কিছু বিষয়ে প্রয়োজনীয় ফল হয়নি; পরে আরাউয়ের স্কুলে পড়াশোনা করে তিনি পরের বছর যোগ্যতা অর্জন করেন এবং পলিটেকনিকে ভর্তি হন। অর্থাৎ একটি পরীক্ষার ধাক্কা তাঁর ভবিষ্যৎ থামিয়ে দিতে পারেনি।

জ্যাক মা-ও জীবনে পরীক্ষার ব্যর্থতা ও প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় তিনি দুইবার ব্যর্থ হওয়ার পর তৃতীয়বার উত্তীর্ণ হন। পরে ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে আলিবাবা প্রতিষ্ঠা করেন।

আর আমাদের দেশের মো. আবদুল হামিদ—যিনি পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন—তাঁর ক্ষেত্রেও মনে রাখা দরকার, তিনি কিন্তু সব পরীক্ষায় তৃতীয় বিভাগ পাওয়া একজন শিক্ষার্থী ছিলেন।  তাঁকে দেখলে মনে হয়, জীবনের সাফল্য শুধু পরীক্ষার নম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; দীর্ঘ সংগ্রাম, রাজনীতি, নেতৃত্ব ও মানুষের জন্য কাজ করাও একজন মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে।

তাই আজ যারা এসএসসিতে প্রত্যাশিত ফল পাওনি, তাদের বলছি—

নিজেকে একটি রেজাল্ট দিয়ে বিচার করো না।

তুমি হয়তো গণিতে দুর্বল, কিন্তু তুমি অসাধারণ একজন লেখক হতে পারো।
তুমি হয়তো ইংরেজিতে কম নম্বর পেয়েছ, কিন্তু তুমি অসাধারণ উদ্যোক্তা হতে পারো।
তুমি হয়তো পরীক্ষার হলে ভালো করতে পারোনি, কিন্তু বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা তোমার অসাধারণ হতে পারে।

আজকের ফলাফল তোমার অবস্থা জানায়; তোমার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না।

তবে একটা কথা মনে রেখো—এই গল্পগুলো শুনে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কোনো কারণ নেই। রবীন্দ্রনাথ, বিল গেটস বা জ্যাক মার মতো মানুষের গল্পের শিক্ষা “পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ নয়” নয়; শিক্ষা হলো একটি ব্যর্থতা বা একটি প্রথাগত পথের সঙ্গে নিজেকে আটকে রেখো না। সফল মানুষরা নিজেদের শক্তি খুঁজে নিয়ে বছরের পর বছর পরিশ্রম করেছেন। কলেজ ড্রপআউটদের সাফল্য ব্যতিক্রম; শুধু ড্রপআউট হওয়া নিজে কোনো সাফল্যের সূত্র নয়।

তাই আজ যদি তোমার ফলাফল খারাপ হয়, একটু কাঁদতে ইচ্ছে করলে কেঁদে নাও। মন খারাপ হলে মন খারাপ করো। কিন্তু নিজেকে হেরে যাওয়া মানুষ ভাববে না।

কারণ তোমার সামনে এখনো কলেজ আছে।
বিশ্ববিদ্যালয় আছে।
দক্ষতা শেখার সুযোগ আছে।
ব্যবসা করার সুযোগ আছে।
চাকরি আছে।
সৃজনশীলতা আছে।
হাজারো নতুন মানুষ ও নতুন অভিজ্ঞতা আছে।

সবচেয়ে বড় কথা—

তোমার সামনে এখনো পুরো জীবন পড়ে আছে।

এসএসসির রেজাল্ট তোমার জীবনের একটি অধ্যায় মাত্র।
এটা পুরো বই নয়।

আজ যে ফলাফল দেখে তুমি নিজেকে ছোট ভাবছ, একদিন হয়তো পেছনে ফিরে তাকিয়ে বলবে—

“সেদিন আমি ভেবেছিলাম আমি হেরে গেছি। আসলে সেদিনই আমার নতুন করে শুরু হয়েছিল।”

তাই মাথা উঁচু করো।

ফলাফলকে মেনে নাও, ভুল থেকে শেখো, নিজের দুর্বলতা ঠিক করো এবং নতুন করে শুরু করো।

কারণ জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এসএসসি নয়—
জীবন যখন তোমাকে বারবার পড়ে যেতে বলবে, তখন তুমি কতবার উঠে দাঁড়াতে পারো, সেটাই আসল পরীক্ষা।

জ্যোতিকা জ্যোতির কান্না: অনুশোচনা, না কৌশল?

 


জ্যোতিকা জ্যোতির কান্না: অনুশোচনা, না কৌশল?

সোমবার সন্ধ্যায় ফেসবুক লাইভে অঝোরে কাঁদলেন অভিনেত্রী জ্যোতিকা জ্যোতি। বললেন, তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। কাজ পাচ্ছেন না। নানা মহল থেকে পরিকল্পিতভাবে একঘরে করা হচ্ছে। এমনকি বলে ফেললেন, “এই বাংলাদেশে জন্ম নিয়েই ভুল করেছি।” কান্নায় ভেঙে পড়া এই দৃশ্য অনেককে নাড়া দিয়েছে। কেউ সহানুভূতি জানিয়েছেন। কেউ বলেছেন, এটা আসল অনুশোচনা। আবার কেউ সন্দেহ করেছেন—এটা কি সত্যিকারের অনুতাপ, নাকি পরিস্থিতির চাপে তৈরি এক কৌশল?

প্রশ্নটা সহজ নয়। জ্যোতিকা জ্যোতি শুধু একজন অভিনেত্রী ছিলেন না। আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। সেই সুবাদে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরিচালকের পদ পেয়েছিলেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও তিনি সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। পটপরিবর্তনের পর সেই অবস্থানের মূল্য তাকে দিতে হয়েছে। শিল্পকলা থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছে। কাজ কমেছে। সমালোচনার মুখে পড়েছেন। এখন কান্না।

কান্না মানুষের স্বাভাবিক আবেগ। মানসিক চাপে কেউ ভেঙে পড়তেই পারে। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। তিনি দায় স্বীকার করছেন না। নিজের অতীত অবস্থান নিয়ে কোনো স্পষ্ট অনুতাপ প্রকাশ করছেন না। বরং নিজেকে শিকার হিসেবে উপস্থাপন করছেন। “আমাকে একঘরে করা হচ্ছে”—এই বয়ান বারবার আসছে। কিন্তু কেন একঘরে হচ্ছেন, সেই প্রশ্নের উত্তর তিনি দিচ্ছেন না। যে রাজনৈতিক শক্তির ছায়ায় তিনি সুবিধা নিয়েছিলেন, সেই শক্তির পতনের পর এখন শুধু কান্না।

এখান থেকে শেখার কিছু আছে। ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যখন সুবিধা এনে দেয়, তখন অনেকেই নীতি-নৈতিকতার হিসাব করেন না। কিন্তু ক্ষমতা চলে গেলে সেই ঘনিষ্ঠতাই বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। জ্যোতিকা জ্যোতির কান্না সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। অনুশোচনা যদি সত্যি হয়, তাহলে দায় স্বীকার করতে হয়। ভুল স্বীকার করতে হয়। শুধু কান্না আর আত্মকেন্দ্রিক ব্যথার প্রকাশ যথেষ্ট নয়।

মানুষ কান্না দেখে সহানুভূতি জানাতে পারে। কিন্তু দায় এড়িয়ে যাওয়া কান্না সহজে বিশ্বাসযোগ্য হয় না। জ্যোতিকা জ্যোতির এই আবেগপ্রবণ মুহূর্ত তাই প্রশ্ন তুলেছে—এটা কি সত্যিকারের অনুশোচনা, নাকি পরিস্থিতি সামলানোর এক কৌশল? উত্তরটা সময়ই দেবে। তবে এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে, তাতে দায় স্বীকারের কোনো ইঙ্গিত নেই। আর দায় স্বীকার না থাকলে কান্না শুধু কান্নাই থেকে যায়।

২০০৫ ও ২০২৬: একই ষড়যন্ত্রের পুনরাবৃত্তি

 ২০০৫ ও ২০২৬: একই ষড়যন্ত্রের পুনরাবৃত্তি

মনে আছে? ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলা হয়েছিল?  সম্প্রতি আবারো বিএনপি সরকারের আমলে ঘটে যাওয়া মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনে পাওয়া গেল ছাতার ভেতর বোমা, আশুলিয়ায় পাওয়া গেল প্রেশার কুকারভিত্তিক আইইডি। শুধু তাই নয় এরপর ০১ আগস্ট মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনে পাওয়া গেল বিস্ফোরক। এ ঘটনাগুলোর মধ্যে এক গভীর যোগসূত্র রয়েছে। উভয় সময়েই নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে অস্থিতিশীল করা, রাষ্ট্রকে অকার্যকর দেখানো এবং জনমনে ভয় ও নৈরাজ্য সৃষ্টির সুনির্দিষ্ট চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়।

২০০৫ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন একদিনে ৬৩ জেলায় বোমা হামলা চালানো হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চীন সফরে থাকাকালীন এই হামলা সংঘটিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল দেশের ভেতরে ও বাইরে এই বার্তা দেওয়া যে সরকার দেশ চালাতে ব্যর্থ এবং উগ্রপন্থীরা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। সরকারকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোণঠাসা করা এবং চরম বিপর্যয় সৃষ্টি করাই ছিল মূল লক্ষ্য।

২০২৬ সালে দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিএনপি সরকার গঠনের পর আবারও একই ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদলের সফর চলাকালীন সময়ে এসব ঘটনা ঘটানো হয়। নির্বাচিত সরকারকে অর্থনৈতিক সংকট, বিদেশি বিনিয়োগে নিরুৎসাহ এবং সামাজিক অস্থিরতার মুখে ঠেলে দিয়ে জনমনে অসন্তোষ তৈরি করাই এই চক্রের প্রধান উদ্দেশ্য। এটি ২০০৫ সালের নাশকতারই আধুনিক ও পরিমার্জিত রূপ।

পতিত আওয়ামী লীগ এবং তাদের দোসররা বর্তমানে গণতান্ত্রিক ধারাকে বাধাগ্রস্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। সরকার যাতে সফলভাবে রাষ্ট্র সংস্কার ও জনকল্যাণমূলক কাজ করতে না পারে, সেজন্য গোপন বৈঠক, সাইবার প্রোপাগান্ডা এবং অস্থিরতামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। ২০০৫ সালে যেমন উগ্রপন্থীদের ব্যবহার করা হয়েছিল, তেমনি এখনও দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পেছনে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। সাধারণ বস্তুর আড়ালে বিস্ফোরক গোপন করার কৌশল জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া যাচাইয়ের ইঙ্গিত দেয়।

একইসঙ্গে কিছু শত্রুভাবাপন্ন বিদেশি শক্তিও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে চলেছে। ২০০৫ সালে বিএনপি সরকারকে চাপে ফেলতে উগ্রবাদের জুজু ব্যবহার করা হয়েছিল। এখনও সেই একই শক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের ভোটাধিকারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সরকারকে সহ্য করতে পারছে না। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করার পেছনে পর্দার আড়ালে অর্থায়ন ও লজিস্টিক সাপোর্টের অভিযোগ রয়েছে। তাদের লক্ষ্য বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করে নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করা।

২০০৫ সালের বোমা হামলা এবং ২০২৬ সালের চলমান ঘটনা দুটোই একই সূত্রে গাঁথা। পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তি এবং তাদের মদদদাতা বিদেশি শক্তি যখনই জাতীয়তাবাদী সরকার ক্ষমতায় আসে, তখনই সন্ত্রাস, নাশকতা ও অস্থিরতার পথ বেছে নেয়। তবে ২০০৫ সালের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বর্তমান সরকার ও সচেতন জনগণ এ ধরনের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ।

পতিত শক্তির পুরনো খেলা, নাকি নতুন নাশকতা?

পতিত শক্তির পুরনো খেলা, নাকি নতুন নাশকতা? ৩০ জুলাই ২০২৬ সন্ধ্যায় আশুলিয়ার খেজুর বাগান এলাকার একটি মুদি দোকানের সামনে পরিত্যক্ত একটি ব্যাগ থেকে উদ্ধার হয় প্রাণঘাতী প্রেশার কুকার বোমা। ব্যাগটি রেখে যাওয়া ব্যক্তি কোমল পানীয় কিনতে এসে বড় নোট দিয়ে খুচরার অপেক্ষায় না থেকে চলে যান। পরে স্থানীয়রা ব্যাগ খুলে দেখেন কালো টেপে মোড়ানো প্রেশার কুকার, ভেতরে বিস্ফোরক পদার্থ ও অসংখ্য বেয়ারিং বল। পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণে সেটি ধ্বংস করে। এর মাত্র এক সপ্তাহ আগে, ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে আরেকটি উন্নত আইইডি উদ্ধার হয়। পরিত্যক্ত ছাতার ভেতরে লুকানো পাইপ বোমায় ছিল সালফার, বেয়ারিং বল, ব্যাটারি ও সার্কিট—ছাতা খুললেই বিস্ফোরণ ঘটার ব্যবস্থা। সে সময় কাছাকাছি রাস্তায় রথযাত্রার শোভাযাত্রা চলছিল। বোমাটি নিষ্ক্রিয়করণের সময় একজন পথচারী আহত হন। দুটি ঘটনাই জনবহুল স্থানে, দুটিই অজ্ঞাত ব্যক্তির রেখে যাওয়া এবং সৌভাগ্যক্রমে বিস্ফোরণের আগে শনাক্ত হওয়া আইইডি। এধরনের বোমা পাওয়ার ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এঘটনা দুটো মনে করিয়ে দেয় ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতি। সেদিন জেএমবি মাত্র আধাঘণ্টার মধ্যে দেশের ৬৩ জেলায় প্রায় ৫০০টি বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। কিন্তু পার্থক্য আছে। সেদিনেরটা ছিল দেশব্যাপী সমন্বিত হামলা, দায় স্বীকার করেছে, হামলার ঘটনায় ছিল লিফলেট।

আজকের ঘটনাদুটো এখন পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন। কেউ দায়ও স্বীকার করেনি।

সময়ের প্রেক্ষাপট যদিও ভিন্ন কিন্তু কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। জাতীয় নির্বাচন শেষ, বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই এ ধরনের বিস্ফোরক উদ্ধার হচ্ছে। আর ঠিক এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর ঢাকায় অবস্থান করছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করছেন। এই সময়ে আইইডি উদ্ধার কি নিছক কাকতালীয়? প্রশ্ন উঠছে—পতিত আওয়ামী লীগ কি আবার জঙ্গি কার্ড খেলতে চাইছে? দেশে অস্থিরতার ছবি তুলে ধরে নতুন সরকারকে চাপে ফেলতে এবং আন্তর্জাতিক মহলে নেতিবাচক বার্তা দিতে চাইছে কি? ফ্যাসিস্টের পুরনো জঙ্গি কার্ড আর কতদিন চলবে? নাকি অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তি বা স্বার্থগোষ্ঠী সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল হিসেবে প্রকাশ করতে চাইছে? জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা কি চলছে? প্রেশার কুকার বা ছাতার নিয়ে পাওয়া আইইডি তৈরি সাধারণ অপরাধীর কাজ নয়। এতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও পরিকল্পনা লাগে। জনবহুল স্থান ও গুরুত্বপূর্ণ সময় বেছে নেওয়া থেকে বোঝা যায়, উদ্দেশ্য শুধু প্রাণহানি নয়—আতঙ্ক সৃষ্টি ও রাষ্ট্রকে দুর্বল হিসেবে তুলে ধরা। সরকারের সামনে এখন বড় পরীক্ষা দ্রুত, স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত করা। না হলে জনমনে ধারণা জন্মাতে পারে যে আইনশৃঙ্খলা আবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। যতক্ষণ দায়ীদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট না হচ্ছে, ততক্ষণ প্রশ্ন থেকেই যাবে—এটি কি নতুন জঙ্গি তৎপরতা, নাকি পরিকল্পিত রাজনৈতিক নাশকতা?

Fallen Forces or New Game? Questions Behind the Recent IED Discoveries Is Someone Trying to Destabilise the New Government?

Fallen Forces or New Game? Questions Behind the Recent IED Discoveries

Is Someone Trying to Destabilise the New Government?

On the evening of 30 July 2026, a man in his early thirties entered a small grocery shop in the Khejur Bagan area of Ashulia. He asked for a soft drink, handed over a large note, and left when the shopkeeper went looking for change. Before disappearing, he placed a locked bag on a bench outside. Hours later, suspicious locals forced the bag open. Inside was a pressure cooker tightly wrapped in black adhesive tape, packed with explosive compound and bearing balls. It was designed to kill and maim. The police Bomb Disposal Unit later destroyed it in a controlled explosion.

Just a week earlier, on 24 July, another sophisticated improvised explosive device (IED) was found beneath Motijheel Metro Rail Station. Concealed inside an abandoned umbrella, the pipe bomb contained sulphur, bearing balls, batteries and a circuit rigged to detonate if the umbrella was opened. A reverse Rath Yatra procession was passing nearby at the time. One passer-by was injured during the controlled disposal.

Two advanced IEDs in public places within days of each other. Both recovered before detonation. Both left by unidentified individuals who vanished into the crowd.

The method evokes darker chapters. In August 2005, Jama’atul Mujahideen Bangladesh (JMB) detonated nearly 500 bombs almost simultaneously across 63 of the country’s 64 districts within roughly thirty minutes. Government buildings, courts and public places were targeted. Leaflets demanding Islamic rule were left at many sites. Two people were killed and more than a hundred injured, but the psychological impact was enormous.

Yet today’s pattern is different. The 2005 attacks were nationwide, highly coordinated, and publicly claimed by the militant group Jama'atul Mujahideen Bangladesh (JMB). The serial bombings of 17 August 2005 triggered widespread fear and were widely seen as an attempt to undermine public confidence in the government's ability to maintain security. The 2026 devices are isolated, carefully constructed for maximum local damage, and abandoned rather than detonated in a timed wave. No group has claimed responsibility. No leaflets. No manifesto. Only silent placement and disappearance.

The timing is different too. The election is over. The BNP is in power. Soon after the new government assumed office, such explosive devices have appeared in the capital and its outskirts, raising serious concern. The question arises—are these merely a resurgence of militant activity, or is there a deeper political calculation at work?

Awami League, other opposition forces, or some foreign power—who is behind this?

Is the fallen Awami League looking for opportunities to stage militant dramas? Does it want to show the people that the situation has become worse than before? After losing power, is it attempting to destabilise the new government through such provocative activities?

Or is this a strategy of other opposition parties or groups? Are they trying to demonstrate that the BNP government has failed to ensure public security? Is the plan to expose weaknesses in the new administration’s law-and-order management and create distrust among the people?

Or is something more complex at play—a foreign power or regional interest group seeking to muddy Bangladesh’s internal situation?

Pressure-cooker bombs and umbrella IEDs require a degree of technical knowledge and access to materials. Leaving them in busy commercial and transit zones suggests an intent less focused on striking high-value targets and more on terrorising ordinary people while highlighting vulnerabilities in the government’s security apparatus. The timing—post-election and close to a religious procession—adds another layer of ambiguity.

Bangladesh has lived through cycles of political violence and militant resurgence. The 2005 serial bombings forced a reckoning with domestic extremism. Today’s incidents are smaller in scale, yet more unsettling precisely because they feel both familiar and altered. Had they exploded, the devices could have caused serious casualties. That they did not is thanks to alert citizens and rapid police response. That they existed at all demands clearer answers than silence.

For the new government, the real test now is how quickly and transparently it can investigate these incidents and bring those responsible to account. Otherwise, a perception may take root that law and order is once again slipping out of control. Until the perpetrators are identified and the motive established, the question will linger: is this the beginning of a new campaign, a calculated provocation designed to put pressure on the new government, or something else entirely still taking shape in the shadows?

মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন: সমাজ কি চুপ থাকবে?


 মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন: সমাজ কি চুপ থাকবে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক ভয়াবহ চিত্র ভাইরাল হচ্ছে। কওমি মাদ্রাসার এক শিক্ষক ছোট ছোট শিশুদের বেধড়ক প্রহার করছেন—ভিডিওতে দেখা যায় নিরীহ শিশুদের কান্না, চিৎকার, আর নির্যাতনের দৃশ্য। আরেক জায়গায় শিক্ষক শিশুর মুখে বেত ঢুকিয়ে নির্যাতন করে নিজেই ভিডিও করে ফেসবুকে পোস্ট করেন, ক্যাপশনে লেখেন—‘পিচ্চি পোলাপানকে কান্না করাতে ভালোই লাগে’। নরসিংদীতে সাত বছরের শিশুকে গোসল করতে অনীহা প্রকাশের অজুহাতে এমন মারধর করা হয় যে শরীরে গভীর ক্ষত আর রক্তপাত হয়। পটুয়াখালী, কুষ্টিয়া, লক্ষ্মীপুর, সাভার—একের পর এক মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ উঠছে। শিক্ষকরা পালিয়ে যাচ্ছেন, শিশু নিখোঁজ হচ্ছে।

এসব চিত্র দেখেও সমাজ কি চুপ থাকবে?

ধর্মের নামে, শিক্ষার নামে এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে হাজার হাজার শিশু আশ্রয় নেয়। গরিব পরিবার তাদের সন্তানকে পাঠায় এই ভরসায় যে সেখানে ধর্মীয় শিক্ষা পাবে, খাবার-থাকার ব্যবস্থা হবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক জায়গায় সেই মাদ্রাসা পরিণত হয়েছে নির্যাতনের কেন্দ্রে। শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নিপীড়ন, এমনকি যৌন নির্যাতন—এসব এখন আর গোপন নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রমাণ করে দিচ্ছে কতটা ভয়াবহ পরিস্থিতি।

তবু সমাজ নীরব। কেউ বলে ‘সব মাদ্রাসা এক নয়’। কেউ বলে ‘এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা’। কেউ আবার সালিশের নামে মীমাংসা করে দায় এড়ায়। প্রশাসনও অনেক সময় ধীরগতির, মামলা হলেও আপস হয়ে যায়, অভিযুক্তরা ছাড়া পেয়ে যায়। ফলে নির্যাতনকারীরা সাহস পায় আরও। শিশুরা ভয় পেয়ে মুখ বন্ধ রাখে। পরিবারগুলো লজ্জায় বা চাপে নীরব থাকে।

এই নীরবতাই সবচেয়ে বড় অপরাধ। শিশু নির্যাতন কোনো ধর্মের অংশ নয়, কোনো শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ নয়। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। যে সমাজ শিশুর কান্না শুনেও চোখ বন্ধ করে রাখে, সে সমাজ নিজেই অসুস্থ। যে রাষ্ট্র শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, সে রাষ্ট্র ব্যর্থ।

এখন আর চুপ থাকার সময় নেই। মাদ্রাসাগুলোতে কঠোর মনিটরিং চাই। নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। শিশু সুরক্ষা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ চাই। ধর্মীয় নেতৃত্বকেও সোচ্চার হতে হবে—নির্যাতনকারীদের আড়াল না করে প্রকাশ্যে নিন্দা জানাতে হবে।

সোশ্যাল মিডিয়ার সেই রক্তাক্ত চিত্রগুলো শুধু ভিডিও নয়—এগুলো আমাদের সমাজের মুখোশ খুলে দিচ্ছে। এখন যদি আমরা চুপ থাকি, তাহলে আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা অপরাধী হিসেবেই চিহ্নিত হব। শিশুর নিরাপত্তা কোনো বিতর্কের বিষয় নয়। এটি মানবতার ন্যূনতম দাবি। সমাজ কি এবার জেগে উঠবে, নাকি আবার নীরবতায় ডুবে থাকবে?

সুহাস চাকমার বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভ: পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিরতার আড়ালে সত্য লুকিয়ে রাখার চেষ্টা


সুহাস চাকমার বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভ: পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিরতার আড়ালে সত্য লুকিয়ে রাখার চেষ্টা

সুহাস চাকমার সাম্প্রতিক ফেসবুক পোস্টটি পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতাকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করে উপস্থাপন করেছে। তিনি যে ‘ভ্রাতৃঘাতী হত্যাকাণ্ডের নীতি’ এবং ডিজিএফআই-সেনাবাহিনীর ষড়যন্ত্রের গল্প বুনেছেন, তা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একপেশে প্রচারেরই নতুন সংস্করণ মাত্র। এ ধরনের ন্যারেটিভ পার্বত্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে ব্যবহৃত হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সহিংসতার মূল উৎস হলো আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। ইউপিডিএফের বিভিন্ন উপদল এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে সংঘর্ষ নতুন কিছু নয়। একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, হত্যা, অপহরণ ও অস্ত্রের লড়াই নিয়মিত ঘটনা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও এ ধরনের সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটেছে, যেখানে এক গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে। সেনাবাহিনী বা ডিজিএফআইকে এসবের পেছনে দেখানো হলেও বাস্তবে এগুলো মূলত গোষ্ঠীগত সংঘাত।

সেনাবাহিনী ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পার্বত্য অঞ্চলে অভিযান চালায় সশস্ত্র তৎপরতা, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে। আইএসপিআরের বিবৃতিতে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, অভিযানের সময় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা গুলি চালালে সেনাবাহিনী আত্মরক্ষায় পাল্টা ব্যবস্থা নেয় এবং অস্ত্র উদ্ধার করে। এ ধরনের অভিযানের ফলে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। একে ‘ভ্রাতৃঘাতী হত্যাকাণ্ডের নীতি’ বলে চালিয়ে দেওয়া হলো বাস্তবতাকে উল্টে দেখানোর চেষ্টা।

ডিজিএফআইর নামে ভুয়া নথি বা পত্রকে কেন্দ্র করে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা যাচাইযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই উপস্থাপন করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার নামে এমন ভুয়া নথি যে কেউ কম্পিউটারে টাইপ করে প্রিন্ট করাতেই পারে। পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন গোষ্ঠীর নেতারা নিজেদের স্বার্থে এরকম নানা দলিল তৈরি বা প্রচার করে থাকেন। একজন নেতার অন্য গোষ্ঠীতে যোগ দেওয়া বা অভ্যন্তরীণ বিভেদকে রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র বলে চালিয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু তা সত্য প্রমাণ করে না। শ্যামল কান্তি চাকমা (তরু) নিজেই ডিজিএফআইয়ের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন। এ ধরনের অভ্যন্তরীণ ভাঙাগড়ার ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ বলে দেখানো হলো উদ্দেশ্যমূলক।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও উন্নয়নের স্বার্থে কাজ করে আসছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পর অঞ্চলটিতে উন্নয়নমূলক কার্যক্রম, পর্যটন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতাই স্থানীয় জনগণের জীবনকে অস্থির করে তোলে। সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনী যখন এসব তৎপরতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তখন তাকে ‘নিপীড়ন’ বলে প্রচার করা হয়। অথচ বাস্তবে এ ধরনের ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ত।

সুহাস চাকমার মতো ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে একতরফা অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেন। তাদের ন্যারেটিভে পার্বত্য অঞ্চলের জটিল বাস্তবতা, গোষ্ঠীগত সংঘাত এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তার প্রশ্ন প্রায় উপেক্ষিত থাকে। বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সকল সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অপ্রমাণিত অভিযোগ ও উসকানিমূলক প্রচার এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে মাত্র।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন বাস্তবসম্মত আলোচনা ও চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘাত বন্ধ এবং অস্ত্র নিষ্ক্রিয়করণই প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করে বিভ্রান্তি ছড়ানো কোনো সমাধান নয়—এটি শুধু অস্থিরতাকে উসকে দেয়।

জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে এবার জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি

 জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে এবার জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের প্রায় সাড়ে চার দশক পর সেই রহস্যের পর্দা উন্মোচনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক তৎকালীন মেজর মোজাফফর হোসেনকে (৭৭) দুই দিনের জন্য জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ট্রাইব্যুনাল-২-এ হাজিরের পর এই আদেশ দেওয়া হয়। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, প্রসিকিউশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে দুই দিনের জন্য জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা সুবিধাজনক সময়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন এবং সে অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি সেনা হেফাজতেই থাকবেন।

এর আগে মঙ্গলবার মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে প্রসিকিউশনের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল। চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছিলেন, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে মোজাফফর হোসেনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের সময় এবং ১/১১-এর ঘটনার সঙ্গেও তাঁর যোগসূত্র রয়েছে বলে তদন্ত সংস্থা প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে। সে কারণেই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। দুজনকে মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ জুলাই রাত সাড়ে দশটায় বনানীর একটি বাসা থেকে ডিবি তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিষয়টি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে জানানো হয় এবং পরদিন সন্ধ্যায় সেনাবাহিনীর মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি সেনা হেফাজতে রয়েছেন।

মোজাফফর হোসেন গত ১৬ বছর তৎকালীন সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের মতো এক যুগান্তকারী ঘটনার রহস্য উন্মোচনে এবার তাঁর জিজ্ঞাসাবাদ কতটা নতুন তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটা নিশ্চিত যে, দীর্ঘদিনের নীরবতার পর এখন এই মামলার তদন্ত নতুন মোড় নিচ্ছে।

এইচএসসির পরীক্ষার্থীদের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ আন্দোলন — নেপথ্যে কারা ছিল?

এইচএসসির পরীক্ষার্থীদের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ আন্দোলন — নেপথ্যে কারা ছিল? 

গত ১৪ জুলাই ২০২৬। ঢাকার সায়েন্স ল্যাব মোড় থেকে শুরু হয় এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে আন্দোলন। বন্যা, জলাবদ্ধতা আর প্রশ্নপত্রের ত্রুটি — সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক ক্ষোভ। কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চিত্র পুরোপুরি পাল্টে যায়। আন্দোলন আর শুধু পরীক্ষা নিয়ে রইল না। উঠে এল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের স্লোগান। মার্চ টু এডুকেশন মিনিস্ট্রি, সড়ক অবরোধ, দেশজুড়ে বিক্ষোভ।  

এখন বড় প্রশ্ন হলো সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাওয়ার পরও কেন আন্দোলন চলছিল? এখানেই দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ছায়া।

টেক্সট অন স্ক্রিন: “কে লাভবান হচ্ছে? কে উস্কানি দিচ্ছে?”

সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। চট্টগ্রাম বোর্ডের জন্য পুনঃপরীক্ষা, প্রশ্নের ভুলের নম্বর সমন্বয়, শিক্ষামন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ। তবু আন্দোলন থামেনি। কারণ এটি আর শুধু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নয় — এটি ম্যানুফ্যাকচার্ড আন্দোলন।   

এবার আসুন দেখে নেয়া যাক আন্দোলনের নেপথ্যে ছাত্র নামধারী রাজনৈতিক কর্মীরা কারা?

- আরিফুর রহমান ফয়সাল — নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি।  

- মোহনা আরিশা — নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেত্রী।  

- রুবাইয়া মেহজাবিন সুহী — মাইলস্টোন কলেজ থেকে বহিষ্কৃত, ছাত্রী পরিচয়ে নেতৃত্ব।  

- রেদোয়ান মাহিন — এনসিপির ছাত্রশক্তির সংগঠক, পরীক্ষার্থী নন।  

- কোভিদ হোসেন — ছাত্রশিবির নেতা।  

- তাহমিদ রহমান ও সিফাত হোসেন — ছাত্রশক্তি ও শিবিরের নেতা।  

প্রকৃত এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা অনেকেই আন্দোলনে ছিলেন না। অভিভাবকরা বলছেন, তাদের সন্তানরা পরীক্ষা দিয়ে সন্তুষ্ট। যারা পদত্যাগের স্লোগান দিচ্ছিলেন, তাদের বেশিরভাগই বহিরাগত রাজনৈতিক কর্মী। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগকে হাতিয়ার বানিয়ে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা।

কে লাভবান হচ্ছে? কে উস্কানি দিচ্ছে?  

অতীতের মতো আওয়ামী লীগের কিছু সমর্থক অনলাইনে উস্কানি দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা করছে। এনসিপি ও জামায়াতের ছাত্র সংগঠনগুলো পদত্যাগের দাবিতে চাপ বাড়াচ্ছে। দেশের বাইরে বসে কিছু অ্যাকটিভিস্ট ভুয়া খবর, পুরনো ভিডিও ও গুজব ছড়িয়ে আন্দোলনকে উত্তপ্ত করছে।  

শিক্ষামন্ত্রীর দোষ কী? কোচিং নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো পরীক্ষা, শিক্ষার মানোন্নয়ন — এগুলো কি অপরাধ? বারবার পরীক্ষা পেছালে সেশনজট আর মানসিক চাপ বাড়বে বলে অভিভাবকরা সতর্ক করছেন।

শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু আন্দোলনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। আওয়ামী লীগের পুরনো খেলা, এনসিপি-জামায়াতের চাপ, বিদেশি উস্কানি আর গুজব — সবকিছু থেকে সচেতন থাকতে হবে।  

সরকারের ধৈর্য ও শিক্ষার্থীদের বিচক্ষণতায় এবার অস্থিরতা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় সতর্কতা জরুরি। শিক্ষা ব্যবস্থাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখতে হবে।  



জামায়াত এমপির অন্তরঙ্গ ভিডিও ভাইরাল; নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র উঠে এল

জামায়াত এমপির অন্তরঙ্গ ভিডিও ভাইরাল; নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র উঠে এল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে একটি ভাইরাল ভিডিও। সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এক নারীর অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে এমপি ওই নারীকে নিজের ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’ বলে দাবি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভিডিওটি একটি হোটেল কক্ষে ধারণ করা বলে মনে হয়। এতে গাজী নজরুল ইসলাম ও এক তরুণীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দৃশ্য দেখা যায়। ভাইরাল হওয়ার পর থেকে নেটদুনিয়ায় তুমুল আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে এ ঘটনাকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছেন।

জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে ভিডিওটি এআই-জেনারেটেড এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ষড়যন্ত্র। দলীয় নেতাকর্মীরা এটিকে ভুয়া বলে উড়িয়ে দিয়ে এমপিকে সতর্ক করার কথাও জানিয়েছেন। তবে ফ্যাক্ট চেক প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার জানিয়েছে, ভিডিওটি আসল। এআই দিয়ে তৈরি বলে যেসব পোস্ট ছড়ানো হচ্ছে সেগুলো ভুল তথ্য। এ ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর জন্য বড় ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

গাজী নজরুল ইসলাম একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত। তিনি জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য এবং সাতক্ষীরা জেলা শাখার আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ধরনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় দলের ইমেজে আঘাত লেগেছে বলে অনেকে মনে করছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন — যে দল নৈতিকতা ও ইসলামী মূল্যবোধের কথা বলে, তার একজন শীর্ষ নেতার এমন ঘটনা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? অন্যদিকে কেউ কেউ এটিকে ব্যক্তিগত বিষয় বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও, জনপ্রতিনিধি হিসেবে নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন উঠছে।

এ ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে, রাজনীতিবিদদের ব্যক্তিগত জীবন জনসমক্ষে এলে তা শুধু ব্যক্তিকে নয়, পুরো দল ও রাজনৈতিক অঙ্গনকেও প্রভাবিত করে। ভিডিওর সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ফ্যাক্ট চেক এটিকে আসল বলে নিশ্চিত করায় জামায়াতের উপর চাপ বেড়েছে। দল এ বিষয়টি কীভাবে সামাল দেয় তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে রাজনৈতিক মহল।

এ ধরনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত নয়, সমাজ ও রাজনীতির নৈতিক মানদণ্ডকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। স্বচ্ছ তদন্ত এবং দায়িত্বশীল অবস্থানই এখন সময়ের দাবি।

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চাওয়া আন্দোলনের ‘ছাত্র নামধারী’ এরা কারা?

 শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চাওয়া আন্দোলনের ‘ছাত্র নামধারী’ এরা কারা?

১৪ জুলাই ২০২৬। এইচএসসি পরীক্ষার স্থগিতাদেশসহ বিভিন্ন দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন প্রথম দর্শনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের প্রকাশ বলে মনে হলেও, পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এটি ছিল একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ম্যানুফ্যাকচার্ড আন্দোলন। সরকার জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম বোর্ডের শিক্ষার্থীদের জন্য পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ, প্রশ্নপত্রের ভুলের জন্য নম্বর সমন্বয় এবং শিক্ষামন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশসহ সমস্যাগুলোর সমাধান করে দিলেও আন্দোলন থামেনি। বরং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তুলে দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলতে থাকে।

প্রশ্ন উঠেছে: সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাওয়ার পরও কেন আন্দোলন চলছিল? আর এখান থেকেই বেরিয়ে আসে আসল চিত্র — ছাত্র নামধারী রাজনৈতিক কর্মীরা

আন্দোলনের নেপথ্যে ‘ছাত্র নামধারী’ ব্যক্তিরা-

# আরিফুর রহমান ফয়সাল: নোয়াখালী জেলার নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন। তার উপস্থিতি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দেয়।

মোহনা আরিশা: নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেত্রী। রাস্তায় নেমে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

রুবাইয়া মেহজাবিন সুহী: মাইলস্টোন কলেজের শিক্ষার্থী পরিচয় দিয়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেন। পরে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তিনি অনেক আগেই বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। স্কুল দুর্নাম এড়াতে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়।

#রেদোয়ান মাহিন: জামালপুরের এনসিপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রশক্তির সংগঠক। নিজে পরীক্ষার্থী না হয়েও আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন, এইচএসসি পরীক্ষা বয়কটের ডাক দেন এবং মিডিয়ায় বক্তব্য দেন। পরে ভুল স্বীকার করে ফেসবুকে ক্ষমা চান।

#কোভিদ হোসেন: ছাত্রশিবিরের নেতা। তার উপস্থিতি আন্দোলনকে স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপ দেয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন।

#তাহমিদ রহমান ও সিফাত হোসেন: সাবেক পলিটেকনিক শিক্ষার্থী, বর্তমানে ছাত্রশক্তি ও ছাত্রশিবিরের নেতা। পরীক্ষার্থীদের উসকে দিয়ে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন।

প্রকৃত এইচএসসি ২৬-এর পরীক্ষার্থীরা অনেকেই আন্দোলনে ছিলেন না। অভিভাবকরা জানিয়েছেন, তাদের সন্তানরা পরীক্ষা সুন্দরভাবে সম্পন্ন করেছেন এবং সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট। যারা পদত্যাগ ও সরকারবিরোধী স্লোগান দিচ্ছিলেন, তাদের অধিকাংশই বহিরাগত রাজনৈতিক কর্মী — যারা ছাত্র পরিচয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা চালিয়েছিলেন।

সরকারের ধৈর্যশীল অবস্থান এবং অধিকাংশ সচেতন শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের বিচক্ষণতায় এই অপচেষ্টা সফল হয়নি। শিক্ষার্থীরা বুঝতে পেরেছেন যে, তাদের ন্যায্য দাবিকে কেউ রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।

এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে, শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের ইস্যুকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সতর্কতা এবং সচেতনতাই এ ধরনের ষড়যন্ত্র মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। সরকারের সময়োচিত সিদ্ধান্তের কারণে একটি বড় ধরনের অস্থিরতা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

তিস্তা ব্যারাজ: সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

 তিস্তা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি উৎপাদন, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। একবিংশ শতাব্দীতে এটি শুধু একটি নদী নয়; বরং দেশের পানি ও খাদ্যনিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক আর্থরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট ও বর্ষায় অতিরিক্ত প্রবাহ উত্তরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের বড় বাধা হওয়ায় তিস্তা প্রকল্পের গুরুত্ব দিনদিন বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়ে চীনের ইতিবাচক আগ্রহ ও নীতিগত সমর্থন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পরিবেশ ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর অনুযায়ী, দেশের উল্লেখযোগ্য আবাদযোগ্য জমি উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। কৃষিপণ্য উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও সেচের পানির অভাবে উৎপাদনশীলতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এ বাস্তবতায় তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল পানি সংরক্ষণ, সেচ সম্প্রসারণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। সময়ের সঙ্গে এটি একটি প্রকৌশল প্রকল্পের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা, কূটনীতি ও আঞ্চলিক আর্থরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। যথার্থই বলা হয়, ‘একটি নদী শুধু পানির প্রবাহ নয়; এটি মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেরও প্রবাহ বহন করে।' 

স্বাধীনতার পর দোয়ানীতে তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণ করে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ হেক্টর জমিতে সেচের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সেই লক্ষ্য পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হয়নি। ভারতের কাছে এটি কৃষি উন্নয়নের প্রকল্প হলেও বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব পড়েছে কৃষি, নদীর নাব্য ও পরিবেশে । ফলে তিস্তা আজ শুধু উন্নয়ন নয়, পানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলগত রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ফারাক্কা বাঁধের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে যে অভিন্ন নদীর পানি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীর পানি ব্যবহার করতে পারে, তবে ভাটির দেশের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করা যাবে না। ‘ন্যায্য ও যুক্তিসংগত ব্যবহার এবং ‘উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করা' আন্তর্জাতিক পানি আইনের মৌলিক নীতি। নীল, মেকং ও টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, আন্তঃসীমান্ত নদীর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান একতরফা পদক্ষেপে নয়; বরং সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় ও কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমেই সম্ভব ।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চললেও ২০১১ সালের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির খসড়া আজও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে তিস্তা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনা অনিশ্চিত রয়ে গেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ তিস্তা ব্যারাজের আধুনিকায়ন ও বৃহত্তর তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভাবছে, কারণ খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতি দীর্ঘদিন অন্য দেশের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল থাকলে তা কৌশলগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়। তাই তিস্তা ব্যারাজকে পানি চুক্তির বিকল্প নয়, বরং বৈজ্ঞানিক পানি সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও দেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা উচিত।

অভিন্ন ৫৪টি নদীর নিম্ন অববাহিকার দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়া প্রমাণ করে যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য একটি শিক্ষা—চুক্তির অপেক্ষার পাশাপাশি নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে ভারতকেও উপলব্ধি করতে হবে যে অভিন্ন নদীর ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক আইনের দাবি এবং দীর্ঘমেয়াদি সুসম্পর্কের পূর্বশর্ত।

তিস্তা ব্যারাজের গুরুত্ব কৃষির গণ্ডি ছাড়িয়ে উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য সেচ নিশ্চিত হলে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, সবজি ও উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে বন্যা ও নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ, নদীর নাব্য রক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোর মাধ্যমে পানি নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্য সুদৃঢ় হবে। এর পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক মৎস্যসম্পদের পুনরুদ্ধার, আধুনিক মৎস্য চাষ, ফল ও বনজ বৃক্ষের বনায়ন, নদীতীর সংরক্ষণ, পরিকল্পিত বসতি গড়ে তোলা, জলাধারভিত্তিক পর্যটন, নৌপর্যটন, ইকো-ট্যুরিজম এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। এসব উন্নয়ন কার্যক্রম দেশের খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার, কৃষকের আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ, আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে । একই সঙ্গে উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সহায়ক হবে।

তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে চীনের নদী প্রকৌশল ও অবকাঠামো নির্মাণের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে ঋণের শর্ত, সুদের হার, পরিশোধ সক্ষমতা, প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভজনকতা এবং জাতীয় স্বার্থ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশকে ভারত ও চীনের মতো দুই আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে প্রকল্পটিকে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নয়, বরং সহযোগিতার প্ল্যাটফরমে পরিণত করতে হবে। ভারতের অংশগ্রহণ সম্ভব হলে তা পারস্পরিক আস্থা, পানি সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করতে পারে। তবে এই সহযোগিতা অবশ্যই বাংলাদেশের ন্যায্য পানির অধিকার, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। নীল নদের GERD, মেকং নদী কমিশন এবং ইউরোপের রাইন ও দানিউব নদীর উদাহরণ দেখায় যে আন্তঃসীমান্ত নদীর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান একতরফা পদক্ষেপে নয়; বরং সংলাপ, তথ্য বিনিময়, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ও যৌথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্ভব। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। তিস্তাকে শুধু পানি বণ্টনের সমস্যা হিসেবে নয়, সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। নদীর পানি কৃষি, শিল্প, মৎস্য, পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণের সমন্বিত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আবেগ নয়, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রয়োজন, যাতে নির্মাণব্যয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, কৃষি উৎপাদন, পরিবেশগত প্রভাব, পুনর্বাসন এবং অর্থনৈতিক প্রত্যাবর্তন যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে তিস্তা পানি চুক্তির আলোচনা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা সক্ষমতাও শক্তিশালী করতে হবে।

তিস্তা একটি অভিন্ন নদী হওয়ায় যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সহযোগিতা অবশ্যই বাংলাদেশের ন্যায্য পানির অধিকার, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। বিদেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে বহুমুখী অংশীদারত্বের নীতি অনুসরণ করা উচিত।

সব শেষে বলা যায়, তিস্তা ব্যারাজ শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি উন্নয়ন, আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং আর্থরাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই একে ভারত-বাংলাদেশ পানি চুক্তির বিকল্প নয়, বরং বাংলাদেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা উচিত। তবে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক সহযোগিতা অব্যাহত রেখে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ত করে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে হবে, যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। পরিকল্পিত বাস্তবায়ন, দক্ষ কূটনীতি এবং বৈজ্ঞানিক পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তিস্তা ব্যারাজ উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

বিমসটেকের ৫ম নিরাপত্তা প্রধানদের বৈঠক: বাংলাদেশ চেয়ার হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল

 বিমসটেকের ৫ম নিরাপত্তা প্রধানদের বৈঠক: বাংলাদেশ চেয়ার হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল


বিমসটেকভুক্ত সাত দেশের জাতীয় নিরাপত্তা প্রধানদের ৫ম বৈঠক আজ নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. একেএম শামসুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে। ভারতের ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার অজিত ডোয়াল এই উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনের সভাপতিত্ব করছেন।


বৈঠকের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল গত বছরের নভেম্বরে। বিমসটেক সচিবালয় (ঢাকা) ভারতের আয়োজনের ইচ্ছা জানিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে নোট পাঠায়। এরপর ২০২৬ সালের ৪ মে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪ জুলাই সিনিয়র লেভেল প্রস্তুতিমূলক মিটিং এবং ১৬ জুলাই মূল বৈঠকের তারিখ প্রস্তাব করে। সচিবালয় সদস্য দেশগুলোর সম্মতি চেয়ে নোট প্রেরণ করে, যা এখন বাস্তবায়িত হয়েছে।


বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব:  

বাংলাদেশ বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার। এ কারণে এই বৈঠকে অংশগ্রহণ দেশটির জন্য দায়িত্ব ও সুযোগ উভয়ই। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ড. একেএম শামসুল ইসলাম নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গতকাল (১৫ জুলাই) তিনি ভারতের এনএসএ অজিত ডোয়ালের সঙ্গে সাইডলাইনে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন।


বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল নীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ অনুসারে এ ধরনের আঞ্চলিক সংলাপ প্ল্যাটফর্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা, পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ সম্ভব হয়।


আলোচনার প্রধান বিষয়:

সন্ত্রাসবাদ দমন এই সম্মেলনের শীর্ষ অগ্রাধিকার। রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত প্রতিক্রিয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। আন্তঃসীমান্ত অপরাধ—মাদক পাচার, অবৈধ অস্ত্র চালান ও মানব পাচার—মোকাবিলায় কার্যকর কৌশল নির্ধারণ করা হবে।


বঙ্গোপসাগরের সমুদ্র নিরাপত্তা, জলদস্যুতা প্রতিরোধ, অবৈধ মাছ ধরা বন্ধ, মেরিটাইম ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস বৃদ্ধি এবং সাইবার নিরাপত্তাও আলোচনায় থাকছে। এসব বিষয় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।


বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব: 

ভূরাজনীতির বর্তমান সমীকরণে নিরাপত্তা সহযোগিতা শুধু সামরিক বিষয় নয়—এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সীমান্ত নিরাপত্তা, সাইবার প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত আস্থার ভিত্তি। বিমসটেক ন্যাশনাল সিকিউরিটি চিফস মিটিং সেই বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সংলাপকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।


বাংলাদেশের জন্য এই প্ল্যাটফর্ম কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সংলাপই স্থিতিশীলতার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। বাংলাদেশ চেয়ার হিসেবে এই বৈঠকে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করছে।


সম্মেলন শেষে সম্ভাব্য যৌথ ঘোষণা ও সহযোগিতার রূপরেখা প্রকাশিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, দেশটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্থাপত্যে সক্রিয় ও গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত।


(সূত্র: বিমসটেক সচিবালয়ের নোট, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নোট নম্বর BIM-244/06/2026 এবং সম্মেলন-সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্র)

বিমসটেকের ৫ম জাতীয় নিরাপত্তা প্রধানদের বৈঠক: বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন অধ্যায়

 বিমসটেকের ৫ম জাতীয় নিরাপত্তা প্রধানদের বৈঠক: বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন অধ্যায়


১৬ জুলাই ২০২৬, নয়াদিল্লি। আজ ভারতের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিমসটেকের ৫ম জাতীয় নিরাপত্তা চিফস (BNSCs) মিটিং। ভারতের ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার অজিত ডোয়ালের সভাপতিত্বে এই উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন সাত সদস্য রাষ্ট্র—বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড—এর শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের অভিন্ন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ।


এই বৈঠকের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের নভেম্বরে। বিমসটেক সচিবালয় (ঢাকা) ভারতের আয়োজনের ইচ্ছা জানিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে নোট প্রেরণ করে। ২০২৬ সালের ৪ মে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪ জুলাই সিনিয়র লেভেল প্রস্তুতিমূলক মিটিং এবং ১৬ জুলাই মূল বৈঠকের তারিখ প্রস্তাব করে। সচিবালয় সদস্য দেশগুলোর সম্মতি চেয়ে নোট পাঠায়, যা এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ভারত এই প্ল্যাটফর্মকে তার ‘নেবারহুড ফার্স্ট’ ও ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবায়নে ব্যবহার করছে।


আলোচনার মূল ফোকাস:

সন্ত্রাসবাদ দমন এই সম্মেলনের শীর্ষ অগ্রাধিকার। রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সমন্বিত প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রস-বর্ডার হুমকি মোকাবিলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নেটওয়ার্ক—মাদক পাচার, অবৈধ অস্ত্র চালান ও মানব পাচার—ভাঙার কৌশল নির্ধারণ করা হবে।


সমুদ্র নিরাপত্তাও গুরুত্ব পাচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপথ রক্ষা, জলদস্যুতা ও অবৈধ মাছ ধরা প্রতিরোধ, মেরিটাইম ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস বৃদ্ধি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা আলোচনায় থাকছে। সাইবার হুমকি, সমন্বিত তথ্য বিকৃতি প্রচারণা এবং উদীয়মান প্রযুক্তির ঝুঁকি মোকাবিলাও এজেন্ডায় রয়েছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংযোগের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতাকে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে।


ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের অবস্থান: 

ভূরাজনীতির দাবার ছকে যে দেশ সংলাপে এগিয়ে থাকে, ভবিষ্যতের কৌশলগত ভারসাম্যও তার পক্ষেই গড়ে ওঠে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণে নিরাপত্তা সহযোগিতা এখন আর কেবল সামরিক বিষয় নয়; এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সন্ত্রাসবাদ দমন, সীমান্ত নিরাপত্তা, সাইবার প্রতিরক্ষা এবং কৌশলগত আস্থার অন্যতম ভিত্তি।


BIMSTEC National Security Chiefs Meeting সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন, যেখানে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো অভিন্ন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সংলাপ ও সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।


বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এই নীতির আলোকে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা, পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণই ভবিষ্যৎ কূটনীতির প্রধান শক্তি। পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সংলাপই স্থিতিশীলতার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।


বাংলাদেশ বর্তমানে বিমসটেকের চেয়ার। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল অংশ নিচ্ছে। সাইডলাইনে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।


এই সম্মেলন শুধু নিরাপত্তা সহযোগিতার কথা বলছে না, বরং অর্থনৈতিক সংযোগ ও পারস্পরিক আস্থা বিনির্মাণের পথও প্রশস্ত করছে। ভারতের উদ্যোগে এই বৈঠক প্রমাণ করে যে, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার যুগেও সমন্বিত প্রচেষ্টাই অঞ্চলের শান্তি ও সমৃদ্ধির চাবিকাঠি।


বঙ্গোপসাগরের দেশগুলো যদি এই সুযোগ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তবে এই অঞ্চল হতে পারে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। সংলাপের মাধ্যমে অর্জিত আস্থাই ভবিষ্যতের কৌশলগত ভারসাম্য নির্ধারণ করবে।

দিল্লিতে তারেকের দূত নয়, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি — নবনীতার ভিডিওর মিথ্যাচারের জবাব

 দিল্লিতে তারেকের দূত নয়, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি — নবনীতার ভিডিওর মিথ্যাচারের জবাব 


নবনীতা চৌধুরীর সাম্প্রতিক ভিডিওতে “দিল্লিতে তারেকের দূত! অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠকে কী হলো?” শিরোনামে যে সন্দেহ, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও একপেশে ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে, তার স্পষ্ট জবাব প্রয়োজন। ভিডিওতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামসুল ইসলামের সফরকে “তারেকের নিরাপত্তা উপদেষ্টার গোপন মিশন”, “ভারতের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি”, “পাকিস্তানঘনিষ্ঠ নিয়োগ” এবং “শুধু ছবি তোলা” বলে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন।


১৫-১৬ জুলাই নয়াদিল্লিতে BIMSTEC জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ বর্তমানে এই আঞ্চলিক ফোরামের চেয়ারম্যান। এই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামসুল ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ নেন। এটি কোনো ব্যক্তিগত দূতের সফর নয়, বরং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব।


নবনীতা যে দাবি করেছেন বৈঠক হয়নি, শুধু ছবি তোলা হয়েছে — তা সঠিক নয়। ভারতীয় মিডিয়ায় এই নির্দিষ্ট বৈঠকের ছবি সীমিত প্রকাশিত হয়েছে, যা কূটনীতিতে স্বাভাবিক ঘটনা। সংবেদনশীল আলোচনার ক্ষেত্রে বিস্তারিত ছবি বা রিডআউট প্রকাশ করা হয় না। বাংলাদেশের তরফ থেকে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।

ভিডিওতে শামসুল ইসলামকে “পাকিস্তানঘনিষ্ঠ” বলে চিহ্নিত করে নানা অসমর্থিত অভিযোগ তোলা হয়েছে। এ ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণ ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছাড়া কোনো তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। তিনি সরকারি দায়িত্ব পালন করছেন এবং BIMSTEC-এর মতো আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছেন।


বাস্তবে এই সফর বাংলাদেশের জন্য বেশ কিছু ইতিবাচক সুযোগ তৈরি করেছে। এতে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও সংলাপের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। BIMSTEC চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা (HADR), সন্ত্রাসবাদ ও সাইবার নিরাপত্তায় আঞ্চলিক সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার পথ খুলেছে। জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক যোগাযোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।


নবনীতার ভিডিওতে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন, খালেদা জিয়া, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইত্যাদি বিষয় জড়িয়ে যে জটিল গল্প বলা হয়েছে, তা মূল ইস্যু থেকে সরিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা মাত্র। বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতাকে ব্যক্তিগত রাজনীতির লেন্স দিয়ে দেখা ঠিক নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক চলে রাষ্ট্রীয় স্বার্থে, ব্যক্তির নয়।


সার্বিকভাবে, এই বৈঠক বাংলাদেশকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালনের সুযোগ দিয়েছে এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্য সবকিছুকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা সহজ, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে বাস্তবতা স্বীকার করাও জরুরি। বাংলাদেশের স্বার্থে এ ধরনের আঞ্চলিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা উচিত।

BIMSTEC-এর আনুষ্ঠানিক বৈঠক নিয়ে নবনীতার মিথ্যাচার

 BIMSTEC-এর আনুষ্ঠানিক বৈঠক নিয়ে নবনীতার মিথ্যাচার


নবনীতা চৌধুরীর ভিডিওতে “দিল্লিতে তারেকের দূত” বলে যে নাটকীয় ও ষড়যন্ত্রমূলক বয়ান দেওয়া হয়েছে, তা পুরোপুরি বিভ্রান্তিকর। বাস্তবে ১৫-১৬ জুলাই নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত BIMSTEC জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামসুল ইসলাম। এটি কোনো ব্যক্তিগত দূতের সফর নয়, বরং আন্তর্জাতিক আঞ্চলিক সম্মেলন। বাংলাদেশ বর্তমানে BIMSTEC-এর চেয়ারম্যান হিসেবে এই বৈঠকে স্বাভাবিকভাবেই অংশ নিয়েছে।


*ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যম ও ANI-এর রিপোর্টে এই বৈঠকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।* ভারতের পক্ষ থেকে কিছু ছবিও শেয়ার করা হয়েছে। নবনীতা যেভাবে “শুধু ছবি তুলেছে, মিটিং হয়নি” বলে মিথ্যাচার করছেন, তা সত্যের অপলাপ। এটি নিরাপত্তা প্রধানদের বৈঠক, তাই সব তথ্য-বিস্তারিত মিডিয়ায় আসবে না — এটাই স্বাভাবিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া।


নবনীতা ইনিয়ে-বিনিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন যে তারেক রহমান সম্পর্ক “গলানোর” জন্য শামসুল ইসলামকে পাঠিয়েছেন। এটাও সম্পূর্ণ ভুল। তিনি কোনো ব্যক্তিগত দূত হিসেবে যাননি। এটি BIMSTEC সম্মেলন, যেখানে ভারত, বাংলাদেশ ছাড়াও মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটানের নিরাপত্তা উপদেষ্টা বা সমমর্যাদার প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। এখানে সব দেশের প্রতিনিধিরাই আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সামুদ্রিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।


বাংলাদেশের এই অংশগ্রহণ আসলে দেশের জন্য ইতিবাচক। এতে কূটনৈতিক চ্যানেল খোলা রাখা সম্ভব হয়েছে, BIMSTEC চেয়ারম্যান হিসেবে নেতৃত্ব জোরদার হয়েছে এবং সীমান্ত, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, HADR, জ্বালানি ও সাইবার নিরাপত্তায় আঞ্চলিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। নবনীতার মতো একপেশে ব্যাখ্যা দিয়ে এসব জাতীয় স্বার্থকে খাটো করা ঠিক নয়।


রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্য সবকিছুকে সন্দেহের চোখে দেখা এবং মিথ্যাচার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো দুর্ভাগ্যজনক। বাংলাদেশের স্বার্থে আঞ্চলিক সম্মেলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও কার্যকর কূটনীতি চালিয়ে যাওয়াই সঠিক পথ।

© all rights reserved
made with by templateszoo