পরীক্ষার খাতায় পাওয়া নম্বর তোমার পুরো জীবন নয়

0


পরীক্ষার খাতার কয়েকটি সংখ্যা তোমার পুরো জীবন নয়

প্রিয় এসএসসি পরীক্ষার্থী,

আজ হয়তো তোমার হাতে ফলাফল এসেছে। কারও মুখে হাসি, কারও চোখে জল। কেউ জিপিএ-৫ পেয়েছে, কেউ প্রত্যাশার চেয়ে কম পেয়েছে, আবার কেউ হয়তো ফেলও করেছে।

যে ছেলেটা বা মেয়েটা আজ মনে করছে—“আমার জীবন শেষ”, তাকে একটা কথা বলতে চাই:

না, জীবন শেষ হয়নি। বরং জীবনের আসল পরীক্ষাগুলো এখনো শুরুই হয়নি।

এসএসসির ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ—এটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ভালো ফলাফল তোমাকে কিছু দরজা খুলে দিতে পারে। কিন্তু একটা পরীক্ষার ফলাফল তোমার বুদ্ধি, সৃজনশীলতা, সাহস, নেতৃত্ব, পরিশ্রম কিংবা ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি মাপতে পারে না।

ইতিহাসের দিকে তাকাও।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথাগত স্কুলশিক্ষার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। তিনি নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করেননি; ইংল্যান্ডে গিয়েও তাঁর আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষ হয়নি। অথচ সেই মানুষটিই পরে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে নিয়ে গেলেন এবং ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন।

বিল গেটস হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু ডিগ্রি শেষ না করেই বেরিয়ে আসেন। সেই সিদ্ধান্তের পর তিনি মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রযুক্তি জগতের অন্যতম প্রভাবশালী উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন।

আরেকটি দারুণ উদাহরণ উইনস্টন চার্চিল। সামরিক কলেজ স্যান্ডহার্স্টে ভর্তি হওয়ার পরীক্ষায় তিনি প্রথমবার ব্যর্থ হন; শেষ পর্যন্ত তৃতীয় চেষ্টায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে তিনিই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন।

আলবার্ট আইনস্টাইন সম্পর্কেও একটি প্রচলিত গল্প আছে যে তিনি স্কুলে ফেল করতেন। আসল ঘটনা এতটা সরল নয়। ১৮৯৫ সালে জুরিখের পলিটেকনিকে ভর্তি পরীক্ষায় তাঁর কিছু বিষয়ে প্রয়োজনীয় ফল হয়নি; পরে আরাউয়ের স্কুলে পড়াশোনা করে তিনি পরের বছর যোগ্যতা অর্জন করেন এবং পলিটেকনিকে ভর্তি হন। অর্থাৎ একটি পরীক্ষার ধাক্কা তাঁর ভবিষ্যৎ থামিয়ে দিতে পারেনি।

জ্যাক মা-ও জীবনে পরীক্ষার ব্যর্থতা ও প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় তিনি দুইবার ব্যর্থ হওয়ার পর তৃতীয়বার উত্তীর্ণ হন। পরে ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে আলিবাবা প্রতিষ্ঠা করেন।

আর আমাদের দেশের মো. আবদুল হামিদ—যিনি পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন—তাঁর ক্ষেত্রেও মনে রাখা দরকার, তিনি কিন্তু সব পরীক্ষায় তৃতীয় বিভাগ পাওয়া একজন শিক্ষার্থী ছিলেন।  তাঁকে দেখলে মনে হয়, জীবনের সাফল্য শুধু পরীক্ষার নম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; দীর্ঘ সংগ্রাম, রাজনীতি, নেতৃত্ব ও মানুষের জন্য কাজ করাও একজন মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে।

তাই আজ যারা এসএসসিতে প্রত্যাশিত ফল পাওনি, তাদের বলছি—

নিজেকে একটি রেজাল্ট দিয়ে বিচার করো না।

তুমি হয়তো গণিতে দুর্বল, কিন্তু তুমি অসাধারণ একজন লেখক হতে পারো।
তুমি হয়তো ইংরেজিতে কম নম্বর পেয়েছ, কিন্তু তুমি অসাধারণ উদ্যোক্তা হতে পারো।
তুমি হয়তো পরীক্ষার হলে ভালো করতে পারোনি, কিন্তু বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা তোমার অসাধারণ হতে পারে।

আজকের ফলাফল তোমার অবস্থা জানায়; তোমার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না।

তবে একটা কথা মনে রেখো—এই গল্পগুলো শুনে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কোনো কারণ নেই। রবীন্দ্রনাথ, বিল গেটস বা জ্যাক মার মতো মানুষের গল্পের শিক্ষা “পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ নয়” নয়; শিক্ষা হলো একটি ব্যর্থতা বা একটি প্রথাগত পথের সঙ্গে নিজেকে আটকে রেখো না। সফল মানুষরা নিজেদের শক্তি খুঁজে নিয়ে বছরের পর বছর পরিশ্রম করেছেন। কলেজ ড্রপআউটদের সাফল্য ব্যতিক্রম; শুধু ড্রপআউট হওয়া নিজে কোনো সাফল্যের সূত্র নয়।

তাই আজ যদি তোমার ফলাফল খারাপ হয়, একটু কাঁদতে ইচ্ছে করলে কেঁদে নাও। মন খারাপ হলে মন খারাপ করো। কিন্তু নিজেকে হেরে যাওয়া মানুষ ভাববে না।

কারণ তোমার সামনে এখনো কলেজ আছে।
বিশ্ববিদ্যালয় আছে।
দক্ষতা শেখার সুযোগ আছে।
ব্যবসা করার সুযোগ আছে।
চাকরি আছে।
সৃজনশীলতা আছে।
হাজারো নতুন মানুষ ও নতুন অভিজ্ঞতা আছে।

সবচেয়ে বড় কথা—

তোমার সামনে এখনো পুরো জীবন পড়ে আছে।

এসএসসির রেজাল্ট তোমার জীবনের একটি অধ্যায় মাত্র।
এটা পুরো বই নয়।

আজ যে ফলাফল দেখে তুমি নিজেকে ছোট ভাবছ, একদিন হয়তো পেছনে ফিরে তাকিয়ে বলবে—

“সেদিন আমি ভেবেছিলাম আমি হেরে গেছি। আসলে সেদিনই আমার নতুন করে শুরু হয়েছিল।”

তাই মাথা উঁচু করো।

ফলাফলকে মেনে নাও, ভুল থেকে শেখো, নিজের দুর্বলতা ঠিক করো এবং নতুন করে শুরু করো।

কারণ জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এসএসসি নয়—
জীবন যখন তোমাকে বারবার পড়ে যেতে বলবে, তখন তুমি কতবার উঠে দাঁড়াতে পারো, সেটাই আসল পরীক্ষা।

No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo