Showing posts with label জুলাই গণঅভ্যুত্থান. Show all posts
Showing posts with label জুলাই গণঅভ্যুত্থান. Show all posts

ফিরে দেখা ৩ আগস্ট ২০২৪ “নিজেদের জনগণের ওপর গুলি নয়।” “এখন থেকে গুলি নয়।”

 


ফিরে দেখা ৩ আগস্ট ২০২৪

“নিজেদের জনগণের ওপর গুলি নয়।” “এখন থেকে গুলি নয়।”

ঠিক দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট। দেশ তখন রক্তাক্ত। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৯ জুলাই মধ্যরাত থেকে সেনাবাহিনী সারাদেশে মোতায়েন। পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবির গুলিতে শত শত প্রাণহানি ঘটেছে। পুরো দেশ তাকিয়ে আছে সেনাবাহিনীর দিকে—তারা কি অন্য বাহিনীর সঙ্গে মিলে আন্দোলন দমন করবে, নাকি রক্তপাত থামাতে এগিয়ে আসবে?

সেই সংকটময় মুহূর্তে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান (যিনি মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ২৩ জুন দায়িত্ব নিয়েছিলেন) তাঁর প্রথম অফিসার্স অ্যাড্রেস আহ্বান করেন। ঢাকা সেনানিবাসের হেলমেট হলে এবং দেশের সব গ্যারিসন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন অফিসাররা। দুপুর দেড়টায় শুরু হওয়া সেই বৈঠক প্রায় দেড় ঘণ্টা স্থায়ী হয়।

সেনাপ্রধান প্রথমে প্রায় ৩০ মিনিট বক্তব্য রাখেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন কেন সরকারের নির্দেশে সেনাবাহিনীকে বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় মোতায়েন করা হয়েছে। “সংকটময় মুহূর্তে সরকার চাইলে আমরা মোতায়েন হতে বাধ্য,” বলেন তিনি। তবে স্পষ্ট করে যোগ করেন—সেনারা কাউকে হত্যা করেনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কত রাউন্ড গুলি ও ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়েছে, তার পরিসংখ্যানও দেন।

এ সময় তিনি দুটি গানের কথা উল্লেখ করেন। একটি: “আমি তো প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার উপরে পড়েছে।” এর মাধ্যমে তিনি বোঝান, তিনি এই সংকট ডাকেননি; সংকট নিজেই সেনাবাহিনীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুর “আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেব আকাশে” গানটির কথাও বলেন। সেই মুহূর্তে হলভর্তি অফিসারদের মধ্যে আবেগের ছোঁয়া লাগে।

এরপর তিনি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা জানতে চান। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও ঊর্ধ্বতনদের কথা বলতে নিরুৎসাহিত করা হয়। ক্যাপ্টেন, মেজর ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল পর্যায়ের ছয়-সাতজন অফিসার সরাসরি মতামত দেন।

এক অফিসার বলেন, খুলনায় টহলরত সেনাদের উদ্দেশে আন্দোলনকারীরা যে অপমানজনক শব্দ ব্যবহার করেছে, তা স্বাধীন বাংলাদেশে কখনো শোনা যায়নি। আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি প্রশ্ন করেন: “কিসের জন্য? কার জন্য?”

রাজশাহী মেডিকেল কর্পসের এক নারী অফিসার বাংলায় লেখা এক আবেগঘন বক্তব্য পাঠ করে বলেন: “দেশের প্রতিটি মা আজ এই মৃত্যুর জন্য কাঁদছে।” তিনি তাঁর প্রতিবেশী মীর মুগ্ধের কথা উল্লেখ করেন, যিনি উত্তরায় আন্দোলনকারীদের পানি বিলাতে গিয়ে নিহত হন। পুরো হল নীরব হয়ে যায়।

গম্ভীর পরিবেশের মধ্যে হাস্যরসের এক মুহূর্তও আসে। মোহাম্মদপুরে গুলির একটি ভাইরাল ভিডিওর কথা উল্লেখ করে এক ক্যাপ্টেন বলেন, ভিডিওতে তাঁকে দেখে পরিবার ও বন্ধুরা সমালোচনা করেছেন। “তবে আমার স্ত্রী আমাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে মজা করে বলেছে—আমাকে নাকি ‘কিউট’ দেখাচ্ছিল।” সেনাপ্রধান হাসতে হাসতে বলেন, “আমাকে কেউ কখনো কিউট বলেনি।” তারপর গম্ভীর হয়ে যোগ করেন: “সেনাবাহিনী সর্বাগ্রে দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবে।”

দুপুর ২:৪০-এর দিকে স্বল্প বিরতির পর বৈঠক আবার শুরু হয়। দ্বিতীয় পর্ব সংক্ষিপ্ত। সেনাপ্রধান তরুণ অফিসারদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে চূড়ান্ত নির্দেশ দেন: “জনগণের ওপর গুলি চলবে না।” “এখন থেকে গুলি নয়।”

এই সিদ্ধান্তই ইতিহাস বদলে দেয়। এর ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা বোন শেখ রেহানাসহ সামরিক বিমানে ভারতে পালিয়ে যান। সেনাবাহিনী সেদিন জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। আইএসপিআর-এর বিজ্ঞপ্তিতে সেনাপ্রধানের বক্তব্যেও ইঙ্গিত ছিল: “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জনগণের স্বার্থে এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সবসময় জনগণের পাশে থাকবে।”

এক বছর পর ফিরে তাকালে দেখা যায়, সেদিনের সেই বৈঠক শুধু একটি সামরিক সিদ্ধান্ত ছিল না। এটি ছিল বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তরুণ অফিসারদের সাহসী কণ্ঠস্বর এবং সেনাপ্রধানের সেই নির্দেশ—‘নিজেদের জনগণের ওপর গুলি নয়’—দেশকে এক ভয়াবহ রক্তপাত থেকে রক্ষা করেছিল। আর সেই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত এক স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল।

কথিত বন্দিশালা: ইতিহাসকে ‘কথিত’ বানানোর সাহস কোথা থেকে আসে?

 


কথিত বন্দিশালা: ইতিহাসকে ‘কথিত’ বানানোর সাহস কোথা থেকে আসে?

হিটলারের পতনের পর কেউ কি সাহস পেয়েছিল অ্যাউশভিৎস বা অন্যান্য টর্চার চেম্বারকে ‘কথিত’ বলার? মুক্তিযুদ্ধের পর কেউ কি সাহস পেয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের হত্যা-ধর্ষণকে ‘কথিত’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার? উত্তর একটাই—না। কারণ সেই সময় ইতিহাস এখনো কাঁচা রক্তে ভেজা ছিল। জাতি তখনও ক্ষতের যন্ত্রণায় ছটফট করছিল।

কিন্তু আজ বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। জুলাই অভ্যুত্থানের মাত্র এক বছর পরই গুমের মতো জাতির গভীর ক্ষতকে নিয়ে তামাশা শুরু হয়েছে। ‘আয়নাঘর’ বা অন্যান্য গোপন বন্দিশালার কথা উঠলেই অনেক গণমাধ্যম লিখছে—‘কথিত বন্দিশালা’। প্রথম আলোসহ একাধিক পত্রিকা ও অনলাইন মিডিয়া এই শব্দটি বারবার ব্যবহার করছে। একটা-দুটো নয়, অনেকেই।

এটা কি নিছক সাংবাদিক সতর্কতা? নাকি গদি মিডিয়ার মতো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের নির্দেশ অনুযায়ী সমন্বিত ন্যারেটিভ নির্মাণ? প্রশ্নটা অমূলক নয়। কারণ একই সময়ে একই ধরনের ভাষা ব্যবহার হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা নয়।

জুলাইয়ের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর কোন কোন ভুল এই সাহস উৎপাদন করেছে, সেটা এখনই ভাবা দরকার। যদি আজ গুম, বন্দিশালা, নির্যাতনকে ‘কথিত’ বলা যায়—তাহলে কয়দিন পর জুলাইকেও ‘কথিত অভ্যুত্থান’ বলা হবে। সরকারকে ‘কথিত সরকার’, নির্বাচনকে ‘কথিত নির্বাচন’, এমনকি বাংলাদেশকেই ‘কথিত বাংলাদেশ’ বলা শুরু হবে।

ইতিহাস মুছে ফেলার এই প্রক্রিয়া আজ শুরু হয়েছে ছোট ছোট শব্দে। ‘কথিত’ শব্দটি আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অস্বীকৃতির বীজ। যে জাতি নিজের ক্ষতকেই স্বীকার করতে দ্বিধা করে, সে জাতি আবারও একই ফাঁদে পা দেয়।

সাধু সাবধান। আজ যদি গুমের ক্ষতকে ‘কথিত’ বলা হয়, কাল জুলাইয়ের রক্তও ‘কথিত’ হয়ে যাবে।

জুলাইয়ের আবেগকে ধ্বংস করল কারা?


জুলাইয়ের আবেগকে ধ্বংস করল কারা?

জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেল। যে আন্দোলনে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন, সেই আবেগকে আমাদের স্মৃতি, হৃদয়ে, কর্মকাণ্ডে ধরে রাখার কথা ছিল। নিহতদের স্মরণে সভা-সমাবেশ, আহতদের পাশে দাঁড়ানো, শহীদ পরিবারের পাশে থাকা—এসবই হওয়ার কথা ছিল জুলাই জুড়ে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উল্টো চিত্র।

মাসব্যাপী কোনো উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি চোখে পড়ল না। জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের স্মরণে কোনো বড় সমাবেশ, কোনো স্মৃতিসভা—কিছুই হয়নি। উল্টো এনসিপির পদযাত্রার নামে অনুষ্ঠানে বিএনপিকে গালিগালাজ, প্রধানমন্ত্রীকে হুমকি—এসবই চোখে পড়ল। কোন্দল বাধানো, দোষারোপ করা, নিজেদেরকে একমাত্র মালিক সাজানো—এই কর্মকাণ্ডই বেশি হয়েছে।

এখন প্রশ্ন উঠছে- যারা জুলাইয়ের নাম ভাঙিয়ে আজ রাজনীতি করছেন, তারাই কি এই আবেগকে ধ্বংস করছেন? 

অভ্যুত্থানের সময় যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, যে আবেগ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেটাকে এখন দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। শহীদদের রক্তের বিনিময়ে ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ চলছে। যারা আহত হয়ে পঙ্গু হয়েছেন, তাদের কথা কেউ মনে রাখছে না। যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের স্মৃতিও যেন ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

জুলাইয়ের আবেগ ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের আবেগ। আর এর প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল ২০০৯ থেকে ২০২৪। যার বড় অবদান বিএনপির। কিন্তু সেই অবদানকে অস্বীকার করে এনসিপি এটিকে একটি ক্ষুদ্র রাজনৈতিক কোন্দলে নামিয়ে এনেছে। পদযাত্রার মঞ্চ থেকে বিএনপিকে আক্রমণ করা, প্রধানমন্ত্রীকে হুমকি দেওয়া—এসব কি জুলাইয়ের চেতনা? নাকি জুলাইকে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা?

যারা জুলাইয়ের নামে কথা বলেন, তাদেরই জবাবদিহি করতে হবে—আবেগকে ধ্বংস করল কারা? শহীদদের স্মৃতি কি শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিই সম্মান জানানো হবে? প্রশ্নটা আজকের বাস্তবতায় খুবই জরুরি।

স্কুলের বেঞ্চে বসা ছেলেরা আজ বাপের বয়সীকে ‘তুই’ বলে ডাকে

স্কুলের বেঞ্চে বসা ছেলেরা আজ বাপের বয়সীকে ‘তুই’ বলে ডাকে

আজকের নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ আর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী—এই চারজন এখন রাজনীতির ময়দানে এমনভাবে কথা বলেন, যেন তারাই দেশের একমাত্র সংগ্রামী শক্তি। বিএনপির নেতাদের উদ্দেশে ‘তুই’, ‘তোর’ করে কথা বলা, হুমকি দেওয়া, এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও গালিগালাজ করা—এসব এখন তাদের নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এই চারজনের জন্মই হয়েছে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে।

বিএনপির জন্ম ১৯৭৮ সালে। জিয়াউর রহমান যখন দল গঠন করেন, তখন এই চারজনের বাবা-মায়েরও হয়তো বিয়ে হয়নি। এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিএনপি যে নয় বছরের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন করেছে, সেই সময় তারা মায়ের পেটেও ছিলেন না। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির নেতৃত্বে যে স্বৈরাচারের পতন হয়, তখনও তাদের অস্তিত্ব ছিল না। সেই আন্দোলনে যারা রাজপথে নেমেছিলেন, আজকের এই চার নেতার বাবা-মায়ের বয়সী মানুষ।

পরে ১৯৯৬ থেকে ২০০১, আবার ২০০৯ থেকে ২০২৪—বিএনপি টানা দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজপথে লড়েছে। গুম, খুন, মামলা, নির্যাতন—সব সহ্য করে। ২০১০ সালে খালেদা জিয়ার সামরিক বাড়ি উচ্ছেদের প্রতিবাদে হরতাল ডাকা হয়। তখন নাহিদ, সারজিস ও হাসনাতের বয়স মাত্র ১২। ২০১৩-১৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে টানা হরতাল-অবরোধ চলে, নির্বাচন বয়কট হয়। তখনও তারা স্কুল-কলেজের ছাত্র। ২০১৫ সালে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে যে টানা অবরোধ চলে, যেখানে পেট্রোল বোমা আর সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ মারা যায়—তখনও তারা কলেজপড়ুয়া কিশোর। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠানোর পর বিএনপির কর্মীরা রাজপথে রক্ত ঝরাচ্ছিল, তখন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে ঘুরত।

আজ সেই একই বিএনপির নেতাদের ‘তুই’ বলে ডাকছে। বাপের বয়সী মানুষকে অপমান করে নিজেদেরকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়া ‘জুলাইর মুখ’ সাজাচ্ছে। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানের আগে দেশের রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইতিহাসে তাদের কোনো উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল না। তারা যেন হঠাৎ করেই ইতিহাসের মালিক হয়ে গেছেন। যারা ১৫-২০ বছর ধরে রাজপথে লড়েছেন, তাদেরকেই এখন ‘পুরনো রাজনীতির প্রতিনিধি’ বলে অবজ্ঞা করা হচ্ছে।

ইতিহাস মুছে ফেলে নিজেদেরকে বীর বানানোর এই প্রচেষ্টা কি স্যাটায়ার নয়? নাকি এটাই আজকের রাজনীতির নতুন ধরন—যারা লড়াই করেছে, তাদেরকেই অপমান করা, আর যারা লড়াইয়ের সময় স্কুলে ছিল, তারাই এখন নেতৃত্ব দাবি করে বসছে? প্রশ্নটা আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় খুবই জরুরি হয়ে উঠেছে।

বাপের বয়সীকে ‘তুই’ বলে ডাকে, অথচ নিজের জন্মের আগের ইতিহাস জানে না


বাপের বয়সীকে ‘তুই’ বলে ডাকে, অথচ নিজের জন্মের আগের ইতিহাস জানে না

আজকের নাহিদ, সারজিস, হাসনাত আর পাটওয়ারী এখন রাজনীতির ময়দানে এমনভাবে কথা বলেন, যেন তারাই দেশের একমাত্র সংগ্রামী। বিএনপির নেতাদের উদ্দেশে ‘তুই’ ‘তোর’ করে কথা বলা, হুমকি দেওয়া, এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও গালিগালাজ করা—এসব এখন তাদের নিত্যদিনের অভ্যাস। অথচ এই চারজনের জন্মই হয়েছে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে।

বিএনপির জন্ম ১৯৭৮ সালে। জিয়াউর রহমান যখন দল গঠন করেন, তখন এই চারজনের বাবা-মায়েরও হয়তো বিয়ে হয়নি। এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিএনপি যে নয় বছরের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন করেছে, সেই সময় তারা মায়ের পেটেও ছিলেন না। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির নেতৃত্বে যে স্বৈরাচারের পতন হয়, তখনও তাদের অস্তিত্ব ছিল না।

পরে ১৯৯৬ থেকে ২০০১, আবার ২০০৯ থেকে ২০২৪—বিএনপি টানা দেড় দশক ধরে রাজপথে লড়েছে। গুম, খুন, মামলা, নির্যাতন—সব সহ্য করে। ২০১৩-১৫ সালের টানা হরতাল-অবরোধে যখন শতাধিক মানুষ মারা যায়, তখন এই চারজন স্কুলের ইউনিফর্ম পরে ক্লাসে বসত। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠানোর পর বিএনপির কর্মীরা রাজপথে রক্ত ঝরাচ্ছিল, তখন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে ঘুরত।

আজ সেই একই বিএনপির নেতাদের ‘তুই’ বলে ডাকছে। বাপের বয়সী মানুষকে অপমান করে নিজেদেরকে ‘জুলাইর মুখ’ সাজাচ্ছে। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানের আগে, জুলাই প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য দেশের রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইতিহাসে তাদের কোনো অবদান ছিল না। তারা যেন হঠাৎ করেই ইতিহাসের মালিক হয়ে গেছেন।

ইতিহাস মুছে ফেলে নিজেদেরকে বীর বানানোর এই প্রচেষ্টা কি স্যাটায়ার নয়? নাকি এটাই আজকের রাজনীতির নতুন ধরন—যারা লড়াই করেছে, তাদেরকেই অপমান করা, আর যারা লড়াইয়ের সময় স্কুলে ছিল, তারাই এখন নেতৃত্ব দাবি করে বসছে?

যখন তারা স্কুলে পড়ত, তখন বিএনপি রাজপথে লড়ছিল


যখন তারা স্কুলে পড়ত, তখন বিএনপি রাজপথে লড়ছিল

আজকের নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ আর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী—এই চারজন এখন জুলাই অভ্যুত্থানের মুখ, এনসিপির শীর্ষ নেতা। কিন্তু এক যুগ আগে তারা কেউ রাজনৈতিক ময়দানে ছিলেন না। তারা তখন স্কুল-কলেজের ছাত্র, কেউ কেউ একেবারে শিশু-কিশোর।

২০১০ সালে খালেদা জিয়ার সামরিক বাড়ি উচ্ছেদের প্রতিবাদে বিএনপি সারা দেশে হরতাল ডাকে। তখন নাহিদ, সারজিস ও হাসনাতের বয়স মাত্র ১২। পাটওয়ারী ছিলেন ১৫। ২০১৩-১৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে বিএনপি টানা হরতাল-অবরোধ করে, নির্বাচন বয়কট করে। তখন এই চারজনের বয়স ১৫ থেকে ১৮। ২০১৫ সালে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে যে টানা অবরোধ চলে, যেখানে পেট্রোল বোমা আর সংঘর্ষে শতাধিক প্রাণহানি হয়—তখনও তারা কলেজপড়ুয়া কিশোর।

বিএনপি সেই সময় রাজপথে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়ছিল। নেতাকর্মীদের গুম, হত্যা, মামলা আর নির্যাতনের মুখে দলটি একের পর এক কর্মসূচি দিয়েছে। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পরও প্রতিবাদ হয়েছে। তখন এই চারজনের বয়স ১৯-২২। তারা তখনও ছাত্রজীবনে ব্যস্ত।

আর এখন, ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর, এই চারজনই নিজেদেরকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প বলে নিজেদের হিরো হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। বিএনপি যে লড়াইটা ১৫ বছর ধরে একা করেছে, তার ফল ভোগ করার দাবিদার হয়ে উঠেছেন তারা। কিন্তু ইতিহাস বলে—যখন বিএনপি রাজপথে রক্ত ঝরাচ্ছিল, তখন এই নেতারা স্কুলের বেঞ্চে বসে ছিলেন।

রাজনীতি করতে গেলে ইতিহাস জানতে হয়, ইতিহাস পড়তে হয়, হতে হয় ইতিহাসের ছাত্র। নাহিদ হাসনাত সার্জিস পাটোয়ারীদের একথা কে বুঝাবে?

জুলাইকে ধ্বংস করছে কারা?

 


জুলাইকে ধ্বংস করছে কারা?

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির মাস শেষ হয়ে গেল। অথচ এই এক মাসে চোখে পড়ার মতো কোনো বড় মাসব্যাপী কর্মসূচি চোখে পড়ল না—যেখানে শহীদদের স্মরণ, আহতদের সম্মান, পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর কোনো জাতীয় আহ্বান বা ঐক্যবদ্ধ সমাবেশ থাকবে। উল্টো যা চোখে পড়ল, তা হলো রাজনৈতিক কোন্দল, গালি-গালাজ আর পারস্পরিক হুমকি।

এনসিপি তাদের ‘জুলাই পদযাত্রা’ বা ‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ’ কর্মসূচির নামে মাঠে নেমেছে। কিন্তু সেই পদযাত্রা শেষ পর্যন্ত বিএনপি ও ছাত্রদলের সঙ্গে সংঘর্ষে গড়িয়েছে। হবিগঞ্জে পদযাত্রার পর নেতাদের গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবাদের নামে এনসিপি নেতারা বিএনপিকে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও কটূক্তি ও হুমকি দিয়েছেন। রাজপথ যেন শহীদদের স্মৃতিচারণের জায়গা নয়, বরং দলীয় প্রতিপক্ষকে গালি দেওয়ার মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

কোথায় গেল সেই জুলাইয়ের চেতনা? যে চেতনায় হাজার হাজার তরুণ রাস্তায় নেমেছিল, গুলি খেয়েছিল, চোখ হারিয়েছিল, জীবন দিয়েছিল? কোথায় সেই সভা-সমাবেশ, যেখানে শুধু আহত ও নিহতদের নাম উচ্চারিত হবে, তাদের পরিবারের কান্না শোনা যাবে, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ন্যায়বিচারের দাবি উঠবে? কোথায় সেই নীরব শ্রদ্ধা, যেখানে কোনো দলের পতাকা বা নেতার বক্তৃতা থাকবে না—শুধু শহীদদের স্মৃতি?

এটা কি নিছক অবহেলা? নাকি ইচ্ছাকৃত?

জুলাইকে যদি শুধু রাজনৈতিক পুঁজি বানিয়ে রাখা হয়, যদি শহীদদের রক্তকে শুধু দলীয় বক্তৃতার মসলা হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেই জুলাই ধীরে ধীরে মরে যাবে। যারা আজ পদযাত্রার নামে বিএনপিকে গালি দিয়ে মাঠ গরম করছে, তারা কি সত্যিই জুলাইয়ের উত্তরাধিকার রক্ষা করছে? নাকি জুলাইকে ধ্বংস করে নিজেদের রাজনৈতিক জায়গা তৈরির চেষ্টা করছে?

জুলাই কোনো দলের সম্পত্তি নয়। এটি জনতার অভ্যুত্থান। শহীদ ও আহতদের স্মৃতি যদি দলীয় কোন্দলের আড়ালে হারিয়ে যায়, তাহলে আগামী প্রজন্ম শুধু গালি-গালাজ আর সংঘর্ষের ইতিহাসই শুনবে—সেই রক্তাক্ত রাজপথের প্রকৃত গল্প নয়।

যারা জুলাইকে বাঁচাতে চায়, তাদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শহীদদের নামে সভা করতে হবে, আহতদের পাশে দাঁড়াতে হবে, পরিবারগুলোকে সম্মান জানাতে হবে। নয়তো একদিন দেখা যাবে—জুলাই শুধু ক্যালেন্ডারের একটি মাস হয়ে রয়ে গেছে, আর তার চেতনা ধ্বংস হয়ে গেছে রাজনৈতিক স্বার্থের অগ্নিতে।

জুলাইকে ম্লান করছে কারা?

 


জুলাইকে ম্লান করছে কারা?

জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই আন্দোলনে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন, আবার অনেকে আজও সেই ঘটনার শারীরিক ও মানসিক ক্ষত বহন করছেন। এই অভ্যুত্থান কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল বৈষম্য, দমন-পীড়ন, দুর্নীতি, গুম, বিচারহীনতা এবং রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে এক গণজাগরণ। তাই জুলাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণ মানে শুধু একটি তারিখ স্মরণ করা নয়; এর পেছনের কারণ, প্রেক্ষাপট ও আত্মত্যাগকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, জুলাই মাসজুড়ে সেই স্মৃতিচর্চা কি আমরা যথেষ্ট দেখেছি?

যেসব রাজনৈতিক শক্তি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম সারির সমন্বয়কেরা জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের দাবিদার, তাদের কাছ থেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ছিল মাসব্যাপী স্মরণমূলক কর্মসূচি। প্রত্যাশা ছিল শহীদদের স্মরণসভা, আহতদের নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান, শহীদ পরিবারের সঙ্গে সংহতি, গণশুনানি, গবেষণা প্রকাশ, আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য জুলাইয়ের ইতিহাস তুলে ধরার উদ্যোগ।

কিন্তু জনপরিসরে যে চিত্র বেশি দৃশ্যমান হয়েছে, তা হলো রাজনৈতিক বক্তব্য, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কোথাও কোথাও পদযাত্রা বা সমাবেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করাই যেন মূল আলোচনায় পরিণত হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—জুলাইয়ের মূল চেতনা কি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার আড়ালে চাপা পড়ছে?

আরও একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। জুলাই অভ্যুত্থান কেন হয়েছিল? যে বৈষম্য, দুর্নীতি, গুম, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, সেই বাস্তবতাকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার জন্য কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

জুলাইজুড়ে কি আমরা এমন কোনো বড় প্রামাণ্যচিত্র উৎসব দেখেছি, যেখানে সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ, নিহত-আহতদের সাক্ষ্য বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের দলিল উপস্থাপন করা হয়েছে? পতিত সরকারের আমলে আলোচিত দুর্নীতি, গুম, নির্যাতন ও বিচারহীনতার নথিভিত্তিক প্রদর্শনী কি আয়োজন করা হয়েছে? জুলাইয়ের গ্রাফিতি, আলোকচিত্র, ভিডিও আর্কাইভ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার কিংবা তথ্যভিত্তিক ডকুমেন্টারি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক কোনো উদ্যোগ কি চোখে পড়েছে?

এসব উদ্যোগ থাকলে জুলাই শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে থাকত না; বরং একটি জীবন্ত জাতীয় স্মৃতিতে পরিণত হতো। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানতে পারত কেন মানুষ জীবন দিয়েছিল, কী ছিল সেই আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি এবং কোন বাস্তবতার বিরুদ্ধে সেই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল।

জুলাই স্মৃতিকে স্মরণের পরিবর্তে রাজনৈতিক সংঘাত কি ইচ্ছাকৃত। যদি একটি ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিচর্চার চেয়ে দলীয় রাজনীতি বেশি গুরুত্ব পায়, তাহলে সেই অভ্যুত্থানের মূল বার্তা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্ষতি তখনই হয়, যখন শহীদদের আত্মত্যাগ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছায়ায় ঢাকা পড়ে। একটি গণ-অভ্যুত্থান কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়; এটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতি। তাই জুলাইকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন গবেষণা, দলিল সংরক্ষণ, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ, গ্রাফিতি ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী, শহীদ ও আহতদের জীবনকাহিনি তুলে ধরা এবং সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চা।

আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আমরা কি জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করছি, নাকি শুধু জুলাইকে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করছি? যদি স্মৃতির চেয়ে স্লোগান, গবেষণার চেয়ে বক্তৃতা এবং শহীদদের চেয়ে দলীয় প্রতিযোগিতা বেশি গুরুত্ব পায়, তাহলে জুলাইকে ম্লান করে বলে প্রচারিত এমন ব্যক্তিরা  বা দল। এটা কি আমাদের সম্মিলিত রাজনৈতিক ব্যর্থতা? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো ভিন্ন উদ্দেশ্য? 

জুলাই অভ্যুত্থানের স্বতঃস্ফূর্ততা: জনগণের অংশগ্রহণই ছিল আসল শক্তি

 জুলাই অভ্যুত্থানের স্বতঃস্ফূর্ততা: জনগণের অংশগ্রহণই ছিল আসল শক্তি

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামোর কথা প্রাধান্য পায়। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই অভ্যুত্থানের অন্যতম গাঠনিক বৈশিষ্ট্য ছিল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন কীভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদানের মধ্য দিয়ে গণ-অভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয়—সেই প্রশ্নই তার আলোচনার কেন্দ্রে।

রাজনৈতিক সাহিত্যে ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’ নতুন কোনো ধারণা নয়। লেনিন পার্টির কেন্দ্রীভূত নেতৃত্বের ওপর জোর দিলেও রোজা লুক্সেমবার্গ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। অরাজপন্থীরা একে বিপ্লবের অপরিহার্য শর্ত বলে মনে করেন। তবে বাংলাদেশে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা কম এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়। নব্বই দশকের পর জাপাতিস্তা আন্দোলন, আরব বসন্ত বা অকুপাই ওয়াল স্ট্রিটের মতো ঘটনাগুলো দেখিয়েছে যে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কাঠামো ছাড়াই বড় আকারের আন্দোলন সম্ভব।

জুলাই অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততাকে তিনভাবে বোঝা যায়। প্রথমত, এটি প্রস্তুতিহীন বা আকস্মিক নয়। অনেক আন্দোলনকারী ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই, নো-ভ্যাট আন্দোলন, শাপলা চত্বর বা মোদি-বিরোধী আন্দোলনের অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছিলেন। তাদের অংশগ্রহণ ছিল পূর্ব অভিজ্ঞতা ও সম্পর্ক-জালের ফল।

দ্বিতীয়ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছিল অনুভূমিক। কেন্দ্রীয় কোনো কঠোর কাঠামো ছিল না। স্থানীয় পর্যায়েই কর্মসূচি নির্ধারিত হতো। অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়েও প্রান্তিক এলাকার অনেক আন্দোলনকারী কেন্দ্রীয় নেতাদের সম্পর্কে খুব কমই জানতেন। গ্রাফিতিতে নেতার ছবির পরিবর্তে শহীদ স্মরণ ও কর্মসূচি প্রাধান্য পেয়েছিল। অভ্যুত্থানের পরবর্তী কয়েক দিনের ‘রাষ্ট্রহীন’ অবস্থায় সহিংসতা মোকাবিলাও স্থানীয়ভাবেই সংগঠিত হয়েছিল।

তৃতীয়ত, সক্রিয় আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি নীরব দর্শকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। দোকানদার বিনামূল্যে পানি দিয়েছেন, রিকশাচালক বিনা ভাড়ায় যাত্রী নিয়ে গেছেন, বাড়ির ভেতর থেকে পানির বোতল বা টুথপেস্ট ছুড়ে দেওয়া হয়েছে কাঁদানে গ্যাসের প্রভাব কমাতে। এই পরোক্ষ অংশগ্রহণ ছাড়া আন্দোলন বৈপ্লবিক চেহারা পেত না।

সাম্প্রতিক বিশ্বের অনেক আন্দোলনেই একই ধরনের অনুভূমিক চরিত্র দেখা যায়। এর পেছনে কাজ করে রাজনৈতিক দলের প্রতি অনাস্থা এবং দমনমূলক শাসনে বড় সংগঠন গড়ে তোলার অসম্ভবতা।

নেতৃত্বের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু কেবল নেতা ও সংগঠনের গল্প দিয়ে গণ-অভ্যুত্থান বোঝা যায় না। বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় প্রায়শই নেতৃত্বের সিদ্ধান্তকেই কেন্দ্রে রাখা হয়। স্বতঃস্ফূর্ততার স্বীকৃতি না দিলে অভ্যুত্থানের আসল চরিত্র অধরা থেকে যায়। একই সঙ্গে এই স্বতঃস্ফূর্ততাই পরবর্তী সময়ে অর্জন ধরে রাখা ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনাকে কঠিন করে তোলে—এটি বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকেও স্পষ্ট।

জুলাই অভ্যুত্থানকে পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে হলে সক্রিয় আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণের ইতিহাসও তুলে আনতে হবে। সেই ‘নীরব দর্শকদের’ সক্রিয়তা এখনো অনেকটাই অনালোচিত রয়ে গেছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বিতর্কিত করে লাভ কী?

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বিতর্কিত করে লাভ কী?

ভাই-বোনেরা, স্বাগতম আপনাদের প্রিয় পডকাস্ট “যা বলবো সত্যই বলবো”তে! আজকের এপিসোড: “জুলাই অভ্যুত্থান কার? আমার! না তোমার! না, আমাদের সবার… কিন্তু আসলে যার যার সুবিধা!”

দেখুন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন ছাত্ররা রাস্তায় নামলো, তখন সেটা ছিল সাধারণ মানুষের রাগ। টাকা নেই, চাকরি নেই, স্বাধীনতা নেই — সবাই মিলে বললো, “ব্যাস, আর না!” রক্ত ঝরলো, স্বৈরাচার গেলো। জুলাই ছিল সবার। জনগণের। ধনী-গরিব, ছাত্র-শিক্ষক — সবার।

কিন্তু তারপর কী হলো?

হঠাৎ কয়েকটা দল এসে বললো — “এই জুলাই তো আমাদের!” এনসিপি আর জামায়াত-সংশ্লিষ্ট কিছু বন্ধু তো জুলাইকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরলো যেন এটা তাদের একার প্রেমিকা। “জুলাই আমাদের চেতনা! জুলাইয়ের রাজনীতি আমরাই করবো!”

আরে ভাই, জুলাই তো কোনো দলের পার্টি অফিস ছিল না! এটা ছিল গণ-অভ্যুত্থান। সবার। কিন্তু না, কিছু নেতা তো এটাকে নিজেদের ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য ব্যবহার করতে শুরু করলো। যেন জুলাই একটা আইফোন — “আমারটা সবচেয়ে অরিজিনাল!”

আর এখন তো নতুন টুইস্ট! কিছু সংস্কৃতিকর্মী আর সাংবাদিকও ভোল পাল্টাতে শুরু করেছে। যারা একসময় হাসিনার আমলে গান গাইতো, লেখালেখি করতো, তারা এখন জুলাইকে “ডিপ স্টেটের কারসাজি” বানিয়ে ফেলেছে। মানে, আবারও হাসিনার চামচামি করতে চায় আরকি! আগে যারা “ফ্যাসিস্ট” বলে চিৎকার করতো, এখন বলছে “ষড়যন্ত্র ছিল”। ভোল পাল্টানোর এত সুন্দর উদাহরণ আর কোথায় পাবেন?

ফলে কী হলো? যে জুলাই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, সেই জুলাই এখন বিভেদের কারখানা। আওয়ামী লীগ বলছে “বিদেশি ষড়যন্ত্র”, এনসিপি-জামায়াত বলছে “আমাদের সম্পত্তি”, আর কিছু বুদ্ধিজীবী বলছে — “আসলে ডিপ স্টেট!” আর সাধারণ মানুষ বলছে, “ভাই, আমরা কি শুধু ভোট আর লাইকের জন্য রক্ত দিয়েছিলাম?”

তাই আজকের মেসেজ: জুলাই কারো একার সম্পত্তি নয়। যারা এটাকে নিজেদের পকেটে ভরতে চায় বা ডিপ স্টেটের গল্প বানিয়ে পুরনো প্রভুকে খুশি করতে চায়, তারা আসলে জুলাইয়ের চেতনাকেই হত্যা করছে।

জুলাই ছিল জনগণের। জুলাই থাকুক জনগণের। নয়তো একদিন দেখবেন, কার্টুনে জুলাইয়ের স্পিরিট এসে বলছে — “আমাকে বাঁচাও ভাই, এরা তো আমাকে দলীয় প্রচারণা আর ভোল-পাল্টানোর পোস্টার বানিয়ে ফেলেছে!”

শেয়ার করুন, সচেতন হোন। জুলাইকে বাঁচান দলীয় লোভ ও ভোল-পাল্টানোর হাত থেকে!

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বিতর্কিত করছে কারা?

 জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বিতর্কিত করছে কারা?

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনাপ্রবাহ। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন রূপ নেয় স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই পরিবর্তনকে অনেকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ বলে অভিহিত করেন। কিন্তু মাত্র দুই বছরের মাথায় সেই অভ্যুত্থানই হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

কে এই বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে?

প্রথম সারিতে রয়েছে আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থক নেটওয়ার্ক। ফেসবুক, ইউটিউব ও প্রবাসী মিডিয়ায় তারা নিয়মিত প্রচার করছেন যে জুলাই অভ্যুত্থান আসলে কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণ-উত্থান ছিল না — এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে জনরোষকে তারা নানাভাবে বিকৃত করে উপস্থাপন করছেন।

এর পাশাপাশি এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি)জামায়াত-সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোও বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। জুলাই অভ্যুত্থান মূলত ছিল জনমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততার ফসল। এটি কোনো একক রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি ছিল না। কিন্তু এনসিপি ও জামায়াত-সমর্থকরা এটিকে নিজেদের কুক্ষিগত করার চেষ্টা করে চলেছে। “জুলাই আমাদের”, “জুলাইয়ের চেতনা আমরাই বহন করছি” — এ ধরনের প্রচারণা ও জুলাই কেন্দ্রিক রাজনীতি শুরু করে তারা অভ্যুত্থানের মূল চেতনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে জুলাই আর সকলের ঐক্যের প্রতীক থাকছে না, হয়ে উঠছে দলীয় রাজনীতির হাতিয়ার।

তৃতীয় ধারা হলো কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক, তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও বামপন্থী গ্রুপ। তারা কিছু ব্যক্তি মানুষের বা সমন্বয়কের সমালোচনা করতে গিয়ে আন্দোলনের মূল স্পিরিটকেই অস্বীকার করে বসছে। এরা আস্তে আস্তে শেখ হাসিনার অভিযোগকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে এবং একই লাইনে কথা বলা শুরু করেছে।

কেন এই বিতর্ক?

কারণ জুলাই অভ্যুত্থান শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয় — এটি একটি আখ্যান। যারা ক্ষমতায় আছে, তারা এটিকে পবিত্র রাখতে চায়। যারা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে, বা ক্ষমতার সাথে পুরোপুরি নেই- তারা এটিকে কলঙ্কিত করতে চায়। আর যারা নতুন রাজনীতি করছে, তারা এটিকে নিজেদের সম্পত্তি বানিয়ে ফায়দা তুলতে চায়। জুলাইকে ভিন্নভাবে ব্যবহারের অ্যালগরিদম এই মেরুকরণকে আরও তীব্র করছে।

শেষ কথা জুলাইয়ের ত্যাগ ছিল সকল জনমানুষের। এটি কোনো দলের একার নয়। যেকোনো পক্ষ যদি এটিকে দলীয় রাজনীতির হাতিয়ার বানায়, তাহলে অভ্যুত্থানের মূল চেতনা — গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও ঐক্য — ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সত্যিকারের সম্মান দেখাতে হলে আমাদের আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা করতে হবে। জুলাই যেন বিভেদের নয়, ঐক্যের প্রতীক হয়ে থাকে।

আপনার মতামত কী? জুলাইয়ের চেতনা কীভাবে রক্ষা করা যায়?

© all rights reserved
made with by templateszoo