ফিরে দেখা ৩ আগস্ট ২০২৪ “নিজেদের জনগণের ওপর গুলি নয়।” “এখন থেকে গুলি নয়।”

0

 


ফিরে দেখা ৩ আগস্ট ২০২৪

“নিজেদের জনগণের ওপর গুলি নয়।” “এখন থেকে গুলি নয়।”

ঠিক দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট। দেশ তখন রক্তাক্ত। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৯ জুলাই মধ্যরাত থেকে সেনাবাহিনী সারাদেশে মোতায়েন। পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবির গুলিতে শত শত প্রাণহানি ঘটেছে। পুরো দেশ তাকিয়ে আছে সেনাবাহিনীর দিকে—তারা কি অন্য বাহিনীর সঙ্গে মিলে আন্দোলন দমন করবে, নাকি রক্তপাত থামাতে এগিয়ে আসবে?

সেই সংকটময় মুহূর্তে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান (যিনি মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ২৩ জুন দায়িত্ব নিয়েছিলেন) তাঁর প্রথম অফিসার্স অ্যাড্রেস আহ্বান করেন। ঢাকা সেনানিবাসের হেলমেট হলে এবং দেশের সব গ্যারিসন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন অফিসাররা। দুপুর দেড়টায় শুরু হওয়া সেই বৈঠক প্রায় দেড় ঘণ্টা স্থায়ী হয়।

সেনাপ্রধান প্রথমে প্রায় ৩০ মিনিট বক্তব্য রাখেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন কেন সরকারের নির্দেশে সেনাবাহিনীকে বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় মোতায়েন করা হয়েছে। “সংকটময় মুহূর্তে সরকার চাইলে আমরা মোতায়েন হতে বাধ্য,” বলেন তিনি। তবে স্পষ্ট করে যোগ করেন—সেনারা কাউকে হত্যা করেনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কত রাউন্ড গুলি ও ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়েছে, তার পরিসংখ্যানও দেন।

এ সময় তিনি দুটি গানের কথা উল্লেখ করেন। একটি: “আমি তো প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার উপরে পড়েছে।” এর মাধ্যমে তিনি বোঝান, তিনি এই সংকট ডাকেননি; সংকট নিজেই সেনাবাহিনীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুর “আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেব আকাশে” গানটির কথাও বলেন। সেই মুহূর্তে হলভর্তি অফিসারদের মধ্যে আবেগের ছোঁয়া লাগে।

এরপর তিনি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা জানতে চান। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও ঊর্ধ্বতনদের কথা বলতে নিরুৎসাহিত করা হয়। ক্যাপ্টেন, মেজর ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল পর্যায়ের ছয়-সাতজন অফিসার সরাসরি মতামত দেন।

এক অফিসার বলেন, খুলনায় টহলরত সেনাদের উদ্দেশে আন্দোলনকারীরা যে অপমানজনক শব্দ ব্যবহার করেছে, তা স্বাধীন বাংলাদেশে কখনো শোনা যায়নি। আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি প্রশ্ন করেন: “কিসের জন্য? কার জন্য?”

রাজশাহী মেডিকেল কর্পসের এক নারী অফিসার বাংলায় লেখা এক আবেগঘন বক্তব্য পাঠ করে বলেন: “দেশের প্রতিটি মা আজ এই মৃত্যুর জন্য কাঁদছে।” তিনি তাঁর প্রতিবেশী মীর মুগ্ধের কথা উল্লেখ করেন, যিনি উত্তরায় আন্দোলনকারীদের পানি বিলাতে গিয়ে নিহত হন। পুরো হল নীরব হয়ে যায়।

গম্ভীর পরিবেশের মধ্যে হাস্যরসের এক মুহূর্তও আসে। মোহাম্মদপুরে গুলির একটি ভাইরাল ভিডিওর কথা উল্লেখ করে এক ক্যাপ্টেন বলেন, ভিডিওতে তাঁকে দেখে পরিবার ও বন্ধুরা সমালোচনা করেছেন। “তবে আমার স্ত্রী আমাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে মজা করে বলেছে—আমাকে নাকি ‘কিউট’ দেখাচ্ছিল।” সেনাপ্রধান হাসতে হাসতে বলেন, “আমাকে কেউ কখনো কিউট বলেনি।” তারপর গম্ভীর হয়ে যোগ করেন: “সেনাবাহিনী সর্বাগ্রে দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবে।”

দুপুর ২:৪০-এর দিকে স্বল্প বিরতির পর বৈঠক আবার শুরু হয়। দ্বিতীয় পর্ব সংক্ষিপ্ত। সেনাপ্রধান তরুণ অফিসারদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে চূড়ান্ত নির্দেশ দেন: “জনগণের ওপর গুলি চলবে না।” “এখন থেকে গুলি নয়।”

এই সিদ্ধান্তই ইতিহাস বদলে দেয়। এর ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা বোন শেখ রেহানাসহ সামরিক বিমানে ভারতে পালিয়ে যান। সেনাবাহিনী সেদিন জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। আইএসপিআর-এর বিজ্ঞপ্তিতে সেনাপ্রধানের বক্তব্যেও ইঙ্গিত ছিল: “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জনগণের স্বার্থে এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সবসময় জনগণের পাশে থাকবে।”

এক বছর পর ফিরে তাকালে দেখা যায়, সেদিনের সেই বৈঠক শুধু একটি সামরিক সিদ্ধান্ত ছিল না। এটি ছিল বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তরুণ অফিসারদের সাহসী কণ্ঠস্বর এবং সেনাপ্রধানের সেই নির্দেশ—‘নিজেদের জনগণের ওপর গুলি নয়’—দেশকে এক ভয়াবহ রক্তপাত থেকে রক্ষা করেছিল। আর সেই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত এক স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team