আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড রহস্যজট খুললো!

আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড রহস্যজট খুললো!

সাবেক আইজিপি যা বললেন, তাতে প্রমাণিত যে এটা হাসিনার নির্দেশেই হয়েছিল-

শারমিন চৌধুরীর সাক্ষাৎকারে সাবেক আইজিপি বলেছেন, সাগর-রুনি হত্যার রহস্য তাঁর হাতে ছিল না। সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে তিনি বলেন ‘ভাই থামেন, এটা আমার হাতে নাই।’ এরপর প্রশ্ন একটাই দাঁড়ায়। দেশের পুলিশপ্রধান যদি বলেন তদন্ত তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল না, তাহলে নিয়ন্ত্রণ কার হাতে ছিল? পরের উত্তরে তিনি বলেন দেশের নির্বাহী প্রধানের হাতে সব ছিল। তার মানে দাঁড়ায় এটা হাসিনার নির্দেশেই হয়েছিল। হাসিনাই সব জানতেন। অথচ কতো নাটক হয়েছিল এটা নিয়ে!

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া ফ্ল্যাটে মাছরাঙার বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনিকে খুন করা হয়। পাশে ছিলেন শিশু মেঘ। রুনির ভাই নওশের আলম রোমান মামলা করেন। তদন্ত গেল থানা থেকে ডিবি, ডিবি থেকে র‌্যাব, পরে টাস্কফোর্স ও পিবিআই। আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ ১২৯ বার পেছানো হয়েছে। সর্বশেষ তারিখ ৩০ সেপ্টেম্বর।

এতবার সময় নেওয়া মানে তদন্ত চলছে না। মানে তদন্ত আটকে রাখা হয়েছে।

ঘটনার সময় ক্ষমতায় ছিলেন শেখ হাসিনা। আইজিপি ছিলেন হাসান মাহমুদ খন্দকার। খুনের দুই দিন পরই তিনি ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’র কথা বলেছিলেন। তারপর বছরের পর বছর—কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন নেই, কোনো মূল হোতা নেই, কোনো রায় নেই। পুলিশপ্রধান যদি সত্যিই বলেন বিষয়টা তাঁর হাতে ছিল না, তাহলে সেই স্বীকারোক্তি সরাসরি প্রধান নির্বাহীর দপ্তরের দিকে আঙুল তোলে। কারণ বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জবাবদিহি করেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে।

আরও দুটো প্রশ্ন মাথায় এল-

প্রথম প্রশ্ন—কে হত্যা করেছে। দ্বিতীয় প্রশ্ন—কে তদন্ত আটকে রেখেছে। সাবেক আইজিপির বক্তব্য দ্বিতীয় প্রশ্নের ওপর নির্ভরশীল। তিনি বলেননি যে, ‘হাসিনা খুনের নির্দেশ দিয়েছেন।’ তিনি বলেছেন, রহস্য তাঁর হাতে ছিল না। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পুলিশ কর্মকর্তা নিজেই বলছেন, এই মামলা সাধারণ অপরাধ তদন্তের মতো চলেনি। উপর থেকে চেপে রাখা হয়েছে।

১৪ বছর সেই চাপাই মূল প্রমাণ। আওয়ামী লীগ আমলে এই মামলা শেষ হয়নি। র‌্যাব তদন্তে রেখেও শেষ করেনি। হাইকোর্ট ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে র‌্যাব সরিয়ে টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন। তারপরও প্রতিবেদন আসেনি। যদি খুনি সাধারণ চোর-ডাকাত হতো, এত বছর ধরে রাষ্ট্র এভাবে চুপ থাকত না।

গত কয়েক দিনে নতুন সূত্র এসেছে অন্য জায়গা থেকে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা বলেছেন, অন্য মামলার সিডিআর ও ডিজিটাল আর্কাইভ ঘাঁটতে গিয়ে সাগর-রুনির সঙ্গে যোগসূত্র পাওয়া গেছে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের নাম উঠেছে। একজন ‘সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের’ সম্পৃক্ততার কথা বলেছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। নাম প্রকাশ করেননি। বলা হয়েছে, খুনের আগের রাতে র‌্যাবের গোয়েন্দা লাইনকে ‘কালকে কিছু ঘটবে, প্রস্তুত থাকো’ জাতীয় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। নিখোঁজ ডিভাইসের কথাও উঠেছে—সংবেদনশীল নথি থাকার সন্দেহ।

গোয়েন্দা সংস্থা আগের রাতে কেন প্রস্তুতির কথা শুনত? ডিভাইস কেন উধাও? তদন্ত কেন যুগ যুগ ধরে থেমে থাকত?

পলাতক শেখ হাসিনা সাগর রুনি হত্যাকাণ্ডে যে জট রেখে গিয়েছেন তার রহস্য উন্মোচন হবে এবার।সাবেক আইজিপির সাক্ষাৎকারও সেটার প্রমাণ। 

যে রাষ্ট্রযন্ত্র তাঁর অধীনে ১৪ বছর এই খুনের নথি আটকে রেখেছে, সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক দায় এড়ানো যায় না। নির্দেশ দিয়েছেন কি দেননি, সেটা তদন্ত ও বিচার বলবে। তদন্তকে অচল করে রাখাই প্রমাণ করে যে এটার পেছনে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর হাত রয়েছে।  

ডেইলি স্টার যা লিখলো, পাকিস্তান তা বলেনি।


ডেইলি স্টার যা লিখলো, পাকিস্তান তা বলেনি।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আরও ৬-৭টি মুসলিম দেশ আগ্রহী। কোনো দেশের নাম তিনি দেননি। তুরস্ক আগে মিসরসহ অন্য দেশগুলোর কথা বলেছে। খবর এটাই।

কিন্তু ডেইলি স্টার বাংলার ফেসবুক পোস্টে শিরোনাম ৬-৭ দেশ। নিচে সঙ্গে সঙ্গে লেখা—বাংলাদেশ সর্বশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ছবি, ক্যাপশন, হাইলাইট—সব মিলিয়ে পাঠকের চোখে পড়ে একটাই নাম। বাংলাদেশ।

এটা নিরপেক্ষ উপস্থাপন নয়। এটা সিলেকটিভ ফ্রেমিং।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দেশগুলোর নাম বলেননি। তারপরও বাংলাদেশকে আলাদা করে শিরোনামে দিল ডেইলি স্টার। কারণ এই নামটাই প্রতিবেশী দেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে। ভারতীয় মিডিয়া দুই সপ্তাহ ধরে একই সুরে লিখছে—ঢাকা ঢুকলে দিল্লির চিন্তা বাড়বে। ডেইলি স্টার সেই উদ্বেগকেই আরও উস্কে দিতে বাংলাদেশের নাম হেডলাইনে দিয়ে ঢাকার পাঠকের সামনে এনে দিল। শিরোনামে বহু দেশ। জোরে এক দেশ। ভারতপন্থী আউটলেটগুলোর পুরনো কৌশল এটাই।

বাস্তবতা কী? বাংলাদেশ এখনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পায়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সংসদে বলেছেন, চুক্তিকে ইতিবাচক দেখা হচ্ছে। সদস্যরা চাইলে বিবেচনা করা হবে। তিনি এটাকে মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলেছেন। অন্যদের উদ্বেগের অবকাশ নেই। প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, যোগ দিলে অন্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক কাটবে না। সিদ্ধান্ত হয়নি। আগ্রহ আর সদস্যপদ এক জিনিস নয়। পোস্টে সেই পার্থক্য মুছে দেওয়া হয়েছে।

৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান চুক্তি সই করেছে। এক দেশের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা বলে গণ্য করার কথা। পাকিস্তান বলেছে, চুক্তি প্রতিরক্ষামূলক। কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়। ট্রাম্প এটাকে সাহসী পদক্ষেপ বলেছেন। সম্প্রসারণের দরজা খোলা। বাংলাদেশ সেই সম্ভাব্য তালিকার এক দেশ—৬-৭টির মধ্যে একটি।

যখন কোনো মুসলিম দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ায়, কিছু মিডিয়া সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন তোলে—এতে ভারত কী ভাববে। বাংলাদেশের সার্বভৌম হিসাবকেও সেই প্রশ্নের আয়নায় দেখা হয়।  

৬-৭ দেশ আগ্রহী হলে শিরোনাম সেটাই থাকা উচিত। নাম না থাকলে নাম না দেওয়াই সাংবাদিকতা। বাংলাদেশকে হাইলাইট করা মানে খবরকে প্রতিবেশীর অস্বস্তির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া। এটা সংবাদ নয়, ইনটেনশনাল সিগন্যাল, তোষামুদির ভাষা। 

পাকিস্তান বলেছে বহু দেশ। ডেইলি স্টার দেখাল বাংলাদেশ। দুটো বাক্য পাশাপাশি রাখলে ফারাকটা নিজেই বোঝা যায়।

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন সমীকরণ: কূটনীতির নতুন মোড়।

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন সমীকরণ: কূটনীতির নতুন মোড়। 

ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক টেবিল এখন একই সাথে দুটি ভিন্ন হিসাব মেলাতে ব্যস্ত। একদিকে বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর, আর অন্যদিকে ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দাবি। আপাতদৃষ্টিতে এই দুটি ইস্যু আলাদা মনে হলেও, পর্দার আড়ালের রাজনীতিতে এরা একে অপরের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।

গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তারেক রহমানকে দুই দফায় দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানান বলে ভারত দাবি করছে। কিন্তু আমন্ত্রণের কথা বললেও প্রথমটি ছিল দ্বিপাক্ষিক সফরের আমন্ত্রণ, তাও সুবিধামতো সময়ে এবং দ্বিতীয়টি ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য। কিন্তু দীর্ঘ ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এই আমন্ত্রণের কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায় নি। সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শহীদুল করিম জানিয়েছেন, এই সম্ভাব্য সফর নিয়ে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মাঝে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, যদিও সফরের সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

এই সফর ঝুলে থাকার পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতিমধ্যে তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছে। ফলে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা ঢাকার নতুন সরকারের জন্য কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর রাজনৈতিক মর্যাদার বিষয়।

তবে দিল্লির মনোভাব এখানে বেশ ভিন্ন। ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বিনা সিক্রির মতে, প্রত্যর্পণ কোনো বিমানের বোর্ডিং পাস নয় যে চাইলেই দ্রুত কাউকে ফেরত পাঠানো যাবে। এটি একটি দীর্ঘ এবং জটিল আইনি প্রক্রিয়া। তাই তারেক রহমানের রাষ্ট্রীয় সফরের সাথে এই প্রত্যর্পণের বিষয়টিকে শর্ত হিসেবে জুড়ে দেওয়াকে তিনি কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বলে মন্তব্য করেছেন।

কূটনীতির পরিভাষায় যাই বলা হোক না কেন, বাস্তবতার টেবিলে তারেক রহমানের সফর এবং হাসিনার প্রত্যর্পণ ফাইল দুটি এখন পাশাপাশিই অবস্থান করছে। একদিকে নতুন সরকারের সাথে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যেমন দিল্লির জন্য প্রয়োজন, অন্যদিকে দেশের ভেতরের political ও আইনি আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা ঢাকার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই হিসাবের জটিল সমীকরণ আগামী দিনে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের গতিপথ কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

মক্কা প্যাক্ট: বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ, ভারতের দুশ্চিন্তার কারণ?

মক্কা প্যাক্ট: বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ, ভারতের দুশ্চিন্তার কারণ?

মক্কা—মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র শহর।

আর সেই মক্কা থেকেই সামনে এসেছে নতুন একটি প্রতিরক্ষা উদ্যোগ—সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত মক্কা প্যাক্ট।

অনেকেই একে বলছেন “মুসলিম ন্যাটো”।

কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো—এটি কি সত্যিই নতুন কোনো সামরিক ব্লক? আর বাংলাদেশ এতে যুক্ত হলে কী লাভ হতে পারে?

চলুন, বিষয়টি বুঝে নেওয়া যাক।

৭ আগস্ট ২০২৬ সালে তিন দেশ একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে পৌঁছায়। মূল ধারণা—সদস্যদের নিরাপত্তা সহযোগিতা, সামরিক সমন্বয় এবং যৌথ প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানো।

তবে এটিকে এখনই ন্যাটো বলা যাবে না।

ন্যাটোর মতো সমন্বিত সামরিক কমান্ড বা বহু দশকের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো নেই।

বরং এটিকে বলা যায়—একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির চেষ্টা।

আর বাংলাদেশের জন্য এখানেই রয়েছে সম্ভাবনা।

বাংলাদেশ আজ এমন এক অবস্থানে আছে, যেখানে শুধু একটি শক্তি বা একটি অঞ্চলের ওপর নির্ভর করে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়।

সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।

তুরস্ক বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠছে।

আর পাকিস্তানের সঙ্গেও দীর্ঘদিনের দূরত্বের পর নতুন যোগাযোগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তাই বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা বিবেচনা করে, সেটি শুধুই ধর্মীয় আবেগের কারণে হবে না।

এটি হতে পারে বাংলাদেশের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থের প্রশ্ন।

কিন্তু ভারত কি এতে চিন্তিত হবে?

ভারতের বিষয়টি নিয়ে সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করা স্বাভাবিক।

কারণ পাকিস্তান এই কাঠামোর অংশ, আর তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ।

তবে ভারতের অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করার কারণ নেই।

কারণ মক্কা প্যাক্ট এখন পর্যন্ত কোনো ভারতবিরোধী জোট নয়।

এখানে এমন কোনো ঘোষণা নেই যে, বাংলাদেশ বা অন্য কোনো দেশ এতে যোগ দিলেই ভারতকে লক্ষ্য করে সামরিক অবস্থান নেওয়া হবে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত নিজের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ কারও বিরুদ্ধে জোটে যাবে—এমন ধারণারও কারণ নেই।

বরং ঢাকা যদি কোনো নতুন নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক কাঠামো বিবেচনা করে, সেটি হবে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য।

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক একদিকে, আর বাংলাদেশের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরেকদিকে।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ অবশ্যই তার নিজস্ব স্বার্থ অনুযায়ী সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারে।

এটি কারও বিরুদ্ধে নয়।

এটি বাংলাদেশের নিজের ভবিষ্যতের জন্য।

তবে মক্কা প্যাক্টের আসল পরীক্ষা এখনো বাকি।

বড় কোনো সংকটে সদস্যরা সত্যিই একে অপরের পাশে দাঁড়াবে কি না—সেটিই হবে আসল প্রশ্ন-

তাই এখনই একে “মুসলিম ন্যাটো” বলা হয়তো ঠিক হবে না। তবে এটিকে গুরুত্বহীন বলারও সুযোগ নেই।

কারণ বিশ্ব যখন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তখন নতুন নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

আর বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন একটাই—

কোনো জোটে কে আছে, সেটা নয়।

সেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত—সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আর ভারতকেও বিষয়টি সেই দৃষ্টিতেই দেখা উচিত। 

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের পাশেই রয়েছে মিয়ানমার এবং দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, সীমান্তে অস্থিরতা এবং প্রায় ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বোঝা বাংলাদেশের জন্য শুধু মানবিক নয়, একটি বড় জাতীয় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জও।

ভবিষ্যতে সীমান্ত পরিস্থিতি আরও জটিল হলে বাংলাদেশকে নিজের প্রতিরক্ষা, কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করতে হবে। তাই নতুন কোনো আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো বিবেচনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়, বরং মিয়ানমার সীমান্ত, রোহিঙ্গা সংকট এবং দেশের সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তায় বাংলাদেশের সক্ষমতা ও কৌশলগত বিকল্প বাড়ানো। 

বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক বা কৌশলগত সম্পর্ক মানেই ভারতবিরোধিতা নয়।

একটি শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী এবং বহুমুখী বাংলাদেশ—শেষ পর্যন্ত পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্যই ভালো।

কারণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত—সবার সঙ্গে সম্পর্ক, কিন্তু সিদ্ধান্ত হবে বাংলাদেশের স্বার্থে।

বাংলাদেশের মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া উচিত; ডেইলি স্টার যে ন্যারেটিভ দাঁড় করাচ্ছে, তা আওয়ামী লীগ আমলের ভারতকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির পুরোনো সুর

 বাংলাদেশের মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া উচিত

ডেইলি স্টার যে ন্যারেটিভ দাঁড় করাচ্ছে, তা আওয়ামী লীগ আমলের ভারতকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির পুরোনো সুর

পররাষ্ট্রনীতিতে ‘র‌্যাশনাল অ্যাক্টর’ মডেল মানে শুধু যুদ্ধ এড়ানো নয়। এর অর্থ হলো—দেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানো, একপেশে নির্ভরতা ভাঙা এবং যে জোটে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হয় সেখানে জায়গা নেওয়া। ডেইলি স্টারের ‘মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া উচিত নয়’ শীর্ষক লেখাটি এই যুক্তিকে উল্টো দিকে টেনে নিয়েছে। প্রবন্ধটি আপাতদৃষ্টিতে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের ছদ্মবেশ ধরেছে, কিন্তু তার মূল সুর পরিচিত: ভারতকে বিরক্ত করো না, উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামো থেকে দূরে থাকো, আর ‘জোটনিরপেক্ষতা’ নামে পুরোনো ভারসাম্যহীন নীতিকেই জাতীয় স্বার্থ বলে চালিয়ে দাও।

এই সুর নতুন নয়। আওয়ামী লীগ আমলেও একই যুক্তি শোনা যেত—ভারতের সঙ্গে সামরিক সংঘাত এড়াতে হবে, তাই কৌশলগত বিকল্পও এড়াতে হবে। সমস্যা হলো, সেই নীতি বাংলাদেশকে নিরাপদ করেনি; বরং পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য ও নিরাপত্তায় একতরফা চাপের মুখে রেখেছে। মক্কা চুক্তি নিয়ে এখন যে আপত্তি তোলা হচ্ছে, তা অনেকটা সেই পুরোনো কাঠামোর প্রতিরক্ষা।

প্রথম যুক্তি ছিল—বাংলাদেশের গুরুতর বহিরাগত সামরিক হুমকি নেই, তাই প্রতিরক্ষা চুক্তির দরকার নেই। এটি বাস্তবতাবিরোধী। মিয়ানমার সীমান্তে রোহিঙ্গা সংকট, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, আরাকান সেনা ও সীমান্তবর্তী অস্থিরতা বাংলাদেশের নিরাপত্তাকে সরাসরি স্পর্শ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্ত্রধারী গোষ্ঠী, সীমান্তে পুশ-ইন, এবং প্রতিবেশীর কৌশলগত আধিপত্য—এগুলো ‘কূটনীতি দিয়েই সব মেটানো যাবে’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক চুক্তিতে যোগ দিয়েছে বলেই যে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া অবান্তর—এমন যুক্তি দুর্বল। প্রশ্ন হওয়া উচিত, বাংলাদেশ কি শুধু অন্যের হুমকির ছায়ায় থাকবে, নাকি নিজের কৌশলগত অবস্থান তৈরি করবে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প, সৌদি অর্থায়ন এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৈচিত্র্যময় করতে পারে। এটা যুদ্ধ বাড়ানো নয়, বিকল্প তৈরি করা।

দ্বিতীয় যুক্তি—পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ হলে বাংলাদেশকে ভারতের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। এটি চুক্তিকে ইচ্ছাকৃতভাবে সরল করে দেখানো। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চুক্তি ন্যাটো-ধাঁচের সম্মিলিত প্রতিরোধের কথা বলে; কিন্তু প্রতিটি পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় সেনা পাঠানোর বাধ্যবাধকতা যে অকাট্যভাবে লিখিত, তা প্রবন্ধ প্রমাণ করেনি। তুরস্ক নিজেই বলেছে, সহায়তার মাত্রা ও ধরন পরামর্শের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ হলো ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানো নয়; ভারতের সঙ্গে অসম কূটনৈতিক সম্পর্কে এককভাবে বন্দি না থাকা। তিস্তা, গঙ্গা, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি ও পুশ-ইনের সমাধান শুধু ‘আরও কূটনীতি’ দিয়ে হয়নি। সামুদ্রিক সীমানা ও স্থলসীমানা চুক্তিকে উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়, কিন্তু সেগুলো আওয়ামী লীগ আমলের ভারতঘেঁষা রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ফল—বাংলাদেশ যেসব ইস্যুতে বারবার ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে, সেগুলোর সমাধান নয়। সম্মিলিত প্রতিরোধ মানেই যুদ্ধ নয়; অনেক সময় তা চাপের ভারসাম্য তৈরি করে।

তৃতীয় যুক্তি—উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হবে, প্রবাসী শ্রম বিপন্ন হবে। বাস্তবতা উল্টোও হতে পারে। সৌদি আরব বাংলাদেশি শ্রমবাজারের অন্যতম বৃহত্তম গন্তব্য। যে রাষ্ট্র শ্রম, রেমিট্যান্স ও ধর্মীয় কূটনীতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেই রাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা কাঠামো থেকে দূরে থাকা কি সত্যিই ‘অভিবাসন কূটনীতি’? সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান ও কুয়েতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা জরুরি—কিন্তু সেটা সৌদিকে এড়িয়ে চলার অজুহাত হতে পারে না। বহুমুখী উপসাগরীয় নীতি মানে সবার সঙ্গে কথা বলা, এক পক্ষকে খুশি রাখতে অন্য পক্ষ থেকে সরে দাঁড়ানো নয়। আওয়ামী লীগ আমলে ভারতকেন্দ্রিক ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে বাংলাদেশ বারবার কৌশলগত বিকল্প সংকুচিত করেছে। সেই পথকেই এখন ‘সতর্কতা’ বলে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

চতুর্থ যুক্তি—হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বিপন্ন হবে। হরমুজ ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি। ইরান-সৌদি উত্তেজনা বাংলাদেশ চুক্তির বাইরে থাকলেও কমবে না। প্রশ্ন হলো, জ্বালানি সরবরাহকারী প্রধান রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক থাকলে ঝুঁকি কি বাড়ে, নাকি আলোচনার জায়গা বাড়ে? সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করতে পারে। উল্টোদিকে, শুধু ইরানকে না রাগানোর যুক্তিতে সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান জোট থেকে দূরে থাকা মানে আরেকটি নির্ভরতা মেনে নেওয়া—যে নির্ভরতা আগেও বাংলাদেশকে দুর্বল অবস্থানে রেখেছে।

পঞ্চম যুক্তি—বাংলাদেশ যুদ্ধে জড়ানোর সামর্থ্য রাখে না, তাই মানবিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ যুক্তির সঙ্গে দ্বিমতের জায়গা নেই যে যুদ্ধ জনগণের জন্য ধ্বংসাত্মক। কিন্তু মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া মানে যুদ্ধে নামার প্রতিশ্রুতি নয়; যুদ্ধ এড়ানোর মতো কৌশলগত ভার তৈরি করা। যে দেশ শুধু উন্নয়ন কথা বলে প্রতিরক্ষা বহুমুখীকরণ এড়ায়, সে-ই চাপে পড়ে সবচেয়ে বেশি। সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি আর জোটবদ্ধ প্রতিরোধ এক জিনিস নয়। তুরস্কের ড্রোন ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সৌদি বিনিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ সহযোগিতা বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে পারে—যাতে দেশকে হঠাৎ কোনো সংকটে এককভাবে দাঁড়াতে না হয়। স্নায়ুযুদ্ধের উদাহরণ টেনে সব প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বলে চালানো বুদ্ধিবৃত্তিক ফাঁকি। বাংলাদেশের প্রশ্ন আমেরিকা-সোভিয়েত প্রতিযোগিতায় নামার নয়; প্রতিবেশীর অসম চাপের মুখে বিকল্প অংশীদার রাখা।

ডেইলি স্টারের লেখা শেষ করেছে জোটনিরপেক্ষতার পক্ষে। কিন্তু বাংলাদেশের জোটনিরপেক্ষতা বহুদিন ধরেই নামে নিরপেক্ষ, কাজে ভারতকেন্দ্রিক ছিল। সেই নীতিকে এখন ‘জনগণের স্বার্থ’ বলে উপস্থাপন করা মানে পুরোনো ক্ষমতা কাঠামোর ভাষাকে নতুন করে সাজানো। ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশ যদি সত্যিই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে বিশ্বাস করে, তবে সৌদি আরব-তুরস্ক-পাকিস্তানের মতো মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা আলোচনাকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। যোগ দেওয়া মানে চোখ বন্ধ করে চুক্তি সই করা নয়। যোগ দেওয়া মানে শর্ত, সংরক্ষণ, জাতীয় স্বার্থ ও সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসা।

যে মিডিয়া বছরের পর বছর ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে ‘আঞ্চলিক বাস্তবতা’ বলে গ্রহণ করে, অথচ বাংলাদেশের কৌশলগত বহুমুখীকরণকে ‘যুদ্ধে জড়ানো’ বলে আতঙ্ক ছড়ায়—সেই মিডিয়ার সুরকে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ বলা যায় না। মক্কা চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, শর্ত চাওয়া যায়, ধীরগতিতে যাওয়া যায়। কিন্তু চুক্তিটিকে আগে থেকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা—এবং তাকে মানবিক নিরাপত্তার নামে ন্যায্যতা দেওয়া—আসলে পুরোনো পররাষ্ট্রনৈতিক নির্ভরতাকে রক্ষা করার চেষ্টা।

বাংলাদেশের স্বার্থ যুদ্ধে নামার নয়। বাংলাদেশের স্বার্থ হলো এমন অবস্থান তৈরি করা, যেখানে পানি, সীমান্ত, শ্রমবাজার, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা—কোনোটিই একক প্রতিবেশীর অনুগ্রহের ওপর নির্ভর না করে। সেই অর্থে মক্কা চুক্তি বিবেচনা করা উচিত। দূরে সরে থাকা নয়, শর্ত সাপেক্ষে যোগ দেওয়ার কূটনীতিই এখনকার বাস্তবসম্মত পথ।

আনিসুল হকের দশ প্রশ্ন ও রংপুরের হত্যাকাণ্ড মামলা যেভাবে দেখা উচিত-

আনিসুল হকের দশ প্রশ্ন ও রংপুরের হত্যাকাণ্ড মামলা যেভাবে দেখা উচিত-

আনিসুল হক যে দশটি প্রশ্ন জনমনে আছে বলে তুহিন ওয়াদুদের কলাম ঘিরে তুলে ধরেছিলেন, সেগুলো মামলার শুরুর দিকের সন্দেহ ও জিজ্ঞাসা থেকে। শুরু থেকেই প্রথম আলো একে সাম্প্রদায়িক ফ্রেমে আঁকার চেষ্টা করছে। সেই সাথে ভারতীয় মিডিয়াও।

গ্রেফতারকৃত দুই আসামীর জবানবন্দি, ফরেনসিক বক্তব্য, পুলিশের সংশোধিত ভাষ্য এবং কিছু মাঠের সাক্ষাৎকার সব প্রশ্নের চূড়ান্ত আদালতি মীমাংসা হয়নি। কিন্তু যেগুলোর উত্তর এখন নথিতে আছে, সেগুলো আগের অনেক অনুমানকে নস্যাৎ করে দেয়।

১। বিদ্যুতের লাইন কাটা নিয়ে প্রথম যে প্রশ্ন উঠেছিল, তার জবাব এখন সিদ্ধার্থের জবানবন্দির ভাষ্যেই আছে। বাড়িতে সিসি ক্যামেরা থাকতে পারে এই ভয়ে সে নিচে নেমে মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। শুরুতে এই কাজটাকে রহস্যময় পরিকল্পনার প্রমাণ ভাবা হয়েছিল। পরে দেখা গেল, এটি খুনের পর আলামত লোপাটের আতঙ্ক—যদি জবানবন্দি সত্য হয়।

২। প্রতিবেশীর ছাদ থেকে লাফিয়ে এসে ইয়াবা সেবনের প্রশ্নও একই ধাঁচের। পাশের তৃতীয় তলা নির্মাণাধীন। সেখানে নিয়মিত বসবাস নেই কারও। সাংবাদিকদের দেখানো ছবি ও ফুটেজে দুই ভবনের ছাদের ব্যবধান এমন যে হেঁটে বা লাফিয়ে আসা-যাওয়া সম্ভব। নির্মাণাধীন ছাদে না গিয়ে পরিচিত ছাদে যাওয়ার ব্যাখ্যা পুলিশ ও জবানবন্দিতে এসেছে অভ্যাস ও লুকোনোর জায়গা হিসেবে। এটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার। কিন্তু “লাফ অসম্ভব” বলে যে নাটক তৈরি হয়েছিল, সেটা মিথ্যা। 

৩। শুক্রবার জুমার নামাজের প্রসঙ্গ হিন্দুপ্রধান এলাকায় কেন উঠল—এটিও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সময় নির্ধারণ ও প্রতিবেশীদের উপস্থিতি বোঝাতে তথ্য আসতে পারে। তাকে সাম্প্রদায়িক ইঙ্গিত বানিয়ে খুনকে নামাজের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া প্রশ্নকেই রাজনীতি করে তোলে। খুনের সময়কাল নিয়ে পুলিশ নিজেই পরে ভাষ্য বদলেছে। সেই সংশয় থাকতে পারে। কিন্তু জুমা দিয়ে অপরাধের ধর্ম খোঁজা তদন্ত নয়, আখ্যান।

৪। শার্ট ইস্যুতে সবচেয়ে জোরালো প্রচারণা ছিল। তদন্ত কর্মকর্তা ও আসামির গায়ে একই প্রিন্ট এর শার্ট—এটা দেখে চক্রান্তের তত্ত্ব দাঁড় করানো হয়েছিল। পরে ওই কর্মকর্তা একই শার্ট পরে ভিডিও কলে সাক্ষাৎকার দেন এবং বলেন, আড়ংয়ের এই ডিজাইন রংপুরে আরও অনেকের আছে। কাকতালীয় হওয়া অসম্ভব নয়। অর্থাৎ শার্ট দিয়ে একটা প্রচারণা চালানো হয়েছিল। কাকতালীয় হলেও সেটা একই প্রিন্টের দুই শার্ট আলাদা।

৫। ঘর তল্লাশি হয়েছিল কারণ চারটি মরদেহ তালাবদ্ধ বাড়িতে ছিল, বিদ্যুতের লাইন কাটা, জিনিসপত্র ছড়ানো। হত্যা মামলায় তল্লাশি অস্বাভাবিক নয়। কে সিদ্ধার্থের নাম পুলিশকে দিয়েছিলেন এবং তিনি ছাড়া পেলে কেন সন্দেহ হয়নি—এটি তদন্তের জবাবদিহির প্রশ্ন। প্রাথমিক গ্রেপ্তার, ছাড়া ও পুনর্গ্রেপ্তারের ধাপ অস্বচ্ছ থাকলে জনমনে ধোঁয়াশা থাকে। সেই অস্বচ্ছতা স্বীকার করতে হয়। কিন্তু তল্লাশির কাজকেই ষড়যন্ত্র বলা যায় না।

৬। দুইজন কী করে চারজনকে হত্যা করল? জবানবন্দির ভাষ্য অনুযায়ী চারজনকে একসঙ্গে হত্যা করা হয়নি। ছাদে গণপতি চিৎকারের সুযোগ পান কম। গলায় গামছা দিয়ে ধরলে শব্দ গোঙানি পর্যায়ে ছিল। এরপর টিনের শব্দ হয়। শব্দ শুনে প্রীতিলতা আসেন। তাকে হত্যায় সময় বেশি লাগে, আদালতে বলা হয়েছে প্রায় চার মিনিট। তারপর আগামী আসেন। মুগ্ধ মুখ ও গলা চেপে ধরে। প্রিয়াম ঘুমন্ত অবস্থায় নিহত হননি—এই সংশোধন গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ শুরুতে বলেছিল ঘুমন্ত শিশু। পরে জবানবন্দিতে আসে, নিচে নেমে দেখা যায় প্রিয়াম জেগে বিছানায় বসে আছেন, সিদ্ধার্থকে চেনেন, সিদ্ধার্থের ছোট ভাই তার খেলার সাথি। চিনে ফেলার ভয়ে বালিশ চাপা দিয়ে তাকেও হত্যা করে। শুরুর ভাষ্যে যে যুক্তির ফাঁক ছিল, পরের জবানবন্দীতে সেটা ক্লিয়ার হয়। বিশ্বাসযোগ্যতা আদালতের ব্যাপার। কিন্তু “দুইজন চারজনকে পারবে না” এটা ধোপে টিকছে না।

৭। খুনের পর গোসল, শসা-খেজুর খাওয়া, সোনা পরীক্ষা—এসবকে অস্বাভাবিক লাগতে পারে। পুলিশ আগেই বলেছে, খুনের পর তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাড়িতে ছিল, ডাকাতির নাটক সাজাতে জিনিসপত্র ছড়িয়েছে, চোরাই স্বর্ণ পুঁতে রেখেছে এবং পরে সেই তথ্যে উদ্ধার হয়েছে। নৃশংস খুনের পর ঠান্ডা আচরণ অপরাধ মনোবিজ্ঞানেও আছে। অস্বাভাবিক লাগা আর অসম্ভব হওয়া এক নয়।

৮। মুখ ঝলসানোর প্রচার আনিসুল হকের তালিকায় নেই, কিন্তু এটাও গুজবের সঙ্গে জড়িত। প্রীতিলতার বোন ও সিআইডির সুমিত চৌধুরী প্রাথমিকভাবে মুখ দেখে দাহ্য পদার্থের আভাস দেন। সেই আভাস দিয়ে জঙ্গি তত্ত্ব ছড়ানো হয়। ফরেনসিকে ডা. বাবুল কুমার বিশ্বাস বলেন, মুখ ঝলসানো হয়নি, রাসায়নিক পাওয়া যায়নি; দু-তিন দিন পচনের পর মুখ ফ্যাকাশে থেকে কালচে হয়। যোনি পরীক্ষায় বীর্য পাওয়ার যে দাবি পরে কিছু মহল তোলে, ফরেনসিক চিকিৎসকের বক্তব্যে তা খারিজ হয়ে যায়। তবুও যদি পরে ধর্ষণ প্রমাণ হয়, দায় তখনও হত্যার আসামিদের ঘাড়েই যাবে—নতুন কোনো অদৃশ্য বাহিনীর ঘাড়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাবে না।

৯। ছাদের লাশ কেউ দেখল না কেন—জবানবন্দির ব্যাখ্যা, প্রীতিলতা ও আগামীর মরদেহ প্রতিবেশীদের চোখে পড়বে বলে সিঁড়িতে সরানো হয়, গণপতির মরদেহ ছাদের কোণে থাকে। কেউ কেউ বলেছেন গণপতির লাশ ঘরে পাওয়া গেছে। ফ্যাক্টচেক সংস্থা দ্য ডিসেন্টসহ পরবর্তী প্রতিবেদনে ছাদ থেকেই উদ্ধারের তথ্যই টিকে আছে।

১০। গণপতি বাড়ি মেরামতের জন্য ব্যাংক থেকে তোলা পনেরো লাখ টাকার হিসাব স্পষ্ট নয়। সিদ্ধার্থের শার্টের উৎস নিয়ে পরিবারের আপত্তি আছে। ঘটনার রাতে এগারোটার পর সিদ্ধার্থ বাড়ি থেকে বেরোন, সীমান্ত দাসের মা বলেন সে এসেই চলে গেছে, সীমান্ত আদালতে বলেন দুই বন্ধু সেই রাতে ইয়াবার জন্য এসেছিল, সিদ্ধার্থ পরদিন দুপুরের কাছাকাছি ফেরে। এই সময়রেখা জবানবন্দির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়। মুগ্ধকে গ্রেপ্তারের আগে শ্মশানের ডোম মোহন্তের সামনে আশ্রয় চাওয়া ও “মার্ডার করে ফেলছি” জাতীয় উক্তি—যদি সাক্ষ্য হিসেবে টিকে, সেটা গুরুতর। এগুলো বাকি তদন্ত।

তুহিন ওয়াদুদের কলাম থেকে আনিসুল হকের পোস্ট প্রশ্ন করা দোষ নয়। দোষ হয় যখন শুরুর ফাঁকগুলোকে চূড়ান্ত রায় করে তোলা হয় যে, এই দুই তরুণ খুনি নয়, খুনি বাইরের জঙ্গি। পুলিশের সাফল্যকে ছোটো করে দেখা, সন্দেহ রাখা ও সাম্প্রদায়িক ব্যাপার খোঁজা ষড়যন্ত্রের আলামত।

রংপুরের চার হত্যা একটি নৃশংস অপরাধ। পুলিশের ভাষ্য ও জনমনের প্রশ্ন সব উত্তর একসাথে মিলবে না। অপরাধীরা সব উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিবে না। এতবড় অপরাধের পর আসামীদের স্বাভাবিক আচরণ আশা করাও বোকামি। কিন্তু রংপুরের পর লক্ষ্মীপুরে হিন্দু গুম বলে যে অপপ্রচার শুরু হয়েছিল— পরে পিন্টু দাসকে যখন খুঁজে পাওয়া গেল, তখন অপপ্রচার কারীদের মুখে চুন লেগে গেল। 

ভারতের কিছু মিডিয়া ও বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা একই সুরে যখন তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, ঠিক তখনই পিন্টু দাস উদ্ধার ও রংপুরের ঘটনায় একের পর এক সব প্রশ্নের উত্তর বের হওয়ায় প্রমাণ হয়, রায় কিন্তু গুজবে নয়।


আলাদা প্রদেশের রাজনীতি আর সনাতনীর নামে দণ্ডিত হাসিনার পক্ষে চৈতালী চক্রবর্তী

আলাদা প্রদেশের রাজনীতি আর সনাতনীর নামে দণ্ডিত হাসিনার পক্ষে চৈতালী চক্রবর্তী   


ঢাকা। জুন, উনিশ তারিখ, দুই হাজার ছাব্বিশ।  

একজন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবীর কথা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।  

নাম অ্যাডভোকেট চৈতালী চক্রবর্তী।  

বার অ্যাসোসিয়েশন সদস্য নম্বর ছয় এক শূন্য এক।  

সদস্যপদ উনিশশো ষোলোর বাইশ মে।  

চেম্বার নয়া পল্টন।  

পেশা আইন।  

তিনি বলেন, এই বাংলাদেশ আমার। আদি বাংলাদেশও আমার।  

আপনারা বেশি বাড়াবাড়ি করলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য চেয়ে সনাতনীদের জন্য আলাদা একটি প্রদেশ করব।  

একসময় সেরকমই হবে।  

সনাতনীদের আলাদা প্রদেশ হয়ে যাবে।


এই বাক্যগুলো সংখ্যালঘু সুরক্ষার ভাষা নয়।  

এটি রাষ্ট্রের মানচিত্র নিয়ে কথা।  

বাংলাদেশ এক রাষ্ট্র, এক ভূখণ্ড।  

প্রদেশ ভাগের হুমকি সেই অখণ্ডতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। 


তিনি আরও বলেন, অতীতে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ একসঙ্গে ছিলেন, এখনও থাকতে চান।  

কিন্তু পরের বাক্যেই আসে বিদেশি সাহায্য।  আসে আলাদা প্রদেশ।  

আসে দাঙ্গা হলে জবাব দেওয়ার ভাষা।  একদিকে সহাবস্থানের দাবি।  অন্যদিকে দেশ ভাগের ইঙ্গিত।  


প্রশ্ন ওঠে, কোন দেশের সাহায্যে আলাদা প্রদেশ চান চৈতালী?  

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সংবিধান রক্ষার কথা বলবেন কিন্তু তিনি সংবিধান নয়, শর্তসাপেক্ষ বিচ্ছিন্নতার কথা বলেন! 


চৈতালী রাজনৈতিক অবস্থানও নতুন নয়। বিভিন্ন সভায় আওয়ামী লীগের স্লোগান দেন- বলেন 

জয় বাংলা। শেখ হাসিনাকে একমাত্র বিকল্প বলে প্রচার করেন। নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতি নিয়েই তিনি আলোচনায় ছিলেন।  

জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, হাসিনা পলাতক।  তবু পুরনো রাজনৈতিক ভাষা তিনি ছাড়েননি।

এখন নতুন মঞ্চ রংপুর।  

বাইশ আগস্ট রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী ও বারো বছরের ছেলে আয়ুশের মরদেহ।  

পরিবারের চারজন একসঙ্গে নিহত। পুলিশ দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে। এখানেও চৈতালী চক্রবর্তী হাজির হয়। সনাতনীদের নিরাপত্তা জন্য রাস্তায় নামে। সরকারকে হুমকি দেয়, শেখ হাসিনার সময় নাকি সনাতনীদের স্বর্ণযুগ ছিল। অর্থাৎ হাসিনাকেই তাদের নিরাপত্তাদাতা বানায় প্রকাশ্যে। এখানে বিচারের পরিবর্তে হাসিনার নরমালাইজেশন রাজনীতি করে চৈতালী।  

ঢাকায় মানববন্ধন করে।  রংপুরে সমাবেশ করে।  

সেই মঞ্চে চৈতালী চক্রবর্তীর উপস্থিতি শুধু বিচারের দাবি হয়ে থাকে না। জুনে যিনি আলাদা প্রদেশের হুমকি দিয়েছিলেন, আগস্টে তিনি হত্যার শোককে রাজনীতির মঞ্চ বানান।  

ক্যামেরার সামনে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা কিন্তু আড়ালে চান পুরনো শক্তির পুনর্বাসন।  

আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ। তাই প্রয়োজন নৈতিক আবরণ।  হিন্দু পরিবারের মৃত্যু সেই আবরণ হয়ে ওঠে।  

আইনশৃঙ্খলা ব্যর্থ—এই বাক্য দিয়ে বর্তমান সরকারকে দায়ী করা। আর সংখ্যালঘু বিপন্ন—এই বাক্য দিয়ে নিষিদ্ধ দলকে রক্ষক করে তোলা।  

মানববন্ধন দেখলে মনে হয় এ তো ভালো আয়োজন- কিন্তু ভেতরে ক্ষমতা হারানোর রাজনীতিকে ফিরে পাবার চেষ্টা। এখানেই সন্দেহের জায়গা তৈরি হয়।  

আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন সংখ্যালঘু সুরক্ষার নামে ক্ষমতার রাজনীতি করে আসছে। 

একই সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মিডিয়াগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুকে সাম্প্রদায়িক আখ্যান দিয়ে উস্কানি দেয়। চৈতালীর জুনের বক্তব্য ও আগস্টের বক্তব্য সেই দুই সুরের সঙ্গে মিলে যায়।  

সমাজে হিন্দু-মুসলিম উস্কানি, বর্তমান সরকারকে ব্যর্থ বলে দাঁড় করানো।  আওয়ামী লীগকে নীরবে ফেরানোর চেষ্টা। এটাই চৈতালীর রাজনীতি। 

অপরাধের ওপর দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগকে ফেরানো এবং বাংলাদেশের মধ্যে আলাদা প্রদেশ চাওয়া চৈতালী চক্রবর্তীকে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত।  

জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত হাসিনার পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য চৈতালী বিচার হওয়া উচিত।  


এখনো মক্কা প্যাক্টে যোগ দেয়নি বাংলাদেশ, তাতেই নাখোশ ভারত?


 এখনো মক্কা প্যাক্টে যোগ দেয়নি বাংলাদেশ, তাতেই নাখোশ ভারত?

সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের আগ্রহের খবর নয়াদিল্লিতে অস্বস্তি তৈরি করেছে। অথচ বাংলাদেশ এই চুক্তিতে এখনো যোগ দেয়নি। ত্রিপক্ষীয় সেই প্যাক্ট সই হয়েছে গত ৭ আগস্ট মক্কায়। ধারা অনুযায়ী এক দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা অন্য দুই দেশের ওপর হামলার সমান বলে গণ্য হবে। ঢাকার পক্ষ থেকে উদ্যোগটিকে ইতিবাচক দেখা হচ্ছে এবং জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত হবে। ঢাকা এখনো এই চুক্তিতে কোনো সই করেনি, কেননা বাংলাদশকে এখনো আমন্ত্রণও জানানো হয় নি, বাংলাদেশ কেবল আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আগ্রহকেই যদি জোটবদ্ধতা বলে ধরে নেওয়া হয়, আর তাতেই প্রতিবেশি রাষ্ট্র হুমকি ধামকি দেয় তাহলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা কোথায়?

বাংলাদেশ কোন দেশের সঙ্গে কী ধরনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করবে, সেটা স্বাধীন রাষ্ট্রের এখতিয়ার। এই আঙ্গিকে দুই দেশের চুক্তির তুলনা করলে বিষয়টা পরিষ্কার হয়। ভারত নিজেও কোনো ন্যাটো-জোটে নেই। কিন্তু গত এক দশকে সে বহুমুখী প্রতিরক্ষা জাল গড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জিএসওএমআইএ, লেমোয়া, কোমকাসা, বেকা এবং গত বছর নতুন দশ বছরের প্রতিরক্ষা ফ্রেমওয়ার্ক সই হয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে আরইএলওএস চুক্তিতে ঘাঁটি, বন্দর ও বিমানঘাঁটি ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে। জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে লজিস্টিক্স চুক্তি আছে, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সঙ্গেও অনুরূপ সহযোগিতা চালু রয়েছে। ইসরায়েল ভারতের অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি অংশীদার। কুয়াডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-জাপান-অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় হয়, ভুটানের সঙ্গে রয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা সম্পর্ক। এগুলো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট না হলেও সামরিক শক্তি মনোবল বাড়ায়। নয়াদিল্লি একে বলে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বলছে। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন- একই যুক্তি ঢাকার ক্ষেত্রে হলে এতে তাদের আপত্তি কেন?

বাংলাদেশেরও পূর্ণাঙ্গ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোট নেই। যা আছে, তার বেশিরভাগ সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও জনবল চুক্তি। চীনের সঙ্গে ২০০২ সালের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি আছে এবং বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি সই হয়েছে। মালয়েশিয়া ও নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে নতুন সমঝোতা হয়েছে। কাতারের সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীতে জনবল প্রেষণের চুক্তি আছে। তুরস্কের সঙ্গে বার্ষিক ২+২ বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং প্রতিরক্ষা শিল্প ও প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জিএসওএমআইএ ও এসিএসএ নিয়ে আলোচনা চলছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক যোগাযোগ ফিরেছে, তবে পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়নি। ভারতের সঙ্গে ১৯৭২ সালের মৈত্রী চুক্তি ও পরবর্তী সমঝোতা কাগজে আছে। ২০১৭ সালে যে ব্যাপক প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের প্রস্তাব উঠেছিল, তা পূর্ণ চুক্তিতে পরিণত হয়নি। ২০২৪-পরবর্তী বাস্তবতায় সেই সম্পর্ক আর আগের মতো নেই।

তুলনা করলে দেখা যায়, ভারতের প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক জটিল ও বহুমেরু। বাংলাদেশের নেটওয়ার্ক নতুন করে ছড়াচ্ছে, কিন্তু এখনো ক্রয় বিক্রয় ও সহযোগিতার স্তরে। মক্কা প্যাক্টে যোগ দিলে সেটা হতো প্রথমবারের মতো একের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা—এমন কাঠামো হবে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই এখনো হয়নি।

নয়াদিল্লির উদ্বেগ একটু বোঝার চেষ্টা করি। তারা ভাবছে পাকিস্তান এ চুক্তির অন্যতম পক্ষ। তুরস্ক-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। সৌদি অর্থ ও তুরস্কের অস্ত্র শিল্প যুক্ত হলে দক্ষিণ এশিয়ার ভারসাম্য বদলাতে পারে—এমনটাই ভাবছে ভারতীয় বিশেজ্ঞরা। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল ও বঙ্গোপসাগর ভারতের নিরাপত্তা হিসাবে সংবেদনশীল। কিন্তু উদ্বেগ আর অধিকার এক জিনিস নয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্র অন্য দেশের প্রতিরক্ষা পছন্দ ভেটো দিতে পারে না। ভারত নিজে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া—পরস্পরবিরোধী দুই শক্তির সঙ্গে একসঙ্গে লজিস্টিক্স চুক্তি করেছে, ফ্রান্স থেকে যুদ্ধবিমান কিনেছে, ইসরায়েল থেকে মিসাইল প্রতিরক্ষা নিয়েছে, জাপান-অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক সমন্বয় করেছে। সেই নীতিকে যদি বহুমুখী স্বায়ত্তশাসন বলা হয়, বাংলাদেশের তুরস্ক-চীন-জাপান-কাতার-মার্কিন আলোচনাকেও একই মাপকাঠিতে দেখা সঙ্গত। ঢাকার আগ্রহ প্রকাশমাত্রই ভারত যদি কূটনৈতিক চাপ তৈরি করে তাহলে তো ব্যাপারটা এমন হলো যে ঢাকার প্রতিরক্ষা কূটনীতির অনুমোদন যেন নয়াদিল্লিতে! স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কি এটা মেনে নেবে? 

বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নীতি ছিল জোটনিরপেক্ষতা ও বহুমুখী ভারসাম্য। সেই নীতি রেখেই সহযোগিতা বাড়ানো যায় কিনা, আর এ চুক্তিতে গেলে ব্যাপারটা এমন নয় যে এটা এটা আসলে কোনো আক্রমণাত্মক জোট নয়, বরং প্রতিরক্ষামূলক। এই জোটের কোনো নির্দিষ্ট শত্রু দেশ নেই। এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে, জোটের দেশগুলো নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করবে না। এবং তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াবে।

বাংলাদেশ এখনো পর্যন্ত কখনই কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়নি। যদি এখন যোগ দিতে চায় তাহলে সেটা হবে প্রথম।  সুতরাং কোনো কিছুতে প্রথম হওয়ার আগে জাতীয় পর্যায়ে এটাকে নিয়ে আরও অনেক আলোচনা ও বিশ্লেষণ হবে, তারপর যোগ দেওয়ার চিন্তা। আর বাংলাদেশ সেই পর্যায়ে আছে। সুতরাং ভারতের এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। 

বিদ্যুৎ অফিস ভাঙলে বিদ্যুৎ আসবে না

 বিদ্যুৎ অফিস ভাঙলে বিদ্যুৎ আসবে না

দেশে লোডশেডিং হচ্ছে এটা ঠিক। কিন্তু এই লোডশেডিং এর পেছনের কারণ না খুঁজে প্রতিবাদ করতে গিয়ে যে জিনিসটা চোখে পড়লো তা ভয়ংকর। কারণ প্রতিবাদ করতে গিয়ে যে অন্যায় হচ্ছে সেটা কিন্তু আরেকটা অন্যায়।

স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিস বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, পিডিবির বিতরণ বিভাগ বা অভিযোগ কেন্দ্র—এগুলো শুধু বিতরণ করে। সরকার যে পরিমাণ বিদ্যুৎ গ্রিডে দেয়, তারা সেটা এলাকায় এলাকায় পৌঁছে দেয়। হাতে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না থাকলে লাইনম্যান বা জোনাল অফিসের কর্মকর্তা নতুন মেগাওয়াট তৈরি করতে পারেন না। অফিসের জানালা ভাঙলেও পাওয়ার প্ল্যান্ট চালু হয় না। সাবস্টেশন ভাঙলে বরং যেটুকু সরবরাহ আছে, সেটাও ব্যাহত হয়। নিজেদেরই লাইন, নিজেদেরই মিটার, নিজেদেরই অভিযোগ কেন্দ্র—এগুলো ভাঙা মানে নিজেদের সেবা ভাঙা।

২০২৬ সাল জুড়ে এই ভুল বারবার হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অভিযোগ কেন্দ্রে ভাঙচুর, খুলনার কয়রায় জোনাল অফিসে হামলা, চাঁদপুরে লাইনকর্মীকে ধরে নিয়ে যাওয়া, নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় খেলা দেখতে না পেরে অফিসে ইটপাটকেল, ময়মনসিংহে বিদ্যুতের দাবিতে হামলা, সিরাজগঞ্জে ঘেরাও। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড নিজেই জানিয়েছে—উপকেন্দ্রে হামলা, ক্রুদের মারধর, অফিস ঘেরাও, বিল আদায়ে বাধা আর হুমকি চলছে। কর্মীরা নিরাপত্তা চাইছেন। এতে লোডশেডিং কমছে না। শুধু অফিস ভাঙছে, মানুষ আরও কষ্ট পাচ্ছে।

তবে আরেকটা বিষয় বলে রাখি, কেন এই বিদ্যুত থাকছে না, গ্যাস থাকছে না একটু ভেবে দেখুন। সরকার কেন বলছে বিদ্যুতের অপচয় করবেন না, গ্যাসের অপচয় করবেন না। সরকার নিজেও তার অফিসে এগুলোর অপচয় রোধের নিয়ম করে দিয়েছেন সেটা বোঝার চেষ্টা করুন। প্রকৃত কারণ বুঝুন। এরপর প্রতিবাদ করার প্রয়োজন হলে সেটা করুন-।

প্রতিবাদ করতে হবে। কিন্তু জায়গা বদলাতে হবে। যেখানে বরাদ্দ হয়, যেখানে নীতি হয়, যেখানে জবাবদিহি থাকে—সেখানে যেতে হবে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে দাঁড়ান। ডিসির বাসভবনের সামনে যান। এলাকার সংসদ সদস্যের বাড়ি বা অফিসের সামনে যান। বিদ্যুৎ মন্ত্রীর বাসভবন বা মন্ত্রণালয়ের সামনে যান। সচিবালয়ের সামনে যান। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করেন। সেখানে চাহিদা আর সরবরাহের হিসাব চাইতে হয়। সেখানে গ্যাস সংকট, কয়লা, আইপিপি চুক্তি, বকেয়া বিল আর উৎপাদন বন্ধের জবাব চাইতে হয়। স্থানীয় অফিস সেই জবাব দিতে পারে না, কারণ সিদ্ধান্ত সেখানে হয় না।

এখন প্রশ্ন ওঠে—কেন বারবার সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটাই টার্গেট হয়? যে অফিস ভাঙলে পরের দিনও একই লোডশেডিং থাকবে, সেখানেই মানুষকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কেন? ক্ষোভ স্বতঃস্ফূর্ত হতে পারে। কিন্তু ক্ষোভকে ভুল দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া সহজ রাজনীতি। পতিত শক্তি ক্ষমতা হারিয়ে মাঠে নেই। তারা সরাসরি মিছিল করতে পারে না। কিন্তু গুজব, উসকানি আর ভুল টার্গেট তৈরি করে অরাজকতা করতে তারা পটু। স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসে হামলা করার ছবি তারা আবার ফেসবুকে শেয়ার দিচ্ছে, সরকারকে ব্যর্থ দেখানোর চেষ্টা করছে, এতে বিদ্যুতের কর্মীরা ভয় পাচ্ছে, সেবা আরও খারাপ হচ্ছে। এতে জনগণের লাভ নেই। লাভ হয় সেই শক্তির, যারা নতুন সরকারকে ব্যর্থ দেখাতে চায়।

তাই হুদাই অফিস ভাঙবেন না। এগুলো আপনাদেরই সম্পদ। লাইনকর্মী আপনার এলাকার মানুষ। তাদের মারলে বিদ্যুৎ ফিরবে না। উসকানিতে পা দিলে নিজেদের ক্ষতি নিজেরাই করবেন। লোডশেডিংয়ের হিসাব চাইতে হলে যেখানে হিসাব রাখা হয়, সেখানে যান। প্রতিবাদ জায়গামতো করুন। ২০২৩ সালে এর চেয়েও বেশি লোড শেডিং হতো, সে কথা কি ভুলে গেছেন?

ক্ষোভ থাকবে, কিন্তু ভাঙচুরের দায়টা গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে সেটা একবার ভাবুন। আর কার ফাঁদে পা দিয়ে ভাঙতে যাচ্ছেন সেটাও ভাবুন।

অপরাধ করে আর পার পাওয়া যাচ্ছে না, মিরপুর, রংপুর ও সর্বশেষ ঢাকায় আসামী গ্রেফতারে যা দেখা গেল-

 অপরাধ করে আর পার পাওয়া যাচ্ছে না, মিরপুর, রংপুর ও সর্বশেষ ঢাকায় আসামী গ্রেফতারে যা দেখা গেল-

২০২৬ সালে বাংলাদেশে অপরাধের চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। ধরার পরও বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকার যে অভ্যাস দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল, তার জায়গায় এখন দৃশ্যমান গ্রেপ্তার আর কিছু ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক দ্রুত বিচার দেখা যাচ্ছে। সরকার যে বলেছিল অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না, সেই প্রতিশ্রুতির ছাপ রামিসা হত্যা থেকে সংসদ ভবনের সামনের ছিনতাই পর্যন্ত একাধিক ঘটনায় স্পষ্ট।

মে মাসে মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ করে গলা কেটে হত্যা করা হয়। মাথা কেটে আলাদা করা হয়। ঘটনার পরদিনই প্রতিবেশী সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার গ্রেপ্তার হন। দেশজুড়ে ক্ষোভের মুখে মামলা দ্রুত এগোয়। জুনের শুরুতে বিচার শুরু হয়, সাত তারিখেই ট্রাইব্যুনাল দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ঘটনার উনিশ দিনের মাথায় রায়। এত দ্রুত শিশু ধর্ষণ-হত্যার বিচার দেশে আগে খুব কমই হয়েছে। উচ্চ আদালতে নিশ্চিতকরণ এখনও বাকি থাকলেও তদন্ত থেকে রায় পর্যন্ত যে গতি দেখা গেল, তা সরকারের অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত দেয়।

আগস্টে রংপুরে আরেকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও বারো বছরের ছেলে—একই পরিবারের চারজনকে বাড়িতে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। লাশ উদ্ধারের পরদিনই দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা আদালতে হত্যার কথা স্বীকার করেন। ছাদে ইয়াবা সেবন করতে গিয়ে দেখা হয়ে যাওয়ায় খুন—পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য এমনই। তদন্ত এখনও চলছে, চার্জশিট হয়নি। কিন্তু ঘটনার চব্বিশ থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে মূল সন্দেহভাজনদের জালে ফেলা গেছে। আগে এমন পরিবারিক হত্যাকাণ্ডে সপ্তাহখানেক তদন্ত ঝুলে থাকত। এবার সেই বিলম্ব দেখা যায়নি।

সর্বশেষ ঘটনা ঘটে জাতীয় সংসদ ভবনের একেবারে সামনে। উনত্রিশ আগস্ট ভোরে বগুড়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন রিকশায় যাচ্ছিলেন। মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা ব্যাগ ধরে টান দেয়। তিনি পড়ে মাথায় আঘাত পেয়ে মারা যান। ত্রিশ তারিখেই র‌্যাব প্রধান আসামি পনি ওরফে প্যারা পনি ও এক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে। মোটরসাইকেলও জব্দ হয়। রাজধানীর সবচেয়ে সংবেদনশীল এলাকায় ছিনতাই করে প্রাণহানি—এমন ঘটনায় একদিনের মধ্যে গ্রেপ্তার অনেকটা নজীর তৈরি করল।

এই তিনটি ঘটনা আলাদা আলাদা হলেও সরকারের আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সাফল্য দৃশ্যমান। মাগুরার আসিয়া হত্যার মতো পুরনো চাঞ্চল্যকর শিশু ধর্ষণ-হত্যা মামলাও উচ্চ আদালতে অগ্রাধিকার পেয়েছে। নারায়ণগঞ্জে এক যুবনেতা খুন হওয়ার পরদিনই একাধিক আসামি ধরা পড়ে। মে থেকে আগস্টের মধ্যে বিশেষ অভিযানে সারা দেশে পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে। অস্ত্র, মাদক ও বিস্ফোরক উদ্ধার হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের আলাদা ড্রাইভেও একদিনে কয়েক ডজন অপরাধী আটক হয়েছে।

গত ছয় মাসে গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেনি। অপরাধীকে আইনের মধ্যে রেখে ধরা হচ্ছে—এটা ইতিবাচক। রামিসা মামলায় যেভাবে সাক্ষী হাজির, স্বীকারোক্তি গ্রহণ ও রায় একসঙ্গে এগোল, সেই মডেল অন্য মামলায়ও প্রয়োগ করা হলে অপরাধীরা পার পাবে না। রংপুরের ঘটনা ও সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাই মামলায় চার্জশিট ও বিচার যেন দ্রুত শুরু হয়, এটাই প্রত্যাশা।

এখন পর্যন্ত যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে অপরাধ করে পালিয়ে যাওয়া আগের মতো সহজ নয়। চাঞ্চল্যকর খুন, ধর্ষণ বা ছিনতাইয়ের পর দ্রুত গ্রেপ্তার হচ্ছে। কিছু মামলায় বিচারও দ্রুত হচ্ছে। সরকার যে বলেছিল কেউ পার পাবে না, ২০২৬ সালের এই কয়েকটি ঘটনা সেই কথার বাস্তবায়ন দেখাচ্ছে। বাকিটা নির্ভর করছে বিচারের ধারাবাহিকতার ওপর। তবে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি যে সরকারের প্রতিশ্রুতি মতোই এগোচ্ছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

জনগণের আস্থা, জবাবদিহি ও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’

 

ছয় মাসের রাষ্ট্রচিন্তা

জনগণের আস্থা, জবাবদিহি ও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. একেএম শামছুল ইসলাম, পিএসসি, জি (অব.)

দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সবচেয়ে কঠিন মূল্য যে রাজনৈতিক দলটি দিয়েছে, তার জন্য বিএনপির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন নিছক একটি নির্বাচনি বিজয়ের ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। মামলা, গুম, খুন, নির্যাতন, রাজনৈতিক হয়রানি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দলটি যে রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, তার পরিণতিতে ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জনগণকে বহুদিন পর নিজেদের রাজনৈতিক পছন্দ প্রকাশের সুযোগ দেয়। সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

গত ১৬ আগস্ট সেই সরকারের ছয় মাস বা ১৮০ দিন পূর্ণ হয়েছে। ছয় মাস একটি রাষ্ট্রের ইতিহাসে দীর্ঘ সময় নয়। বিশেষ করে এমন একটি রাষ্ট্রের জন্য নয়, যে রাষ্ট্র দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক অব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, জ্বালানি সংকট এবং সর্বোপরি জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের আস্থার সম্পর্কের গভীর ক্ষয় নিয়ে নতুন সরকারের হাতে এসেছে। ছয় মাস এমন একটি সময়, যার মধ্যে একটি সরকারের চরিত্র, অগ্রাধিকার, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার দিকনির্দেশনা সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়।

এই ছয় মাসের সবচেয়ে বড় অর্জন তাই কোনো অবকাঠামো কিংবা কোনো একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নয়। সবচেয়ে বড় অর্জন রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা।

একটি সরকার জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসতে পারে; কিন্তু জনগণের সরকার হয়ে উঠতে হলে তাকে প্রতিদিন জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। নির্বাচনের দিন ভোট পাওয়া একটি রাজনৈতিক ম্যান্ডেট। কিন্তু সেই ম্যান্ডেটের মর্যাদা রক্ষা করা একটি প্রতিদিনের দায়িত্ব। নির্বাচনের পর ক্ষমতা আর জনগণের হাতে থাকে না—এমন ধারণাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিপদ। বরং নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতাই সরকারের ওপর দায়িত্ব আরোপ করে।

এই ছয় মাসের মূল্যায়ন তাই শুধু সরকার কী করেছে, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ হতে পারে না। প্রশ্ন হলো—কী পরিবর্তনের সূচনা করেছে এবং আগামী দিনে কোথায় যেতে চায়।

ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের—বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন নিয়ে মানুষের হতাশা ও অবিশ্বাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায় রয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনকে ঘিরে অংশগ্রহণের সংকট, ২০১৮ সালের নির্বাচনে রাতের ভোটের অভিযোগ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ঘিরে ‘ডামি নির্বাচন’-এর রাজনৈতিক অভিধা—সব মিলিয়ে নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

এই বাস্তবতার বিপরীতে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তন করে না; এটি রাষ্ট্রের বৈধতার ভিত্তিকে পুনর্নির্মাণ করে। ভোটার যখন বিশ্বাস করেন তাঁর একটি ভোটের মূল্য আছে, তখন তিনি কেবল একজন সরকার নির্বাচন করেন না—তিনি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণে নিজের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।

এই কারণেই ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং পরবর্তী সরকারকে শুধু একটি রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এটি বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘ রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার একটি বহিঃপ্রকাশ।

রাষ্ট্রের ক্ষমতার প্রকৃত উৎস জনগণ—এই কথাটি সংবিধানে লেখা থাকলেই যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর আচরণে এই সত্যের প্রতিফলন থাকতে হয়। বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ এখানেই।

জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়া সরকার জনগণের কাছে আরও বেশি দায়বদ্ধ হতে হবে। ক্ষমতার বৈধতা যেন কখনো ক্ষমতার অহংকারে পরিণত না হয়—এটাই গণতন্ত্রের মৌলিক শিক্ষা। জনসমর্থন শুধু আবেগ নয়, এটি দায়িত্বেরও উৎস।

গত ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কর্মসূচিকে ঘিরে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি, রাজনৈতিক আবেগ এবং জনসম্পৃক্ততা রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষের ঢল কিংবা বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় বিপুল উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের আবেগ ও প্রত্যাশা প্রকাশ করেছে।

কিন্তু জনসমর্থন কোনো স্থায়ী সম্পদ নয়। এটি অর্জন করতে হয়, ধরে রাখতে হয় এবং প্রতিদিন নতুন করে প্রমাণ করতে হয়। রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা যদি সুশাসনের বিকল্প হয়ে যায়, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়। আবার সুশাসন যদি মানুষের আবেগ, প্রত্যাশা ও মর্যাদাকে উপেক্ষা করে, তাহলেও সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাই প্রয়োজন আরও বেশি দায়িত্ব, আত্মসংযম এবং জবাবদিহি।

প্রধানমন্ত্রী যেখানেই যান, মানুষ তাঁর কাছে ছুটে আসেন—এটি আনন্দের বিষয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি বড় পরীক্ষা। কারণ মানুষের প্রত্যাশা যত বেশি, সরকারের ব্যর্থতার মূল্যও তত বেশি। জনতার ভালোবাসাকে রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত না করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রূপান্তর করাই সরকারের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ।

মানববন্ধনের আড়ালে কি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে চৈতালী চক্রবর্তী?

মানববন্ধনের আড়ালে কি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে চৈতালী চক্রবর্তী?

রংপুরের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়া নিঃসন্দেহে ন্যায়বিচারের দাবি। একটি পরিবারের চার সদস্যের হত্যার ঘটনায় প্রতিবাদ হবে, বিচার চাইবে মানুষ—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়: সেই মানববন্ধনকে ঘিরে কেন আবার রাজনৈতিক প্রতীক ও আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট স্লোগানের উপস্থিতি দেখা গেল? এখানেই চৈতালী চক্রবর্তীকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।

চৈতালী চক্রবর্তীর কর্মসূচিতে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। স্লোগানটি বলার পরপরই এটা কেটে দিয়েন বলতে শোনা যায়। চৈতালী চক্রবর্তীর নেতৃত্ব বা অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত কর্মসূচির রাজনৈতিক পরিবেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক স্লোগানের ব্যবহার স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে—এটি কি নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি জনপরিসরে পুরোনো রাজনৈতিক ন্যারেটিভ ফিরিয়ে আনার একটি ইঙ্গিত?

চৈতালী চক্রবর্তীর রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, অধিকার ও পৃথক রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রশ্নে তাঁর বক্তব্য আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংখ্যালঘুদের সামনে রেখে এমন একটি রাজনৈতিক বার্তা তৈরির চেষ্টা চলছে, যেখানে আওয়ামী লীগ আমলকে ‘নিরাপত্তার যুগ’ এবং বর্তমান বাস্তবতাকে ‘অস্তিত্বের সংকট’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে চৈতালী চক্রবর্তী। এই ন্যারেটিভ সফল হলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের জন্য একটি আবেগঘন ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

মানবাধিকার কোনো দলের সম্পত্তি নয়। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, রাজনৈতিক সহিংসতা, গুম, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও ছিল। তাই আজ সংখ্যালঘু নিরাপত্তার প্রশ্নকে এমনভাবে ব্যবহার করা হলে, যাতে অতীতের সব ব্যর্থতা ও অভিযোগ আড়াল করে একটি রাজনৈতিক শক্তিকে আবার নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়, তাহলে সেটি মানবাধিকারের আন্দোলন নয়—সেটি হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের কৌশল।

রংপুরের হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইতে হবে। অপরাধীদের খুঁজে বের করতে হবে। একটি হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদমঞ্চ কি শুধুই বিচার আদায়ের জায়গা, নাকি সেটি ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির জন্য জনসমর্থনের আবহ তৈরির প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত হচ্ছে?

চৈতালী চক্রবর্তী আওয়ামী লীগকে ফেরানোর জন্য মাঠে নেমেছেন। তাঁর কর্মকাণ্ড, তাঁকে ঘিরে তৈরি রাজনৈতিক ন্যারেটিভ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মসূচিগুলোতে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট লোকজনের উপস্থিতি, মানববন্ধনে মুখ ফসলে জয়বাংলা বলা ইত্যাদি দেখে অন্তত তাই মনে হচ্ছে। 

মানবাধিকারের নামে আন্দোলন হচ্ছে, নাকি মানবাধিকারের আবেগকে ব্যবহার করে একটি পরাজিত রাজনৈতিক শক্তিকে নতুন করে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে?

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো: মানুষের ভয়, শোক ও নিরাপত্তাহীনতাকে যখন রাজনীতির হাতিয়ার বানানো হয়, তখন ন্যায়বিচার পেছনে পড়ে যায়—আর সামনে চলে আসে ক্ষমতার রাজনীতি, সামনে চলে আসে অপশক্তি। সরকারের উচিত চৈতালীদের এধরনের ভন্ডামির জবাব দেয়া। 

মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য সুযোগ, না বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন এ কে এম আহসান উল্লাহ

মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য সুযোগ, না বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন এ কে এম আহসান উল্লাহ

মক্কা মুসলমানদের কাছে শুধু একটি শহর নয়; এর ধর্মীয় ও প্রতীকী গুরুত্ব গভীর। ফলে ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান সেখানে যখন মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট বা ‘মক্কা চুক্তি’ স্বাক্ষর করল, তখন ঘটনাটি একটি সাধারণ সামরিক সমঝোতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। চুক্তিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই ভাষা স্বাভাবিকভাবেই ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। সে কারণেই ইতিমধ্যে কেউ কেউ একে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বা ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করছেন।

কিন্তু তুলনাটি যতটা আকর্ষণীয়, ততটা নির্ভুল নয়। ন্যাটো শুধু একটি ‘কালেকটিভ ডিফেন্স ক্লজ’ (আন্তর্জাতিক চুক্তির এমন একটি বিশেষ নিয়ম, যেখানে বলা থাকে যে—চুক্তিবদ্ধ কোনো একটি দেশের ওপর বাইরের শত্রু আক্রমণ করলে তা সবার ওপর আক্রমণ বলে গণ্য হবে এবং সব সদস্যদেশ মিলে সেই শত্রুর বিরুদ্ধে একসঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে) নয়; এর রয়েছে সমন্বিত সামরিক কমান্ড, দীর্ঘদিনের যৌথ পরিকল্পনা, ‘ইন্টার–অপারেবল ফোর্সেস’ (এমন একাধিক সামরিক বা নিরাপত্তা বাহিনী, যারা ভিন্ন ভিন্ন দেশ, সংস্থা বা বিভাগের হওয়া সত্ত্বেও কোনো যৌথ অভিযান চালাতে পারে), ‘ইনস্টিটিউশনালাইজড ডিসিশন-মেকিং’ (নির্দিষ্ট নিয়ম, সুপ্রতিষ্ঠিত কাঠামো, তথ্য-প্রমাণ এবং পূর্বনির্ধারিত নীতিমালার ভিত্তিতে প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত) এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে সুস্পষ্ট কাঠামো।

মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য থেকে এমন বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে না; বরং এর ‘অপারেশনাল আর্কিটেকচার’ (প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেমের এমন একটি কাঠামোগত নকশা, যা নির্ধারণ করে কীভাবে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে, সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং বিভিন্ন কাজ বাস্তবায়িত হবে), আক্রমণের সংজ্ঞা, ভৌগোলিক সীমা এবং সদস্যদের সুনির্দিষ্ট সামরিক দায় এখনো অনেকাংশে অস্পষ্ট। তাই মক্কা চুক্তিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলা যেমন তাড়াহুড়া হবে, তেমনি এটিকে নিছক প্রতীকী ঘোষণা মনে করাও ভুল হবে।

এই চুক্তি স্বাক্ষর করা তিন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের সামর্থ্য পরস্পরের পরিপূরক। সৌদি আরবের রয়েছে অর্থনৈতিক শক্তি, জ্বালানি সম্পদ এবং আরব ও মুসলিম বিশ্বে বিশেষ রাজনৈতিক প্রভাব। তুরস্কের রয়েছে ন্যাটো-অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী এবং দ্রুত বিকাশমান প্রতিরক্ষা শিল্প। পাকিস্তানের রয়েছে বড় সামরিক বাহিনী এবং মুসলিম বিশ্বের একমাত্র ঘোষিত পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার। ফলে এই তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা উৎপাদন, সামরিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা, ড্রোন, সাইবার নিরাপত্তা এবং অন্যান্য ইমার্জিং ডিফেন্স টেকনোলজিস নিয়ে সহযোগিতা গভীর হলে এর আঞ্চলিক প্রভাব যথেষ্ট হতে পারে।

কেন এখন?

মক্কা চুক্তি স্বাক্ষরের সময়টি সম্ভবত চুক্তিটির চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাকাঠামো ব্যাপকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান-ইসরায়েল প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইয়েমেন ও লোহিত সাগরের সংঘাত, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিস্তার এবং মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোকে বিকল্প নিরাপত্তাব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। মক্কা চুক্তিকে তাই শুধু ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক জোট হিসেবে দেখলে এর বড় রাজনৈতিক তাৎপর্যটি হারিয়ে যাবে। এটি একই সঙ্গে ‘রিজিওনাল স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বা আঞ্চলিক কৌশলগত স্বনির্ভরতা তৈরির চেষ্টা।

চুক্তিটি কি ইরান, নাকি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে?

ওপরের প্রশ্নটির আনুষ্ঠানিক উত্তর, কোনোটিই নয়। তুরস্ক স্পষ্টভাবে বলেছে, কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে ‘সাধারণ হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি এবং চুক্তিটি প্রতিরক্ষামূলক। কিন্তু সামরিক জোট কখনোই ভূরাজনৈতিক শূন্যতায় জন্ম নেয় না। ইরানের সামরিক প্রভাব, ইসরায়েলের আঞ্চলিক সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব, উপসাগরীয় অঞ্চলের অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর আকাঙ্ক্ষা—সবকিছুই এর পেছনের কৌশলগত প্রেক্ষাপট।

সুতরাং একে সরাসরি ইরানবিরোধী বা ইসরায়েলবিরোধী জোট না বলে একটি নতুন ‘রিজিওনাল ব্যালান্সিং মেকানিজম’ (এমন একধরনের কৌশল বা ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে কোনো একক দেশের অতিমাত্রায় শক্তিশালী হয়ে ওঠা বা আধিপত্য বিস্তার রোধ করে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখে) হিসেবে দেখা সম্ভব। এই জোট একই সঙ্গে ইরান ও ইসরায়েলের প্রতি একটি রাজনৈতিক বার্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা থেকে ‘ডাইভারসিফিকেশন’ (কোনো দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একাধিক দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক বিস্তার)-এর প্রচেষ্টা।

এখানেই বাংলাদেশের প্রশ্নটি জরুরি হয়ে উঠেছে। ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ‘এ প্যাক্ট তিনটি দেশের মধ্যে হয়েছে। এ প্যাক্টটিকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। এতে যোগদান বা যোগদান না করার বিষয়টি এখনো আসেনি, কারণ এটা নির্ভর করছে প্যাক্টের সদস্যদের অভিপ্রায়ের ওপর। তারা যদি বাংলাদেশকে এ প্যাক্টে নেওয়ার বিষয়ে অভিপ্রায় প্রকাশ করে, তাহলে আমরা নিশ্চয়ই এটাকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করব।’

তিনি (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) আরও বলেন, ‘তার আগে এর (প্যাক্ট) ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা করাটা, সম্ভবত সে সময় আসেনি। আমরা নিশ্চয়ই এসব বিষয় বিবেচনা করব। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে একটা কথা, এ প্যাক্ট যদি বিস্তৃত হয়, এটা হচ্ছে বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা। এটা আমাদের পরিবার। এটা মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তা নিয়ে কারও, অন্যদের উদ্বেগের অবকাশ নেই।’ (মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া নির্ভর করছে সদস্যদেশগুলোর অভিপ্রায়ের ওপর: পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রথম আলো অনলাইন, ২৭ আগস্ট ২০২৬)

ফলে বিষয়টি এখন আর দূরের কোনো আঞ্চলিক ঘটনার আলোচনা নয়; বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বাস্তব নীতি নির্ধারণের সময়।

বাংলাদেশ কী পেতে পারে?

মক্কা চুক্তিতে যোগদানের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি রয়েছে। সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশীদারদের একটি। তুরস্ক বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নে ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও সাম্প্রতিক সময়ে নতুনভাবে বিস্তৃত হচ্ছে।

ফলে একটি কাঠামোবদ্ধ নিরাপত্তা অংশীদারত্ব বাংলাদেশের সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, ড্রোন, সাইবার নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা পরিবেশও সহজ নয়। মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সংকট, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য নতুন ‘সিকিউরিটি অপশনস’ (নিরাপত্তা বিকল্প) প্রয়োজনীয় করে তুলছে।

কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রেখা টানা দরকার: প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আর যৌথ প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশ তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষাশিল্পে কাজ করতে পারে, সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে পারে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ ও বিনিময় জোরদার করতে পারে। কিন্তু এর কোনোটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই অর্থ বহন করে না যে সৌদি আরব, পাকিস্তান বা তুরস্কের ভবিষ্যৎ কোনো যুদ্ধ বাংলাদেশের যুদ্ধ হয়ে যাবে।

ঝুঁকিটা কোথায়?

সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রশ্ন আসবে ভারতের দিক থেকে। পাকিস্তান মক্কা চুক্তির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তুরস্কের সঙ্গেও ভারতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ যদি পূর্ণ যৌথ প্রতিরক্ষা সদস্য হয়, নয়াদিল্লি সেটিকে পাকিস্তান এবং তুরস্ককে কেন্দ্র করে যৌথ নিরাপত্তাবলয়ের দিকে বাংলাদেশের কৌশলগত ঝোঁক হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অবশ্যই ভারতের অনুমোদননির্ভর হওয়া উচিত নয়। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ নিজের নিরাপত্তা অংশীদার নিজেই নির্ধারণ করবে। কিন্তু কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং কৌশলগত অসংবেদনশীলতা এক জিনিস নয়। বাংলাদেশের প্রায় পুরো স্থলসীমান্ত ভারত দিয়ে ঘেরা; পানি, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য, সংযোগ, ট্রানজিট এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই দেশের গভীর পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। তাই বাংলাদেশের এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যা বাস্তব নিরাপত্তা সুবিধার তুলনায় অপ্রয়োজনীয় প্রতিবেশী-অবিশ্বাস বেশি তৈরি করে।

দ্বিতীয় বড় প্রশ্ন ইরান। বাংলাদেশের সঙ্গে ইরানের কোনো মৌলিক নিরাপত্তা বিরোধ নেই। কিন্তু ভবিষ্যতে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সংঘাত হলে ‘কালেকটিভ ডিফেন্স ক্লজ’ বাংলাদেশের জন্য ঠিক কী অর্থ বহন করবে? বাংলাদেশকে কি সেনা পাঠাতে হবে? সামরিক ঘাঁটি বা আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিতে হবে? গোয়েন্দা তথ্য দিতে হবে? নাকি শুধু রাজনৈতিক সমর্থন জানালেই চলবে? একই প্রশ্ন তুরস্ককে ঘিরেও উঠতে পারে। তুরস্কের কোনো আঞ্চলিক সংঘাত কি বাংলাদেশের জন্য ‘কালেকটিভ ডিফেন্স অবলিগেশন’ সৃষ্টি করবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত সদস্যপদের প্রকৃত মূল্য বা ঝুঁকি নির্ধারণ করা অসম্ভব। বাংলাদেশকে চীনের কথাও ভাবতে হবে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার এবং জাপান অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বড় শক্তি হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সঙ্গে একই সময়ে কাজ করার ক্ষমতা। কোনো সামরিক জোটে প্রবেশ করে সেই ‘ফ্লেক্সিবিলিটি’ (পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এবং জাতীয় স্বার্থ অর্জনে কৌশল পরিবর্তন করার ক্ষমতা) সংকুচিত করা উচিত হবে না।

বাংলাদেশের সামনে তৃতীয় পথ আছে

বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত ‘যোগ দেব’ অথবা ‘যোগ দেব না’—এ দুটির মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বাধ্য হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রথমে বাংলাদেশের উচিত চুক্তিটির সম্পূর্ণ আইনি ও সামরিক কাঠামো পরীক্ষা করা। অন্তত চারটি প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন: কোন পরিস্থিতিতে ‘কালেকটিভ ডিফেন্স ক্লজ’ কার্যকর হবে; চুক্তিটির ভৌগোলিক পরিধি কী; সদস্যরাষ্ট্রকে কী ধরনের সামরিক সহায়তা দিতে হবে এবং কোনো সংঘাতে অংশগ্রহণের বিষয়ে বাংলাদেশ নিজের ‘সভরেন ভেটো’ (সার্বভৌম রাষ্ট্রের এমন একচ্ছত্র ক্ষমতাকে, যার মাধ্যমে কোনো আইন, প্রস্তাব বা সিদ্ধান্তকে একতরফাভাবে বাতিল বা স্থগিত করা যায়) বজায় রাখতে পারবে কি না।

বাংলাদেশ চাইলে শুরুতে পূর্ণ সদস্য না হয়ে পর্যবেক্ষক, সংলাপের অংশীদার অথবা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অংশীদা হওয়ার প্রস্তাব করতে পারে। যৌথ প্রশিক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, শান্তি রক্ষা, সামরিক প্রযুক্তি এবং গোয়েন্দা সহযোগিতায় অংশ নেওয়া যেতে পারে; কিন্তু অটোমেটিক ওয়ার অবলিগেশন (স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বাধ্যবাধকতা) এড়িয়ে।

যদি শেষ পর্যন্ত পূর্ণ সদস্য হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে তার আগে ‘প্রিভেন্টিভ ডিপ্লোমেসি’ (এমন একধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ, যা কোনো বিবাদকে সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নিতে বাধা দেয়) প্রয়োজন। ভারত, ইরান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে—বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয় এবং এটি বিদ্যমান সম্পর্কসমূহের বিকল্পও নয়। ভারতের সঙ্গে এ বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত সংলাপ বিশেষভাবে প্রয়োজনীয় হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য মূল নীতিটি হওয়া উচিত খুব সহজ: বন্ধু বাড়াতে হবে, কিন্তু বন্ধুদের শত্রু আমদানি করা যাবে না। মক্কা চুক্তি যদি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, কূটনৈতিক গুরুত্ব এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ায়, তাহলে এর সঙ্গে গভীর সহযোগিতার যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। কিন্তু যদি সদস্যপদের অর্থ হয় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ‘সিকিউরিটি অবলিগেশনস’ (নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আইনি, চুক্তিভিত্তিক বা নৈতিক বাধ্যবাধকতা) বাংলাদেশের ওপর নিয়ে আসা, তাহলে এর মূল্য অনেক বেশি হয়ে যেতে পারে।

মক্কার ধর্মীয় আবেদন বাংলাদেশের মানুষের কাছে স্বাভাবিকভাবেই গভীর। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা চুক্তি ধর্মীয় আবেগ বা বন্ধুত্বের ভাষা দিয়ে নয়, তার ‘ছোট ছোট অক্ষরে’ লেখা ‘বাধ্যবাধকতা’ দিয়ে বিচার করতে হয়।

বাংলাদেশের সামনে আসল প্রশ্ন তাই এটা নয় যে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা উচিত কি না। অবশ্যই করা উচিত। আসল প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কীভাবে তাদের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াবে? কখন, কোথায় এবং কার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা নিজের হাতেই রাখবে থাকবে কি না? মক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সেটিই।

● ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা এবং অভিবাসন। ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই

*মতামত লেখকের নিজস্ব

গুমের অন্ধকার অতীত থেকে জবাবদিহিতার পথে বাংলাদেশ।

গুমের অন্ধকার অতীত থেকে জবাবদিহিতার পথে বাংলাদেশ। 

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে গুম একটি গভীর মানবিক ও রাষ্ট্রীয় সংকটের নাম। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে শত শত নয়, সরকারি অনুসন্ধান কমিশনের কাছে আসা অভিযোগ যাচাই করে ১,৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, এসব ঘটনার বড় অংশ ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তদন্তে তৎকালীন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ১,৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে ২৮৭টি ছিল ‘নিখোঁজ ও মৃত’ শ্রেণির। কমিশনের সদস্যরা প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন।

এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দিবস উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় তিনি গুমকে “মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থায় ভিন্নমত ও বিরোধী আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে গুমের মতো নিষ্ঠুর পথ বেছে নেওয়া হয়। তিনি বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে ‘আয়নাঘর’-এর মতো গোপন আটককেন্দ্রে মানুষকে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর আটকে রাখার অভিযোগের কথাও উল্লেখ করেছেন।

এখন প্রশ্ন হলো—এই অন্ধকার অধ্যায়ের পর রাষ্ট্র কীভাবে সামনে এগোবে? শুধু অতীতের ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিলেই হবে না; প্রয়োজন সত্য উদ্ঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা। সেই জায়গায় সরকারের নতুন আইনি উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬-এর খসড়ায় অনুমোদন দিয়েছে, যেখানে গুমকে পৃথক ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তদন্ত, বিচার এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণের কাঠামোর কথা রয়েছে।

তবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে আইনের কাগুজে অস্তিত্ব নয়, তার বাস্তব প্রয়োগ। অতীতের প্রতিটি গুমের সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা যেমন জরুরি, তেমনি নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন সংস্কারও প্রয়োজন, যাতে কোনো সরকার ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিরোধী বা ভিন্নমতের মানুষের বিরুদ্ধে একই ধরনের নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা ব্যবহার করতে না পারে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও জবাবদিহি ও পুনরাবৃত্তি রোধে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

গুমের শিকার মানুষের পরিবার বছরের পর বছর শুধু একজন স্বজনকে হারায়নি; তারা হারিয়েছে স্বাভাবিক জীবন, নিরাপত্তাবোধ এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গুমকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে ঘোষণা এবং তদন্ত, বিচার ও নতুন আইনি কাঠামোর ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রতিশ্রুতি বাস্তব জবাবদিহিতে রূপ নেবে। বাংলাদেশের সামনে এখন সুযোগ আছে অতীতের অন্ধকার থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার, যেখানে কোনো মানুষ আর রাষ্ট্রের ভয়াবহ নীরবতার মধ্যে হারিয়ে যাবে না।

বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী সৌদি আরব

 বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী সৌদি আরব

বাংলাদেশ ও সৌদি আরব দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে রূপ দেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। জেদ্দায় ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের বিশেষ অধিবেশনের ফাঁকে পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশকে সৌদি আরবের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দেশগুলোর অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বাংলাদেশে সৌদি কোম্পানিগুলোর বাড়তে থাকা আগ্রহের কথা তুলে ধরে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা আরও সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রকাশ করেন।

দুই পক্ষ বিদ্যমান সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে। সৌদি আরবের উন্নয়নে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদানেরও প্রশংসা করেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের লেখা সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের উদ্দেশে একটি চিঠি হস্তান্তর করা হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময়ের বিষয়েও আলোচনা হয়।

বাংলাদেশ আশা করছে, সৌদি বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা বাড়লে দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

হুমায়ুন কবির ইস্যুতে প্রথম আলোর ভূমিকা: সাংবাদিকতা, নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ন্যারেটিভ?

হুমায়ুন কবির ইস্যুতে প্রথম আলোর ভূমিকা: সাংবাদিকতা, নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ন্যারেটিভ?

বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে প্রথম আলো নিঃসন্দেহে একটি বড় নাম। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে রাজনৈতিক ও সচেতন মহলে একটি প্রশ্ন বারবার উঠে এসেছে, পত্রিকাটি কি সত্যিই সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখে, নাকি কোনো বিশেষ ভূরাজনৈতিক প্রভাব বা স্বার্থ তাদের সংবাদ পরিবেশনে ভূমিকা রাখে?

অনেকেই চেয়েছেন, প্রথম আলোকে ঘিরে প্রচলিত এসব সন্দেহ ভুল প্রমাণিত হোক। দেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আশা করে, একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখবে। কিন্তু হুমায়ুন কবিরকে ঘিরে সাম্প্রতিক নাগরিকত্ব বিতর্ক এবং সেটি নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের সময় ও ধরন নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

প্রশ্ন হলো, হুমায়ুন কবিরের নাগরিকত্বের বিষয়টি কি জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন? অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু একই মানদণ্ড কি বাংলাদেশের সব রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, এমপি ও উপদেষ্টার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে?

বিগত সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত এমন বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের বিদেশি নাগরিকত্ব বা দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে কি একই ধরনের আগ্রাসী অনুসন্ধান, একই মাত্রার শিরোনাম এবং একই রকম জনআলোচনা তৈরি হয়েছে?

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তৈরি হয়।

ঠিক যে সময় হুমায়ুন কবির ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতা ও বাংলাদেশের মর্যাদার প্রশ্নে প্রকাশ্যে দৃঢ় অবস্থান নিলেন, তার পরপরই কেন তার নাগরিকত্বের বিষয়টি এত বড় বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এলো?

অনেকের কাছেই এই টাইমিং কেবল কাকতালীয় বলে মনে হচ্ছে না। বরং প্রশ্ন উঠছে, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান বা বক্তব্যের সঙ্গে তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের সময়ের কি কোনো সম্পর্ক আছে?

সাংবাদিকতার দায়িত্ব শুধু কারও দুর্বলতা খুঁজে বের করা নয়। সাংবাদিকতার দায়িত্ব ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা, জনস্বার্থের প্রশ্ন সামনে আনা এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য ও নীতিগত বিতর্ককে জনগণের সামনে তুলে ধরা।

হুমায়ুন কবির যখন ভারতের আধিপত্যবাদ নিয়ে কঠোর ভাষায় কথা বললেন এবং দুই দেশের সম্পর্কে সমতার প্রশ্ন তুললেন, তখন সেই বক্তব্য নিয়ে আরও গভীর আলোচনা হতে পারত। তার বক্তব্যের পক্ষে বা বিপক্ষে যুক্তিনির্ভর সম্পাদকীয় লেখা যেতে পারত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় স্বার্থ এবং আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য নিয়ে বড় আলোচনা তৈরি করা যেত।

কিন্তু যেটা দেখা গেল, মূল রাজনৈতিক প্রশ্নের বদলে আলোচনার কেন্দ্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে তার ব্যক্তিগত নাগরিকত্বের দিকে। 

ফলে প্রশ্ন উঠছে, সংবাদমাধ্যম কি সত্যিই জনগণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সামনে আনছে, নাকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আলোচনার গতিপথ এমনভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, যাতে মূল রাজনৈতিক প্রশ্ন আড়ালে পড়ে যায়?

আজকের পৃথিবীতে সংঘাত শুধু সীমান্তে ট্যাংক, যুদ্ধবিমান বা বন্দুক দিয়ে পরিচালিত হয় না। তথ্য, প্রচারণা, জনমত এবং ন্যারেটিভও আধুনিক রাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতা ও ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সংবাদমাধ্যম এই বাস্তবতার বাইরে নয়।

তাই জনগণের সচেতন হওয়া জরুরি। কোনো সংবাদ অন্ধভাবে বিশ্বাস করা ঠিক নয়, বরং প্রতিটি সংবাদ, তার সময়, প্রেক্ষাপট, ভাষা এবং একই ধরনের অন্য ঘটনায় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা তুলনা করে দেখা দরকার।

৫ আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় মানুষের মধ্যে সংবাদ ও তথ্য নিয়ে প্রশ্ন করার প্রবণতা আরও বেড়েছে। মানুষ এখন শুধু শিরোনাম পড়ে সিদ্ধান্ত নিতে চায় না। তারা জানতে চায়, কোন খবর কেন সামনে এলো, কেন একটি বিষয়কে এত গুরুত্ব দেওয়া হলো, আর একই ধরনের অন্য ঘটনাগুলো কেন আলোচনার বাইরে থেকে গেল।

হুমায়ুন কবিরকে ঘিরে নাগরিকত্ব বিতর্কও সেই কারণেই অনেক মানুষের মনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। এই বিতর্ক হয়তো তাকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার বদলে উল্টো সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা, অগ্রাধিকার এবং সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জনমনে থাকা পুরোনো সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো নেতা ভারতের বিরুদ্ধে কথা বললেই তাকে সমালোচনা করা যাবে না, এমন কথা কেউ বলছে না। সমালোচনা অবশ্যই হবে। সাংবাদিকতা প্রশ্ন তুলবেই।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই সমালোচনার মানদণ্ড কি সবার জন্য এক?

একই ধরনের পরিস্থিতিতে কি একই নীতি অনুসরণ করা হয়?

নাকি কারও রাজনৈতিক অবস্থান, বিশেষ করে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক প্রভাবশালী শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তার বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে সংবাদমাধ্যমের আগ্রহের মাত্রা বদলে যায়?

বাংলাদেশের জনগণ আজ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে। আর একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সেই প্রশ্নগুলোর জবাব স্বচ্ছতা, ধারাবাহিকতা এবং একই মানদণ্ডের মাধ্যমে দেওয়া।

পাওনাদারের ভয়ে পিন্টু দাসের আত্মগোপনকে ‘হিন্দুনিধন’ বানিয়ে ভারত ও আওয়ামী লীগ যে ফায়দা লোটার চেষ্টা করল-

পাওনাদারের ভয়ে পিন্টু দাসের আত্মগোপনকে ‘হিন্দুনিধন’ বানিয়ে ভারত ও আওয়ামী লীগ যে ফায়দা লোটার চেষ্টা করল- 

চাঁদপুরের স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দাস পরিবারসহ বাসা ছেড়ে গেলেন। ফোন বন্ধ। দোকানের শাটার তালাবদ্ধ। খবরটা মিডিয়ায় আসতেই ভারতের সোশ্যাল মিডিয়া, আওয়ামী লীগ ও কিছু হিন্দুত্ববাদী মহল একলাফে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল—বাংলাদেশে হিন্দু নিধন শুরু হয়ে গেছে, ইসলামিস্টরা হিন্দুপরিবারকে হত্যা করে লাশ গায়েব করেছে। রংপুরে গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার হত্যার পর এই ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রং দিয়ে আঁকা হলো। কেউ কেউ ভারত সরকারকে ‘কড়া পদক্ষেপ’ নিতে বললেন। পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশন ঘেরাওয়ের ডাক উঠল। বাংলাদেশের কিছু হিন্দু নেতাও সেই সুরে গলা মিলালেন—হিন্দু জনগোষ্ঠী আতঙ্কিত, কেউ কেউ আর এ দেশে থাকতে চান না।

তারপর আজকের খবর। পুলিশ পিন্টু দাস, তার স্ত্রী রিমি এবং দুই ছেলে প্রিয়ম ও রূপমকে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি-পটিয়া এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে। তারা নিজেরাই মোবাইল বন্ধ রেখে সপ্তাহখানেক আত্মগোপনে ছিলেন। কারণ পাওনাদারকে স্বর্ণ ফেরত দিতে না পারা, বাজারে ধার বেড়ে যাওয়া, সালিশি বৈঠক ও চেকের মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীরা আগে থেকেই বলেছিলেন—পিন্টু স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা দেওয়ার ব্যবসা করতেন, সময়মতো অলংকার ফেরত দিতেন না, একাধিকবার দোকান সরিয়েছেন। পুলিশও বলেছে, নিখোঁজের ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়েছিল; তিনি স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে ছিলেন।

রংপুরের ঘটনাও আলাদা করে দেখা দরকার। গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছোট ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে দুই প্রতিবেশী তরুণ মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে। তারা হিন্দু। পুলিশের বক্তব্য, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় সংঘর্ষ ও হত্যা। সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যে পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার কোনো অভিযোগ পুলিশ এখন পর্যন্ত দায়ের করেনি। তবু এই হত্যাকে ‘হিন্দু নিধন’-এর প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হলো, তার ওপর চাঁদপুরের দেনাদারদের ভয়ে লুকিয়ে থাকা পিন্টু দাস কে অপহরণ বানিয়ে গুজব ছড়ানো হলো।  

যেখানে তথ্য ছিল আর্থিক সংকট ও পলায়ন, সেখানে তৈরি করা হলো ভয়ের আখ্যান। ভারতীয় কিছু গণমাধ্যম শিরোনাম দিল ‘হিন্দু পরিবার নিখোঁজ, হুমকির আবহে’। দেশের ভেতরেও কেউ কেউ সেই আখ্যানকে সত্যি বলে চালিয়ে দিলেন। ফলে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর দেনা ও লুকিয়ে থাকার ঘটনা সীমান্ত পার হয়ে কূটনৈতিক চাপ ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার খোরাক হয়ে উঠল।

পিন্টু দাস ভারতে পালানোর পরিকল্পনা করছিলেন কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়। কিন্তু যেভাবে দুই পাড়ের কিছু মহল একযোগে ‘লাশ গায়েব’ ও ‘হিন্দু নিধন’ চিৎকার তুলেছিল, তাতে স্পষ্ট হয়—তথ্য যাচাইয়ের আগেই রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক লাভের হিসাব করা হয়েছিল। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল দেখানোর এই পুরনো ফর্মুলা আবারও কাজে লাগানোর চেষ্টা হয়েছে।

সত্য বড়ই কঠিন। একজন ব্যবসায়ী দেনায় জর্জরিত হয়ে পরিবার নিয়ে লুকিয়েছিলেন। পুলিশ তাকে খুঁজে পেয়েছে। রংপুরের হত্যাকাণ্ডও সাম্প্রদায়িক নয় বলে পুলিশ যে তদন্ত তুলে ধরেছে, তা আলাদা মামলা। এই দুই ঘটনাকে জোড়া লাগিয়ে জাতীয় আতঙ্ক তৈরি করা দেশের স্বার্থের পরিপন্থী। আর এই দুই আতঙ্ককে এক করে আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় মিডিয়াগুলো যেভাবে প্রচারণা করলো তাতে আমাদের সত্যিই সচেতনতার প্রয়োজন আছে। 

 সচেতন থাকতে হবে এই কারণে যে—কে কখন কোন খবরকে কী রং দিয়ে ছড়াচ্ছে, আর বাস্তবতা কী।

চৈতালী কি আওয়ামী লীগকে ফেরানোর ন্যারেটিভে মাঠে? খেলছেন সংখ্যালঘু কার্ড

চৈতালী কি আওয়ামী লীগকে ফেরানোর ন্যারেটিভে মাঠে? খেলছেন সংখ্যালঘু কার্ড

ফ্যাসিস্ট ও পলাতক শেখ হাসিনার শাসনামলকে সনাতনীদের জন্য “স্বর্ণের যুগ” বলা এবং একইসঙ্গে শেখ হাসিনার “কোনো বিকল্প নেই”—এই বক্তব্য দিয়ে চৈতালী জুলাই অভ্যুত্থানে ১৪০০র বেশি শহীদদের অপমান করছেন। তিনি এবার মাঠে নেমেছেন এবং খেলছেন রংপুরে হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারকে নিয়ে নতুন সংখ্যালঘু কার্ড। চৈতালীর কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে এর পেছনে উদ্দেশ্য হলো আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ফিরিয়ে আনার একটি পরিচিত ন্যারেটিভ? 

শুধু সংখ্যালঘু নয়, প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা ইস্যুই সরকারের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলেই তারা নিরাপদ, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কথা বলা হচ্ছে, নাকি সংখ্যালঘু কার্ড ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যাবর্তনের ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে?

আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ককে প্রভাবিত করতে বিদেশি ভূরাজনৈতিক স্বার্থ কোনোভাবে ভূমিকা রাখছে কি না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিদেশি প্রভাবের সম্ভাবনা এবং তার পেছনে একটিভ কাজ করছে এই চৈতালীরা। 

একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার—

বাংলাদেশের হিন্দু নাগরিকদের নিরাপত্তা আওয়ামী লীগের সম্পত্তি নয়।

তাদের নিরাপত্তা কোনো রাজনৈতিক দলের দয়া নয়। এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

তাই “শেখ হাসিনার আমলই ছিল স্বর্ণের যুগ” এবং “শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই”—এই ধরনের বক্তব্য সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে নিরপেক্ষ আলোচনার সীমা অতিক্রম করে সরাসরি একটি রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরি করে।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকেই ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে হবে?

চৈতালীর বক্তব্য ও সাক্ষাৎকার সেটাই তাদের উদ্দেশ্য মনে হলো। 

বাংলাদেশ এমন এক রাষ্ট্র যেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সবার নিরাপত্তা রাষ্ট্র নিশ্চিত করছে বর্তমান সরকার। শুধু সংখ্যালঘু নয়, সবার অধিকার রক্ষায় সরকার সচেষ্ট। কিন্তু সংখ্যালঘুদের অহেতুক ভয়কে রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো যাবে না।

আর কোনো বিদেশি স্বার্থ যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের চেষ্টা করে, তার বিরুদ্ধেও থাকতে হবে সর্বোচ্চ সতর্কতা।

বাংলাদেশের রাজনীতি বাংলাদেশের জনগণ নির্ধারণ করবে।

কোনো বিদেশি প্রেসক্রিপশন নয়। কোনো সংখ্যালঘু কার্ডের রাজনৈতিক ব্যবহার নয়।

Bangladesh First. বাংলাদেশের স্বার্থ সবার আগে।

হাসিনার আমল সনাতনীদের স্বর্ণযুগ ছিল না—চৈতালী ক্ষমতার প্রাসঙ্গিকতা খুঁজছেন, নিরাপত্তা নয়

হাসিনার আমল সনাতনীদের স্বর্ণযুগ ছিল না—চৈতালী ক্ষমতার প্রাসঙ্গিকতা খুঁজছেন, নিরাপত্তা নয়

আলাদা প্রদেশ চাওয়া সেই আলোচিত অ্যাডভোকেট চৈতালী চক্রবর্তী বলেছেন, পনেরো বছর তাঁরা শান্তিতে ছিলেন, সেটা সনাতনীদের “গোল্ডেন যোগ” ছিল; এখন তৌহিদী জনতার হাতে নির্যাতিত। তিনি সংখ্যালঘুর অহেতুক ভয়কে আওয়ামী লীগ ফেরানোর সিঁড়ি বানাচ্ছেন। যে দল নিষিদ্ধ, যে দলের নেতা বিদেশে পলাতক, তাঁদের ফিরিয়ে আনতে চৈতালীদের ধর্মীয় আতঙ্কই সবচেয়ে সস্তা টুলস্।

কিন্তু আওয়ামী লীগের আমলে সনাতনী বা সংখ্যালঘুরা কেমন ছিল?

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব: ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত—অর্থাৎ হাসিনার শাসনেই—হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ৩,৬৭৯টি হামলার নথি। ২০২১ সালের দুর্গাপূজায় ২৭ জেলায় শতাধিক মন্দিরে হামলার খবর। নাসিরনগর ২০১৬, রামু ২০১২, জমি দখল, উচ্ছেদ—এগুলো আওয়ামী আমলের ঘটনা। তখন অপরাধীদের বিচার কম হয়েছে, দোষ গিয়েছে বিরোধীর ঘাড়ে। গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকের মতো হিন্দু নেতা বলেছেন, ১৯৫৫ থেকে এই সম্প্রদায়কে আওয়ামী লীগ জিম্মি করে রেখেছে। হিন্দুদের নিয়ে রাজনীতির সিংহভাগই আওয়ামী লীগের হাতে।

২০২৪-এর আগস্টে হাসিনা পতনের হিন্দুদের নিয়ে গুজব বেড়েছে। কিন্তু তদন্ত ও ফ্যাক্টচেক বারবার দেখিয়েছে, সংখ্যা লঘুদের নিয়ে অনেক ঘটনার মিথ্যা গুজব ছড়িয়েছে। ভারতীয় কিছু মিডিয়া সাম্প্রদায়িক হামলা, নির্যাতনের ফ্রেম বানিয়েছে, আবার পতিত আওযামী পন্থী হিন্দুরা দেশের ভেতরেও অতিরঞ্জন ছড়িয়েছে। চৈতালীরা তাদের মধ্যে অন্যতম।

প্রশ্ন হলো: হাসিনা থাকলে কি হিন্দুরা নিরাপদ ছিলেন, নাকি দলের ছত্রছায়ায় কিছু নেতা নিরাপদ ছিলেন? সাধারণ সনাতনীর জমি, মন্দির, মেয়ের নিরাপত্তা কি সেই আমলে আলাদা আইন পেয়েছিল? উত্তর নেই। ছিল শুধু এই বার্তা—আমাদের সঙ্গে থাকো, নাহলে বিরোধী এলে খেয়ে ফেলবে। এটা নিরাপত্তা নীতি নয়, ভোটের জামিন।

চৈতালী যা চান, তা তার বক্তব্য দেখে স্পষ্ট। তিনি চান ফ্যাসিস্ট হাসিনা ফিরুক, আওয়ামী লীগ আবার প্রাসঙ্গিক হোক। সংখ্যালঘু সেই প্রকল্পের মুখোশ। যে হাসিনার আমলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, জুলাইয়ে নির্মম গুলি, নির্বাচনহীন ক্ষমতা—সেই শাসনকে হিন্দুর স্বর্ণযুগ বলা মানে ইতিহাস মুছে দল বাঁচানো। সনাতনীর অধিকার রাষ্ট্রের দায়, এক দলের দয়া নয়।

চৈতালীরা সেই লক্ষ্যে মাঠে নেমেছে। এটা আওয়ামী লীগের প্রেসক্রিপশন। পেছনে রয়েছে ভারত।

মক্কা প্যাক্ট ও বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত: বাংলাদেশ ফার্স্ট

মক্কা প্যাক্ট ও বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত: বাংলাদেশ ফার্স্ট

মক্কা প্যাক্ট নিয়ে এখন যে আলোচনা চলছে, তার বড় একটি অংশ তথ্যের চেয়ে প্রচারণানির্ভর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি হলো—বাংলাদেশ এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে বিষয়টিকে বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবেই বিবেচনা করছে এবং জাতীয় স্বার্থের আলোকে সব দিক পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

মক্কা প্যাক্ট বাংলাদেশের জন্য নতুন কৌশলগত ও কূটনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে। বৃহত্তর নিরাপত্তা সহযোগিতা, নতুন অংশীদারিত্ব এবং বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পর্ক—এসব দিক থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। অবশ্যই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাংলাদেশের লাভ, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং দায়বদ্ধতাগুলো সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করবে।

কিন্তু বাংলাদেশে মক্কা প্যাক্ট নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকেই ভারতের কিছু গণমাধ্যম ও ইনফ্লুয়েন্সাররা বিষয়টিকে মূলত ভারতের নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করছে। কোথাও বাংলাদেশের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে, কোথাও এমন বার্তা দেওয়া হচ্ছে যেন বাংলাদেশের কৌশলগত সিদ্ধান্ত ভারতের নিরাপত্তা বিবেচনা করেই নিতে হবে।

ভারতের নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের অধিকার অবশ্যই আছে। কিন্তু বাংলাদেশেরও একটি মৌলিক অধিকার আছে—নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী স্বাধীনভাবে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের।

এখানে বিষয়টি পরিষ্কার করা জরুরি: বাংলাদেশ ভারতের বিরুদ্ধে নয়। বাংলাদেশ ভারতকে শত্রু মনে করে না। ভারত আমাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক অংশীদার। ভৌগোলিক বাস্তবতা, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার কারণে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক উভয় দেশের স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু সুসম্পর্ক মানে নির্ভরশীলতা নয়।

বন্ধুত্ব মানে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ছেড়ে দেওয়া নয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল শক্তি হওয়া উচিত strategic autonomy। অর্থাৎ, কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে বহুমুখী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা। ভারত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্ক শুধু একটি দেশকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে পারে না। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য, তুরস্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক থাকবে বাংলাদেশের প্রয়োজন ও জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী।

মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার প্রশ্নটিও তাই বাংলাদেশের নিজস্ব কৌশলগত সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ যদি মনে করে এই অংশীদারিত্ব তার নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করবে, তাহলে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নেওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

বাংলাদেশ কোনো দেশের বিরুদ্ধে জোট করার জন্য সিদ্ধান্ত নেবে না। আবার কোনো দেশের আপত্তির কারণে নিজের কৌশলগত বিকল্পও বন্ধ করবে না।

সিদ্ধান্ত হবে একটিমাত্র মানদণ্ডে—

এতে বাংলাদেশের লাভ কী? বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাড়বে কি? বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা শক্তিশালী হবে কি?

উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।

কারণ আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি খুবই স্পষ্ট:

কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়। কোনো দেশের অধীনেও নয়।

বাংলাদেশের স্বার্থ সবার আগে।

Bangladesh First.

কলকাতায় সাত বাংলাদেশির মৃত্যু খবরে চোখ সরিয়ে রংপুরের খবর সামনে আনল ভারতীয় মিডিয়া, ইচ্ছা করেই দৃষ্টি সরাল নাকি পরিকল্পিত?

কলকাতায় সাত বাংলাদেশির মৃত্যু খবরে চোখ সরিয়ে রংপুরের খবর সামনে আনল ভারতীয় মিডিয়া, ইচ্ছা করেই দৃষ্টি সরাল নাকি পরিকল্পিত?

১৯ আগস্ট ভোররাতে কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকায় শিখা ইন হোটেলে আগুন লাগে। নয়জন মারা যান। পরে পরিচয় মিলে যে তাঁদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি। কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী, ছোট ছেলে ও শ্বশুর—একই পরিবারের চারজন চিকিৎসার জন্য গিয়ে সেই রাতে আর ফেরেননি। সাতক্ষীরা ও ঢাকার আরও কয়েকজনও সেখানে ছিলেন। বাকি দুজন ভারতীয়—একজন হোটেলকর্মী, আরেকজন অতিথি। মৃত্যু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আগুনে পুড়ে নয়, ধোঁয়ায় শ্বাসরোধে। অ্যালার্ম ছিল না, পথ সরু, ভবন অবৈধভাবে হোটেলে রূপান্তরিত। তদন্তে অবহেলা ও লাইসেন্স জালিয়াতি তদন্তে ধরা পড়লেও প্রশ্ন থেকেই যায়, এটা কি পরিকল্পিত হত্যা?

ভারতীয় ও বাংলাদেশি পত্রিকায় প্রথম কয়েকদিন লেখা হয়েছে, লাশ ফেরানো হয়েছে, মালিক-লিজহোল্ডার গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু খবরটি থেকে দ্রুত চোখ সরে যায়। 

তিন-চার দিন পর ২২আগস্ট রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চারজনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। সেখানে সোশ্যাল মিডিয়া ও ভারতীয় কিছু চ্যানেল দ্রুত সাম্প্রদায়িক ফ্রেম চাপায়—হিন্দু পরিবার,  হিন্দু শিক্ষক নিহত। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত বলে: পরিচিত দুজন, মাদক ও জমি নিয়ে সংঘাত। পুলিশের তদন্ত ও ফ্যাক্টচেকও সাম্প্রদায়িক কোনো ইস্যু পায় নি। তবু ভারতীয় মিডিয়া সাম্প্রদায়িক ফ্রেমে অনেক নিউজ ও প্রপাগাণ্ডা চালায়। 

প্রশ্নটা এখানেই- কলকাতায় বাংলাদেশিরা চিকিৎসা নিতে গিয়ে হোটেলে মারা গেলে তা স্থানীয় দুর্ঘটনা হয়ে যায়। রংপুরে হিন্দু পরিবার মারা গেলে তা বাংলাদেশের “সংখ্যালঘু নির্যাতন” হয়ে ওঠে। ভারতীয় মিডিয়ার এক অংশ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অপরাধকে জাতীয় ও সাম্প্রদায়িক ইস্যু বানায়, অথচ নিজেদের শহরে বাংলাদেশি অতিথির মৃত্যুকে একই জোরে ধরে না।

বাংলাদেশি মানে শূন্য কভারেজ, বাংলাদেশে হিন্দু মানে হেডলাইন, সম্পাদকীয়। এখানে আসে অগ্রাধিকারের তারতম্য। এভাবেই চাপা পড়ে গেল কলকাতায় বাংলাদেশিদের নিহতের খবর।

বাংলাদেশের ঘটনাকে ষড়যন্ত্র আর কলকাতারটিকে নিছক দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া ভারতীয় মিডিয়ার চাল। কিন্তু যে প্রশ্ন উঠেছে তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না: কলকাতার ঘটনার পরপরই চোখ সরাতে কি রংপুরের ঘটনায় ভারতের কোনো হাত থাকতে পারে?  

কূটনৈতিক এলাকায় ইমেইল হুমকি: হোয়াক্স নাকি পুরোনো নেটওয়ার্কের নতুন খেলা?

কূটনৈতিক এলাকায় ইমেইল হুমকি: হোয়াক্স নাকি পুরোনো নেটওয়ার্কের নতুন খেলা?

আগস্ট ২০২৬-এ ঢাকার চীনা দূতাবাসসহ কয়েকটি কূটনৈতিক মিশনে ইমেইলের মাধ্যমে হুমকি ও চাঁদা দাবির ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ এটিকে প্রাথমিকভাবে হোয়াক্স বা ভুয়া গ্রুপের কাজ বলে সন্দেহ করছে, যার উদ্দেশ্য হতে পারে আতঙ্ক ছড়ানো, দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা বা সরকারকে বিব্রত করা।

১৭ থেকে ১৯ আগস্টের দিকে “Latbiya” নামে ইমেইল যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, চীনা দূতাবাস, রাশিয়া, সৌদি, তুরস্ক ও পাকিস্তান হাইকমিশনে। বিকাশ ও ক্রিপ্টোতে টাকা চাওয়া হয়। চীনা দূতাবাসের ইমেইলে দূতাবাস ও চীনা প্রকল্পে হামলার হুমকি ছিল বলে সূত্র জানায়। ২০ আগস্ট সিটিটিসি চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে বৈঠক করে। বারিধারা-গুলশানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, এটি অনলাইনের ভুয়া গ্রুপ; বিকাশ নম্বরধারী কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তারা নির্দোষ। কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।

এখানে একটা প্রশ্ন থেকে যায়—কেন ঠিক চীনা দূতাবাসকে আলাদা করে হামলার হুমকি দেওয়া হলো? কেন একই সময়ে একাধিক মিশন টার্গেট করা হলো?

এখানেই পুরোনো এক প্রতিবেদনগুলো আবার আলোচনায় আসে। আমার দেশ পত্রিকা ২০২৫ সালের নভেম্বরে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছিল, বাংলাদেশকে ব্যবহার করে চীনবিরোধী কার্যক্রম চালাতে RAW-এর একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক কাজ করছে। সেই নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে ছিল মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের কিছু নেতা, যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। নাম উঠেছিল ছাত্রলীগের আমিনুল ইসলাম বুলবুল, আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক উপকমিটির মুফতি মাসুম বিল্লাহ নাফিসহ কয়েকজনের। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতীয় গণমাধ্যমে ছোট অনুষ্ঠানকে বড় করে প্রচার করা হতো এবং চীনা দূতাবাস তখন উদ্বেগ জানিয়ে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। ওই প্রতিবেদনটি সম্প্রতি আবারও প্রচারিত হয়েছে।

সরাসরি প্রমাণ নেই যে আগস্টের ইমেইলগুলো সেই নেটওয়ার্ক পাঠিয়েছে। পুলিশও সেই দাবি করেনি। কিন্তু ধরনটা মিলে যায়—চীনকে লক্ষ্য করে চাপ তৈরি, কূটনৈতিক মিশনকে অস্বস্তিতে ফেলা, আর সরকারকে “নিরাপত্তা দিতে পারছে না” এমন চিত্র দাঁড় করানো। আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ, অনেক নেতা বিদেশে পলাতক, ডিসেম্বরে তারা দেশে ফেরার চেষ্টা করছে। আর এমন পরিস্থিতিতে টাকা দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগও উঠছে।

কিছুদিন পরপর এরকম “ভুয়া ইমেইল” পাঠিয়ে সরকারকে বিব্রত করাই উদ্দেশ্য নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও কোনো বৃহৎ ষড়যন্ত্র তা খতিয়ে দেখছে সরকার। চীনা দূতাবাসকে হামলার হুমকি দেওয়ার মতো নির্দিষ্ট বাক্য কে লিখল? হোয়াক্স হলেও হোয়াক্সের পেছনে উদ্দেশ্য থাকে। সেই উদ্দেশ্য খুঁজতে গেলে শুধু ইমেইল সার্ভার নয়, পুরোনো রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্কও দেখতে হয়। তদন্ত সেদিকে যাবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

দিল্লির ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ নেই, আছে কেবল ভারতের নিরাপত্তার হিসাব

দিল্লির ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ নেই, আছে কেবল ভারতের নিরাপত্তার হিসাব

প্রতিবেশীর সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে নিজের নিরাপত্তা সমস্যা বানানো
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের সাম্প্রতিক ব্রিফিংগুলো একই ছকে বাঁধা। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা পদক্ষেপ, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক ইস্যু ও দ্বিপাক্ষিক আইনি প্রক্রিয়া—সব তিনি ভারতের স্বার্থের প্রিজম দিয়ে দেখেন। শান্তি ও ইতিবাচক সম্পর্কের ভাষা নরম। কিন্তু ক্রম ধরে পড়লে বোঝা যায়, এগুলো একপাক্ষিক নিরাপত্তা বাণী। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত সেখানে প্রায় অনুপস্থিত। দিল্লি যা চায় তা ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা’, ঢাকা যা চায় তা ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’—এই দ্বৈত মানদণ্ডই কাউন্টার ন্যারেটিভের মূল কথা।

মক্কা প্যাক্টে ভারতের উদ্বেগ, বাংলাদেশের ডিফেন্স কোথায়?
২৮ আগস্ট ২০২৬-এর ব্রিফিংয়ে জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানসহ যেসব উন্নয়ন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তাকে ছুঁতে পারে, সেগুলো দিল্লি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। ২১ আগস্ট তিনি পশ্চিম এশিয়া পর্যবেক্ষণের কথাও বলেন। কাউন্টার এখানে সোজা। ২৭ আগস্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সংসদে বলেছেন, চুক্তিটি তিন দেশের মধ্যে হয়েছে, ঢাকা একে ইতিবাচকভাবে দেখে; সদস্যরা আগ্রহ জানালে যোগদান বিবেচনা করা হবে। ২৪ আগস্ট প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, মুসলিম দেশগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অংশ নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। ভারত নিজে কোয়াড ও নানা জোটে আছে। সেগুলোকে সে কৌশল বলে। বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা বৈচিত্র্য করতে চাইলেই তা পূর্ব সীমান্তের ঝুঁকি হয়ে যায়। প্রশ্ন থেকে যায়—ঢাকার ডিফেন্স স্বার্থ জয়সওয়ালের বক্তব্যে কোথায়?

সংখ্যালঘু নিয়ে চাপের কূটনীতি, সমতার অভাব
২৬ ডিসেম্বর ২০২৫-এ তিনি হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে ‘অবিরাম শত্রুতা’র কথা বলেন, ময়মনসিংহে হিন্দু যুবক হত্যার নিন্দা করেন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২,৯০০-এর বেশি ঘটনার উল্লেখ করেন। ৯ জানুয়ারি ২০২৬-এ বলেন, পুনরাবৃত্ত হামলাকে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিরোধ বলা অপরাধীদের উৎসাহিত করে। ২৩ জুন ২০২৬-এ দেবদেবী অবমাননার পর চরমপন্থী নিয়ন্ত্রণের কথা বলেন। ২৮ আগস্ট ২০২৬-এ রংপুরের ঘটনায় কেবল বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব। সহিংসতা অস্বীকার করা নয়। কিন্তু একটু ভালোভাবে দেখলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের নাগরিকদের সুরক্ষা ঢাকার দায়িত্ব হলেও সাপ্তাহিক দিল্লি ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশকে নৈতিক আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। অথচ ভারতে সংখ্যালঘু—বিশেষ করে মুসলমানদের ওপর সহিংসতা, উচ্ছেদ ও মসজিদ বিতর্ক উঠলে সেগুলো নিয়ে ভারতের কোনো ব্রিফিং নেই, বরং সেগুলো ভারতের রাষ্ট্রীয় মদদে হয়। উদ্বেগ যদি মানবিক হয়, তাহলে তা দ্বিমুখী হয়। একমুখী উদ্বেগ কূটনীতি নয়, চাপ।

ভারতে বসে হাসিনার বক্তব্য প্রাইভেট নয়, আশ্রয়ের রাজনীতি
৫ আগস্ট ২০২৬-এ শেখ হাসিনা দিল্লিতে ভার্চুয়াল প্রেস ইন্টারঅ্যাকশনে যোগ দেন। ৭ আগস্ট জয়সওয়াল বলেন, ইভেন্ট বেসরকারি, সরকার জড়িত নয়, সরকার তার বক্তব্য সমর্থন করে না। ১৮ আগস্ট বলেন, অবস্থান পুনরাবৃত্তির দরকার নেই। কিন্তু বাংলাদেশ সরাসরি জানায়- দণ্ডিত ও প্রত্যর্পণ চাওয়া পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দিলে তা প্রাইভেট ইভেন্ট থাকে না। সরকার ‘এন্ডোর্স করি না’ বললেই দায় এড়ানো যায় না। ঢাকা চায় বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে থাকা পলাতকের রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ হোক। কিন্তু সেই দাবি তার জবাবে গৌণ। সম্পর্ক চাইলে একই মাটিতে নতুন সরকারকে স্বীকৃতি আর পলাতক হাসিনাকে দিয়ে বিবৃতি—দুটো একসঙ্গে চলে না।

সফরের আমন্ত্রণ আছে, ঢাকার শর্ত উপেক্ষিত
১৪ আগস্ট ২০২৬-এ তিনি দ্বিপাক্ষিক সফর ও ব্রিকস আউটরিচের আমন্ত্রণের কথা বলেন। ১৮ আগস্ট বলেন, আপডেট থাকলে জানাবেন। ২১ আগস্ট বলেন, বলার কিছু নেই। অথচ ১৬ আগস্ট বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ৫ আগস্টের হাসিনা ইভেন্টে সফরের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে; উপযোগী পরিবেশের জন্য প্রত্যর্পণ ও হাদী হত্যার অভিযুক্তদের হস্তান্তর দ্রুত এগোতে হবে। কাউন্টার স্পষ্ট। আমন্ত্রণ সমতা নয়, সময়সূচির রাজনীতি। দিল্লি তারিখ দেয়, ঢাকা শর্ত দেয়, মুখপাত্র বলেন পরে জানাবেন। সফর যদি সম্পর্ক মেরামতের হয়, তবে ঢাকার শর্তকে পাশ কাটিয়ে কেবল আমন্ত্রণ গুনে লাভ নেই।

প্রত্যর্পণে ‘প্রক্রিয়া’ মানে অনির্দিষ্ট আশ্রয়
১৭ জুলাই ২০২৬-এ জয়সওয়াল বলেন, অনুরোধ আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় পরীক্ষাধীন। অথচ ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে। চুক্তিতে রাজনৈতিক অপরাধের ব্যতিক্রম থাকতে পারে—সেটা আইন। হাদির হত্যাকারী ও পলাতক শেখ হাসিনাকে এই চুক্তির অধীন দেশে ফেরত আনতে চায় বাংলাদেশ। কিন্তু ভারত এ ক্ষেত্রে নীরব। চুক্তি দুই দেশের; সুবিধা এক দেশের—এটা প্রতিবেশী নীতি নয়।

সন্ত্রাস যৌথ সমস্যা, অভিযোগ একতরফা
১৮ আগস্ট ২০২৬-এ জাতিসংঘ মনিটরিং প্রতিবেদনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সন্ত্রাস সবার উদ্বেগ, যৌথভাবে মোকাবিলা করতে হবে; যৌথ লড়াইয়ের আহ্বান থাকলেও দিল্লির বয়ানে বাংলাদেশ বারবার ঝুঁকির উৎস। নিজস্ব নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব বাড়াতে চাইলে সেটাকেও ভারতের উদ্বেগ বানিয়ে ফেলা হয়। সন্দেহ একতরফা হলে সহযোগিতা দ্বিমুখী হয় না। যে প্রতিবেশীকে নিরাপত্তার অংশীদার বলা হয়, তাকে সন্দেহের ঠিকানাও বানানো যায় না।

সম্পর্ক চাইলে সংবেদনশীলতা দুই দিকেই লাগে
বাংলাদেশ কখনো প্রতিবেশি রাষ্ট্রকে শত্রু ভাবে না অথচ ভারত এর উল্টোটা ভাবে। প্রতিবেশীর নিরাপত্তা উদ্বেগ নিয়ে জয়সওয়াল বক্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি যা বলেন তা কেবল ভারতের হিসাব। ঢাকার ডিফেন্স, আইনি দাবি ও সমতার শর্ত সেখানে পাদটীকা। এটাই বাংলাদেশের কূটনৈতিক আপত্তি—সম্পর্ক চাই, তত্ত্বাবধান নয়।

পাওনাদারের ভয়ে পিন্টু দাসের আত্মগোপন, রেরিয়ে এল

পাওনাদারের ভয়ে পিন্টু দাসের আত্মগোপনকে ‘হিন্দুনিধন’ বানিয়ে ভারত ও আওয়ামী লীগ যে ফায়দা লোটার চেষ্টা করল- 

চাঁদপুরের স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দাস পরিবারসহ বাসা ছেড়ে গেলেন। ফোন বন্ধ। দোকানের শাটার তালাবদ্ধ। খবরটা মিডিয়ায় আসতেই ভারতের সোশ্যাল মিডিয়া, আওয়ামী লীগ ও কিছু হিন্দুত্ববাদী মহল একলাফে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল—বাংলাদেশে হিন্দু নিধন শুরু হয়ে গেছে, ইসলামিস্টরা হিন্দুপরিবারকে হত্যা করে লাশ গায়েব করেছে। রংপুরে গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার হত্যার পর এই ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রং দিয়ে আঁকা হলো। কেউ কেউ ভারত সরকারকে ‘কড়া পদক্ষেপ’ নিতে বললেন। পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশন ঘেরাওয়ের ডাক উঠল। বাংলাদেশের কিছু হিন্দু নেতাও সেই সুরে গলা মিলালেন—হিন্দু জনগোষ্ঠী আতঙ্কিত, কেউ কেউ আর এ দেশে থাকতে চান না।

তারপর আজকের খবর। পুলিশ পিন্টু দাস, তার স্ত্রী রিমি এবং দুই ছেলে প্রিয়ম ও রূপমকে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি-পটিয়া এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে। তারা নিজেরাই মোবাইল বন্ধ রেখে সপ্তাহখানেক আত্মগোপনে ছিলেন। কারণ পাওনাদারকে স্বর্ণ ফেরত দিতে না পারা, বাজারে ধার বেড়ে যাওয়া, সালিশি বৈঠক ও চেকের মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীরা আগে থেকেই বলেছিলেন—পিন্টু স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা দেওয়ার ব্যবসা করতেন, সময়মতো অলংকার ফেরত দিতেন না, একাধিকবার দোকান সরিয়েছেন। পুলিশও বলেছে, নিখোঁজের ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়েছিল; তিনি স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে ছিলেন।

রংপুরের ঘটনাও আলাদা করে দেখা দরকার। গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছোট ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে দুই প্রতিবেশী তরুণ মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে। তারা হিন্দু। পুলিশের বক্তব্য, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় সংঘর্ষ ও হত্যা। সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যে পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার কোনো অভিযোগ পুলিশ এখন পর্যন্ত দায়ের করেনি। তবু এই হত্যাকে ‘হিন্দু নিধন’-এর প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হলো, তার ওপর চাঁদপুরের দেনাদারদের ভয়ে লুকিয়ে থাকা পিন্টু দাস কে অপহরণ বানিয়ে গুজব ছড়ানো হলো।  

যেখানে তথ্য ছিল আর্থিক সংকট ও পলায়ন, সেখানে তৈরি করা হলো ভয়ের আখ্যান। ভারতীয় কিছু গণমাধ্যম শিরোনাম দিল ‘হিন্দু পরিবার নিখোঁজ, হুমকির আবহে’। দেশের ভেতরেও কেউ কেউ সেই আখ্যানকে সত্যি বলে চালিয়ে দিলেন। ফলে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর দেনা ও লুকিয়ে থাকার ঘটনা সীমান্ত পার হয়ে কূটনৈতিক চাপ ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার খোরাক হয়ে উঠল।

পিন্টু দাস ভারতে পালানোর পরিকল্পনা করছিলেন কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়। কিন্তু যেভাবে দুই পাড়ের কিছু মহল একযোগে ‘লাশ গায়েব’ ও ‘হিন্দু নিধন’ চিৎকার তুলেছিল, তাতে স্পষ্ট হয়—তথ্য যাচাইয়ের আগেই রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক লাভের হিসাব করা হয়েছিল। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল দেখানোর এই পুরনো ফর্মুলা আবারও কাজে লাগানোর চেষ্টা হয়েছে।

সত্য বড়ই কঠিন। একজন ব্যবসায়ী দেনায় জর্জরিত হয়ে পরিবার নিয়ে লুকিয়েছিলেন। পুলিশ তাকে খুঁজে পেয়েছে। রংপুরের হত্যাকাণ্ডও সাম্প্রদায়িক নয় বলে পুলিশ যে তদন্ত তুলে ধরেছে, তা আলাদা মামলা। এই দুই ঘটনাকে জোড়া লাগিয়ে জাতীয় আতঙ্ক তৈরি করা দেশের স্বার্থের পরিপন্থী। আর এই দুই আতঙ্ককে এক করে আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় মিডিয়াগুলো যেভাবে প্রচারণা করলো তাতে আমাদের সত্যিই সচেতনতার প্রয়োজন আছে। 

 সচেতন থাকতে হবে এই কারণে যে—কে কখন কোন খবরকে কী রং দিয়ে ছড়াচ্ছে, আর বাস্তবতা কী।

কেবল সংকটের শিরোনাম দিয়েই প্রথম আলোর প্রথম পাতা


কেবল সংকটের শিরোনাম দিয়েই
প্রথম আলোর প্রথম পাতা

বুধবারের প্রথম আলোর প্রথম পাতা দেখলে মনে হয় দেশে আর কিছু ঘটেনি—শুধু খুন, চাঁদাবাজি, সারের সংকট আর ভ্যাটের হিসাব। মাঝখানে বড় গ্রাফিক: ছয় মাসে ১৮টি পারিবারিক হত্যাকাণ্ড, নিহত ২৪। নিচে মোটা অক্ষরে ‘একের পর এক ভয়ংকর খুন’। পাশে উদ্ধৃতি, ‘বাঁচতে চাইলে সব দে’—ঢাকায় ঢুকেই তারা অপরাধের শিকার। ডানদিকে কৃষক সার পাচ্ছেন না, নিচে হেয়ারকাট ভ্যাট বাতিল। ঈদে মিলাদুন্নবী আর বিজ্ঞাপন বাদ দিলে পুরো পাতা যেন একটা অস্থিরতার পোস্টার।

প্রথম পাতায় পাঠক কী খোঁজে? প্রথম আলো কী দিচ্ছে? একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বন্ধ কারখানার জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ এগোচ্ছে, সেপ্টেম্বরে বিতরণের কথা বলা হচ্ছে। আদানি চুক্তি বহাল রেখে বকেয়া পরিশোধ ও সরবরাহ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমদানি নীতি হালনাগাদ হয়েছে। এগুলো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত—ভালো-মন্দ যাচাইয়ের বিষয়। কিন্তু প্রথম পাতায় সেগুলোর ছাপ নেই। যে সংবাদ পাঠক সকালে প্রথমে দেখবে, সেখানে শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও অভাবের খবর।

পত্রিকার কাজ সংকট চাপা দেওয়া নয়। খুন হচ্ছে, চাঁদাবাজি হচ্ছে, কৃষক সার পাচ্ছে না—এগুলো খবর। সমস্যা হলো অগ্রাধিকার। প্রায় কয়েক মাস ধরে একই ফ্রেম: নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার এসেছে, মনে হয় যেন এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা ভেঙেছে, মানুষ অসহায়, রাষ্ট্র ব্যর্থ। আওয়ামী লীগ আমলের গুম-ক্রসফায়ার-নির্বাচনী সহিংসতা আগে কি একই স্কেলে প্রথম পাতা জুড়ে থাকত কি না, সেই তুলনা পাঠক নিজেই করতে পারেন। এখন যে ভাষা ব্যবহার হচ্ছে—‘ভয়ংকর’, ‘বাঁচতে চাইলে সব দে’—তা ঘটনার চেয়ে অনুভূতি তৈরি করে বেশি।

এই ফ্রেম দুই দিকে কাজে লাগে। দেশের ভিতরে এটি বর্তমান প্রশাসনকে ব্যর্থ দেখায়। বাইরে, বিশেষ করে ভারতীয় মিডিয়া ও নিষিদ্ধ আওয়ামী নেটওয়ার্কে, একই ছবি ঘুরে বেড়ায়—বাংলাদেশ অরাজক, সংখ্যালঘু ও সাধারণ মানুষ অরক্ষিত। প্রথম আলো সরাসরি সেই প্রচারণার অংশ কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সম্পাদকীয় পছন্দ যে সেই ন্যারেটিভকে উস্কানি ও যোগান দিচ্ছে সেটা বুঝতে আর বাকি নেই সরকারের উদ্যোগ থাকলেও তা ভেতরের পাতায় ঠেলে দিয়ে প্রথম পাতায় শুধু সংকট রাখা—এটা নিরপেক্ষতার চেহারা নয়, এজেন্ডা সেটিং।

একটা পত্রিকা রাষ্ট্রের আয়না। কিন্তু সে যদি টানা একদিকেই আলো ফেলে আর অন্যদিক অন্ধকারে রাখে, তবে পাঠক জিজ্ঞেস করতেই পারে—প্রথম আলো প্রথম পাতা কী সেই রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি দেখাচ্ছে, নাকি একটা রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের ছবি আঁকছে।

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team