দিল্লির ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ নেই, আছে কেবল ভারতের নিরাপত্তার হিসাব

0

দিল্লির ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ নেই, আছে কেবল ভারতের নিরাপত্তার হিসাব

প্রতিবেশীর সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে নিজের নিরাপত্তা সমস্যা বানানো
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের সাম্প্রতিক ব্রিফিংগুলো একই ছকে বাঁধা। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা পদক্ষেপ, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক ইস্যু ও দ্বিপাক্ষিক আইনি প্রক্রিয়া—সব তিনি ভারতের স্বার্থের প্রিজম দিয়ে দেখেন। শান্তি ও ইতিবাচক সম্পর্কের ভাষা নরম। কিন্তু ক্রম ধরে পড়লে বোঝা যায়, এগুলো একপাক্ষিক নিরাপত্তা বাণী। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত সেখানে প্রায় অনুপস্থিত। দিল্লি যা চায় তা ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা’, ঢাকা যা চায় তা ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’—এই দ্বৈত মানদণ্ডই কাউন্টার ন্যারেটিভের মূল কথা।

মক্কা প্যাক্টে ভারতের উদ্বেগ, বাংলাদেশের ডিফেন্স কোথায়?
২৮ আগস্ট ২০২৬-এর ব্রিফিংয়ে জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানসহ যেসব উন্নয়ন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তাকে ছুঁতে পারে, সেগুলো দিল্লি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। ২১ আগস্ট তিনি পশ্চিম এশিয়া পর্যবেক্ষণের কথাও বলেন। কাউন্টার এখানে সোজা। ২৭ আগস্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সংসদে বলেছেন, চুক্তিটি তিন দেশের মধ্যে হয়েছে, ঢাকা একে ইতিবাচকভাবে দেখে; সদস্যরা আগ্রহ জানালে যোগদান বিবেচনা করা হবে। ২৪ আগস্ট প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, মুসলিম দেশগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অংশ নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। ভারত নিজে কোয়াড ও নানা জোটে আছে। সেগুলোকে সে কৌশল বলে। বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা বৈচিত্র্য করতে চাইলেই তা পূর্ব সীমান্তের ঝুঁকি হয়ে যায়। প্রশ্ন থেকে যায়—ঢাকার ডিফেন্স স্বার্থ জয়সওয়ালের বক্তব্যে কোথায়?

সংখ্যালঘু নিয়ে চাপের কূটনীতি, সমতার অভাব
২৬ ডিসেম্বর ২০২৫-এ তিনি হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে ‘অবিরাম শত্রুতা’র কথা বলেন, ময়মনসিংহে হিন্দু যুবক হত্যার নিন্দা করেন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২,৯০০-এর বেশি ঘটনার উল্লেখ করেন। ৯ জানুয়ারি ২০২৬-এ বলেন, পুনরাবৃত্ত হামলাকে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিরোধ বলা অপরাধীদের উৎসাহিত করে। ২৩ জুন ২০২৬-এ দেবদেবী অবমাননার পর চরমপন্থী নিয়ন্ত্রণের কথা বলেন। ২৮ আগস্ট ২০২৬-এ রংপুরের ঘটনায় কেবল বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব। সহিংসতা অস্বীকার করা নয়। কিন্তু একটু ভালোভাবে দেখলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের নাগরিকদের সুরক্ষা ঢাকার দায়িত্ব হলেও সাপ্তাহিক দিল্লি ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশকে নৈতিক আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। অথচ ভারতে সংখ্যালঘু—বিশেষ করে মুসলমানদের ওপর সহিংসতা, উচ্ছেদ ও মসজিদ বিতর্ক উঠলে সেগুলো নিয়ে ভারতের কোনো ব্রিফিং নেই, বরং সেগুলো ভারতের রাষ্ট্রীয় মদদে হয়। উদ্বেগ যদি মানবিক হয়, তাহলে তা দ্বিমুখী হয়। একমুখী উদ্বেগ কূটনীতি নয়, চাপ।

ভারতে বসে হাসিনার বক্তব্য প্রাইভেট নয়, আশ্রয়ের রাজনীতি
৫ আগস্ট ২০২৬-এ শেখ হাসিনা দিল্লিতে ভার্চুয়াল প্রেস ইন্টারঅ্যাকশনে যোগ দেন। ৭ আগস্ট জয়সওয়াল বলেন, ইভেন্ট বেসরকারি, সরকার জড়িত নয়, সরকার তার বক্তব্য সমর্থন করে না। ১৮ আগস্ট বলেন, অবস্থান পুনরাবৃত্তির দরকার নেই। কিন্তু বাংলাদেশ সরাসরি জানায়- দণ্ডিত ও প্রত্যর্পণ চাওয়া পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দিলে তা প্রাইভেট ইভেন্ট থাকে না। সরকার ‘এন্ডোর্স করি না’ বললেই দায় এড়ানো যায় না। ঢাকা চায় বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে থাকা পলাতকের রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ হোক। কিন্তু সেই দাবি তার জবাবে গৌণ। সম্পর্ক চাইলে একই মাটিতে নতুন সরকারকে স্বীকৃতি আর পলাতক হাসিনাকে দিয়ে বিবৃতি—দুটো একসঙ্গে চলে না।

সফরের আমন্ত্রণ আছে, ঢাকার শর্ত উপেক্ষিত
১৪ আগস্ট ২০২৬-এ তিনি দ্বিপাক্ষিক সফর ও ব্রিকস আউটরিচের আমন্ত্রণের কথা বলেন। ১৮ আগস্ট বলেন, আপডেট থাকলে জানাবেন। ২১ আগস্ট বলেন, বলার কিছু নেই। অথচ ১৬ আগস্ট বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ৫ আগস্টের হাসিনা ইভেন্টে সফরের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে; উপযোগী পরিবেশের জন্য প্রত্যর্পণ ও হাদী হত্যার অভিযুক্তদের হস্তান্তর দ্রুত এগোতে হবে। কাউন্টার স্পষ্ট। আমন্ত্রণ সমতা নয়, সময়সূচির রাজনীতি। দিল্লি তারিখ দেয়, ঢাকা শর্ত দেয়, মুখপাত্র বলেন পরে জানাবেন। সফর যদি সম্পর্ক মেরামতের হয়, তবে ঢাকার শর্তকে পাশ কাটিয়ে কেবল আমন্ত্রণ গুনে লাভ নেই।

প্রত্যর্পণে ‘প্রক্রিয়া’ মানে অনির্দিষ্ট আশ্রয়
১৭ জুলাই ২০২৬-এ জয়সওয়াল বলেন, অনুরোধ আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় পরীক্ষাধীন। অথচ ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে। চুক্তিতে রাজনৈতিক অপরাধের ব্যতিক্রম থাকতে পারে—সেটা আইন। হাদির হত্যাকারী ও পলাতক শেখ হাসিনাকে এই চুক্তির অধীন দেশে ফেরত আনতে চায় বাংলাদেশ। কিন্তু ভারত এ ক্ষেত্রে নীরব। চুক্তি দুই দেশের; সুবিধা এক দেশের—এটা প্রতিবেশী নীতি নয়।

সন্ত্রাস যৌথ সমস্যা, অভিযোগ একতরফা
১৮ আগস্ট ২০২৬-এ জাতিসংঘ মনিটরিং প্রতিবেদনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সন্ত্রাস সবার উদ্বেগ, যৌথভাবে মোকাবিলা করতে হবে; যৌথ লড়াইয়ের আহ্বান থাকলেও দিল্লির বয়ানে বাংলাদেশ বারবার ঝুঁকির উৎস। নিজস্ব নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব বাড়াতে চাইলে সেটাকেও ভারতের উদ্বেগ বানিয়ে ফেলা হয়। সন্দেহ একতরফা হলে সহযোগিতা দ্বিমুখী হয় না। যে প্রতিবেশীকে নিরাপত্তার অংশীদার বলা হয়, তাকে সন্দেহের ঠিকানাও বানানো যায় না।

সম্পর্ক চাইলে সংবেদনশীলতা দুই দিকেই লাগে
বাংলাদেশ কখনো প্রতিবেশি রাষ্ট্রকে শত্রু ভাবে না অথচ ভারত এর উল্টোটা ভাবে। প্রতিবেশীর নিরাপত্তা উদ্বেগ নিয়ে জয়সওয়াল বক্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি যা বলেন তা কেবল ভারতের হিসাব। ঢাকার ডিফেন্স, আইনি দাবি ও সমতার শর্ত সেখানে পাদটীকা। এটাই বাংলাদেশের কূটনৈতিক আপত্তি—সম্পর্ক চাই, তত্ত্বাবধান নয়।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team