অপরাধ করে আর পার পাওয়া যাচ্ছে না, মিরপুর, রংপুর ও সর্বশেষ ঢাকায় আসামী গ্রেফতারে যা দেখা গেল-

0

 অপরাধ করে আর পার পাওয়া যাচ্ছে না, মিরপুর, রংপুর ও সর্বশেষ ঢাকায় আসামী গ্রেফতারে যা দেখা গেল-

২০২৬ সালে বাংলাদেশে অপরাধের চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। ধরার পরও বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকার যে অভ্যাস দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল, তার জায়গায় এখন দৃশ্যমান গ্রেপ্তার আর কিছু ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক দ্রুত বিচার দেখা যাচ্ছে। সরকার যে বলেছিল অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না, সেই প্রতিশ্রুতির ছাপ রামিসা হত্যা থেকে সংসদ ভবনের সামনের ছিনতাই পর্যন্ত একাধিক ঘটনায় স্পষ্ট।

মে মাসে মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ করে গলা কেটে হত্যা করা হয়। মাথা কেটে আলাদা করা হয়। ঘটনার পরদিনই প্রতিবেশী সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার গ্রেপ্তার হন। দেশজুড়ে ক্ষোভের মুখে মামলা দ্রুত এগোয়। জুনের শুরুতে বিচার শুরু হয়, সাত তারিখেই ট্রাইব্যুনাল দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ঘটনার উনিশ দিনের মাথায় রায়। এত দ্রুত শিশু ধর্ষণ-হত্যার বিচার দেশে আগে খুব কমই হয়েছে। উচ্চ আদালতে নিশ্চিতকরণ এখনও বাকি থাকলেও তদন্ত থেকে রায় পর্যন্ত যে গতি দেখা গেল, তা সরকারের অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত দেয়।

আগস্টে রংপুরে আরেকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও বারো বছরের ছেলে—একই পরিবারের চারজনকে বাড়িতে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। লাশ উদ্ধারের পরদিনই দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা আদালতে হত্যার কথা স্বীকার করেন। ছাদে ইয়াবা সেবন করতে গিয়ে দেখা হয়ে যাওয়ায় খুন—পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য এমনই। তদন্ত এখনও চলছে, চার্জশিট হয়নি। কিন্তু ঘটনার চব্বিশ থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে মূল সন্দেহভাজনদের জালে ফেলা গেছে। আগে এমন পরিবারিক হত্যাকাণ্ডে সপ্তাহখানেক তদন্ত ঝুলে থাকত। এবার সেই বিলম্ব দেখা যায়নি।

সর্বশেষ ঘটনা ঘটে জাতীয় সংসদ ভবনের একেবারে সামনে। উনত্রিশ আগস্ট ভোরে বগুড়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন রিকশায় যাচ্ছিলেন। মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা ব্যাগ ধরে টান দেয়। তিনি পড়ে মাথায় আঘাত পেয়ে মারা যান। ত্রিশ তারিখেই র‌্যাব প্রধান আসামি পনি ওরফে প্যারা পনি ও এক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে। মোটরসাইকেলও জব্দ হয়। রাজধানীর সবচেয়ে সংবেদনশীল এলাকায় ছিনতাই করে প্রাণহানি—এমন ঘটনায় একদিনের মধ্যে গ্রেপ্তার অনেকটা নজীর তৈরি করল।

এই তিনটি ঘটনা আলাদা আলাদা হলেও সরকারের আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সাফল্য দৃশ্যমান। মাগুরার আসিয়া হত্যার মতো পুরনো চাঞ্চল্যকর শিশু ধর্ষণ-হত্যা মামলাও উচ্চ আদালতে অগ্রাধিকার পেয়েছে। নারায়ণগঞ্জে এক যুবনেতা খুন হওয়ার পরদিনই একাধিক আসামি ধরা পড়ে। মে থেকে আগস্টের মধ্যে বিশেষ অভিযানে সারা দেশে পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে। অস্ত্র, মাদক ও বিস্ফোরক উদ্ধার হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের আলাদা ড্রাইভেও একদিনে কয়েক ডজন অপরাধী আটক হয়েছে।

গত ছয় মাসে গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেনি। অপরাধীকে আইনের মধ্যে রেখে ধরা হচ্ছে—এটা ইতিবাচক। রামিসা মামলায় যেভাবে সাক্ষী হাজির, স্বীকারোক্তি গ্রহণ ও রায় একসঙ্গে এগোল, সেই মডেল অন্য মামলায়ও প্রয়োগ করা হলে অপরাধীরা পার পাবে না। রংপুরের ঘটনা ও সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাই মামলায় চার্জশিট ও বিচার যেন দ্রুত শুরু হয়, এটাই প্রত্যাশা।

এখন পর্যন্ত যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে অপরাধ করে পালিয়ে যাওয়া আগের মতো সহজ নয়। চাঞ্চল্যকর খুন, ধর্ষণ বা ছিনতাইয়ের পর দ্রুত গ্রেপ্তার হচ্ছে। কিছু মামলায় বিচারও দ্রুত হচ্ছে। সরকার যে বলেছিল কেউ পার পাবে না, ২০২৬ সালের এই কয়েকটি ঘটনা সেই কথার বাস্তবায়ন দেখাচ্ছে। বাকিটা নির্ভর করছে বিচারের ধারাবাহিকতার ওপর। তবে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি যে সরকারের প্রতিশ্রুতি মতোই এগোচ্ছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team