বিদ্যুৎ অফিস ভাঙলে বিদ্যুৎ আসবে না

0

 বিদ্যুৎ অফিস ভাঙলে বিদ্যুৎ আসবে না

দেশে লোডশেডিং হচ্ছে এটা ঠিক। কিন্তু এই লোডশেডিং এর পেছনের কারণ না খুঁজে প্রতিবাদ করতে গিয়ে যে জিনিসটা চোখে পড়লো তা ভয়ংকর। কারণ প্রতিবাদ করতে গিয়ে যে অন্যায় হচ্ছে সেটা কিন্তু আরেকটা অন্যায়।

স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিস বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, পিডিবির বিতরণ বিভাগ বা অভিযোগ কেন্দ্র—এগুলো শুধু বিতরণ করে। সরকার যে পরিমাণ বিদ্যুৎ গ্রিডে দেয়, তারা সেটা এলাকায় এলাকায় পৌঁছে দেয়। হাতে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না থাকলে লাইনম্যান বা জোনাল অফিসের কর্মকর্তা নতুন মেগাওয়াট তৈরি করতে পারেন না। অফিসের জানালা ভাঙলেও পাওয়ার প্ল্যান্ট চালু হয় না। সাবস্টেশন ভাঙলে বরং যেটুকু সরবরাহ আছে, সেটাও ব্যাহত হয়। নিজেদেরই লাইন, নিজেদেরই মিটার, নিজেদেরই অভিযোগ কেন্দ্র—এগুলো ভাঙা মানে নিজেদের সেবা ভাঙা।

২০২৬ সাল জুড়ে এই ভুল বারবার হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অভিযোগ কেন্দ্রে ভাঙচুর, খুলনার কয়রায় জোনাল অফিসে হামলা, চাঁদপুরে লাইনকর্মীকে ধরে নিয়ে যাওয়া, নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় খেলা দেখতে না পেরে অফিসে ইটপাটকেল, ময়মনসিংহে বিদ্যুতের দাবিতে হামলা, সিরাজগঞ্জে ঘেরাও। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড নিজেই জানিয়েছে—উপকেন্দ্রে হামলা, ক্রুদের মারধর, অফিস ঘেরাও, বিল আদায়ে বাধা আর হুমকি চলছে। কর্মীরা নিরাপত্তা চাইছেন। এতে লোডশেডিং কমছে না। শুধু অফিস ভাঙছে, মানুষ আরও কষ্ট পাচ্ছে।

তবে আরেকটা বিষয় বলে রাখি, কেন এই বিদ্যুত থাকছে না, গ্যাস থাকছে না একটু ভেবে দেখুন। সরকার কেন বলছে বিদ্যুতের অপচয় করবেন না, গ্যাসের অপচয় করবেন না। সরকার নিজেও তার অফিসে এগুলোর অপচয় রোধের নিয়ম করে দিয়েছেন সেটা বোঝার চেষ্টা করুন। প্রকৃত কারণ বুঝুন। এরপর প্রতিবাদ করার প্রয়োজন হলে সেটা করুন-।

প্রতিবাদ করতে হবে। কিন্তু জায়গা বদলাতে হবে। যেখানে বরাদ্দ হয়, যেখানে নীতি হয়, যেখানে জবাবদিহি থাকে—সেখানে যেতে হবে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে দাঁড়ান। ডিসির বাসভবনের সামনে যান। এলাকার সংসদ সদস্যের বাড়ি বা অফিসের সামনে যান। বিদ্যুৎ মন্ত্রীর বাসভবন বা মন্ত্রণালয়ের সামনে যান। সচিবালয়ের সামনে যান। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করেন। সেখানে চাহিদা আর সরবরাহের হিসাব চাইতে হয়। সেখানে গ্যাস সংকট, কয়লা, আইপিপি চুক্তি, বকেয়া বিল আর উৎপাদন বন্ধের জবাব চাইতে হয়। স্থানীয় অফিস সেই জবাব দিতে পারে না, কারণ সিদ্ধান্ত সেখানে হয় না।

এখন প্রশ্ন ওঠে—কেন বারবার সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটাই টার্গেট হয়? যে অফিস ভাঙলে পরের দিনও একই লোডশেডিং থাকবে, সেখানেই মানুষকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কেন? ক্ষোভ স্বতঃস্ফূর্ত হতে পারে। কিন্তু ক্ষোভকে ভুল দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া সহজ রাজনীতি। পতিত শক্তি ক্ষমতা হারিয়ে মাঠে নেই। তারা সরাসরি মিছিল করতে পারে না। কিন্তু গুজব, উসকানি আর ভুল টার্গেট তৈরি করে অরাজকতা করতে তারা পটু। স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসে হামলা করার ছবি তারা আবার ফেসবুকে শেয়ার দিচ্ছে, সরকারকে ব্যর্থ দেখানোর চেষ্টা করছে, এতে বিদ্যুতের কর্মীরা ভয় পাচ্ছে, সেবা আরও খারাপ হচ্ছে। এতে জনগণের লাভ নেই। লাভ হয় সেই শক্তির, যারা নতুন সরকারকে ব্যর্থ দেখাতে চায়।

তাই হুদাই অফিস ভাঙবেন না। এগুলো আপনাদেরই সম্পদ। লাইনকর্মী আপনার এলাকার মানুষ। তাদের মারলে বিদ্যুৎ ফিরবে না। উসকানিতে পা দিলে নিজেদের ক্ষতি নিজেরাই করবেন। লোডশেডিংয়ের হিসাব চাইতে হলে যেখানে হিসাব রাখা হয়, সেখানে যান। প্রতিবাদ জায়গামতো করুন। ২০২৩ সালে এর চেয়েও বেশি লোড শেডিং হতো, সে কথা কি ভুলে গেছেন?

ক্ষোভ থাকবে, কিন্তু ভাঙচুরের দায়টা গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে সেটা একবার ভাবুন। আর কার ফাঁদে পা দিয়ে ভাঙতে যাচ্ছেন সেটাও ভাবুন।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team