এখনো মক্কা প্যাক্টে যোগ দেয়নি বাংলাদেশ, তাতেই নাখোশ ভারত?
সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের আগ্রহের খবর নয়াদিল্লিতে অস্বস্তি তৈরি করেছে। অথচ বাংলাদেশ এই চুক্তিতে এখনো যোগ দেয়নি। ত্রিপক্ষীয় সেই প্যাক্ট সই হয়েছে গত ৭ আগস্ট মক্কায়। ধারা অনুযায়ী এক দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা অন্য দুই দেশের ওপর হামলার সমান বলে গণ্য হবে। ঢাকার পক্ষ থেকে উদ্যোগটিকে ইতিবাচক দেখা হচ্ছে এবং জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত হবে। ঢাকা এখনো এই চুক্তিতে কোনো সই করেনি, কেননা বাংলাদশকে এখনো আমন্ত্রণও জানানো হয় নি, বাংলাদেশ কেবল আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আগ্রহকেই যদি জোটবদ্ধতা বলে ধরে নেওয়া হয়, আর তাতেই প্রতিবেশি রাষ্ট্র হুমকি ধামকি দেয় তাহলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা কোথায়?
বাংলাদেশ কোন দেশের সঙ্গে কী ধরনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করবে, সেটা স্বাধীন রাষ্ট্রের এখতিয়ার। এই আঙ্গিকে দুই দেশের চুক্তির তুলনা করলে বিষয়টা পরিষ্কার হয়। ভারত নিজেও কোনো ন্যাটো-জোটে নেই। কিন্তু গত এক দশকে সে বহুমুখী প্রতিরক্ষা জাল গড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জিএসওএমআইএ, লেমোয়া, কোমকাসা, বেকা এবং গত বছর নতুন দশ বছরের প্রতিরক্ষা ফ্রেমওয়ার্ক সই হয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে আরইএলওএস চুক্তিতে ঘাঁটি, বন্দর ও বিমানঘাঁটি ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে। জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে লজিস্টিক্স চুক্তি আছে, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সঙ্গেও অনুরূপ সহযোগিতা চালু রয়েছে। ইসরায়েল ভারতের অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি অংশীদার। কুয়াডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-জাপান-অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় হয়, ভুটানের সঙ্গে রয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা সম্পর্ক। এগুলো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট না হলেও সামরিক শক্তি মনোবল বাড়ায়। নয়াদিল্লি একে বলে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বলছে। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন- একই যুক্তি ঢাকার ক্ষেত্রে হলে এতে তাদের আপত্তি কেন?
বাংলাদেশেরও পূর্ণাঙ্গ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোট নেই। যা আছে, তার বেশিরভাগ সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও জনবল চুক্তি। চীনের সঙ্গে ২০০২ সালের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি আছে এবং বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি সই হয়েছে। মালয়েশিয়া ও নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে নতুন সমঝোতা হয়েছে। কাতারের সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীতে জনবল প্রেষণের চুক্তি আছে। তুরস্কের সঙ্গে বার্ষিক ২+২ বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং প্রতিরক্ষা শিল্প ও প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জিএসওএমআইএ ও এসিএসএ নিয়ে আলোচনা চলছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক যোগাযোগ ফিরেছে, তবে পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়নি। ভারতের সঙ্গে ১৯৭২ সালের মৈত্রী চুক্তি ও পরবর্তী সমঝোতা কাগজে আছে। ২০১৭ সালে যে ব্যাপক প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের প্রস্তাব উঠেছিল, তা পূর্ণ চুক্তিতে পরিণত হয়নি। ২০২৪-পরবর্তী বাস্তবতায় সেই সম্পর্ক আর আগের মতো নেই।
তুলনা করলে দেখা যায়, ভারতের প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক জটিল ও বহুমেরু। বাংলাদেশের নেটওয়ার্ক নতুন করে ছড়াচ্ছে, কিন্তু এখনো ক্রয় বিক্রয় ও সহযোগিতার স্তরে। মক্কা প্যাক্টে যোগ দিলে সেটা হতো প্রথমবারের মতো একের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা—এমন কাঠামো হবে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই এখনো হয়নি।
নয়াদিল্লির উদ্বেগ একটু বোঝার চেষ্টা করি। তারা ভাবছে পাকিস্তান এ চুক্তির অন্যতম পক্ষ। তুরস্ক-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। সৌদি অর্থ ও তুরস্কের অস্ত্র শিল্প যুক্ত হলে দক্ষিণ এশিয়ার ভারসাম্য বদলাতে পারে—এমনটাই ভাবছে ভারতীয় বিশেজ্ঞরা। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল ও বঙ্গোপসাগর ভারতের নিরাপত্তা হিসাবে সংবেদনশীল। কিন্তু উদ্বেগ আর অধিকার এক জিনিস নয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্র অন্য দেশের প্রতিরক্ষা পছন্দ ভেটো দিতে পারে না। ভারত নিজে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া—পরস্পরবিরোধী দুই শক্তির সঙ্গে একসঙ্গে লজিস্টিক্স চুক্তি করেছে, ফ্রান্স থেকে যুদ্ধবিমান কিনেছে, ইসরায়েল থেকে মিসাইল প্রতিরক্ষা নিয়েছে, জাপান-অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক সমন্বয় করেছে। সেই নীতিকে যদি বহুমুখী স্বায়ত্তশাসন বলা হয়, বাংলাদেশের তুরস্ক-চীন-জাপান-কাতার-মার্কিন আলোচনাকেও একই মাপকাঠিতে দেখা সঙ্গত। ঢাকার আগ্রহ প্রকাশমাত্রই ভারত যদি কূটনৈতিক চাপ তৈরি করে তাহলে তো ব্যাপারটা এমন হলো যে ঢাকার প্রতিরক্ষা কূটনীতির অনুমোদন যেন নয়াদিল্লিতে! স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কি এটা মেনে নেবে?
বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নীতি ছিল জোটনিরপেক্ষতা ও বহুমুখী ভারসাম্য। সেই নীতি রেখেই সহযোগিতা বাড়ানো যায় কিনা, আর এ চুক্তিতে গেলে ব্যাপারটা এমন নয় যে এটা এটা আসলে কোনো আক্রমণাত্মক জোট নয়, বরং প্রতিরক্ষামূলক। এই জোটের কোনো নির্দিষ্ট শত্রু দেশ নেই। এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে, জোটের দেশগুলো নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করবে না। এবং তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াবে।
বাংলাদেশ এখনো পর্যন্ত কখনই কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়নি। যদি এখন যোগ দিতে চায় তাহলে সেটা হবে প্রথম। সুতরাং কোনো কিছুতে প্রথম হওয়ার আগে জাতীয় পর্যায়ে এটাকে নিয়ে আরও অনেক আলোচনা ও বিশ্লেষণ হবে, তারপর যোগ দেওয়ার চিন্তা। আর বাংলাদেশ সেই পর্যায়ে আছে। সুতরাং ভারতের এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment