জনগণের আস্থা, জবাবদিহি ও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’

0

 

ছয় মাসের রাষ্ট্রচিন্তা

জনগণের আস্থা, জবাবদিহি ও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. একেএম শামছুল ইসলাম, পিএসসি, জি (অব.)

দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সবচেয়ে কঠিন মূল্য যে রাজনৈতিক দলটি দিয়েছে, তার জন্য বিএনপির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন নিছক একটি নির্বাচনি বিজয়ের ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। মামলা, গুম, খুন, নির্যাতন, রাজনৈতিক হয়রানি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দলটি যে রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, তার পরিণতিতে ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জনগণকে বহুদিন পর নিজেদের রাজনৈতিক পছন্দ প্রকাশের সুযোগ দেয়। সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

গত ১৬ আগস্ট সেই সরকারের ছয় মাস বা ১৮০ দিন পূর্ণ হয়েছে। ছয় মাস একটি রাষ্ট্রের ইতিহাসে দীর্ঘ সময় নয়। বিশেষ করে এমন একটি রাষ্ট্রের জন্য নয়, যে রাষ্ট্র দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক অব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, জ্বালানি সংকট এবং সর্বোপরি জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের আস্থার সম্পর্কের গভীর ক্ষয় নিয়ে নতুন সরকারের হাতে এসেছে। ছয় মাস এমন একটি সময়, যার মধ্যে একটি সরকারের চরিত্র, অগ্রাধিকার, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার দিকনির্দেশনা সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়।

এই ছয় মাসের সবচেয়ে বড় অর্জন তাই কোনো অবকাঠামো কিংবা কোনো একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নয়। সবচেয়ে বড় অর্জন রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা।

একটি সরকার জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসতে পারে; কিন্তু জনগণের সরকার হয়ে উঠতে হলে তাকে প্রতিদিন জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। নির্বাচনের দিন ভোট পাওয়া একটি রাজনৈতিক ম্যান্ডেট। কিন্তু সেই ম্যান্ডেটের মর্যাদা রক্ষা করা একটি প্রতিদিনের দায়িত্ব। নির্বাচনের পর ক্ষমতা আর জনগণের হাতে থাকে না—এমন ধারণাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিপদ। বরং নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতাই সরকারের ওপর দায়িত্ব আরোপ করে।

এই ছয় মাসের মূল্যায়ন তাই শুধু সরকার কী করেছে, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ হতে পারে না। প্রশ্ন হলো—কী পরিবর্তনের সূচনা করেছে এবং আগামী দিনে কোথায় যেতে চায়।

ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের—বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন নিয়ে মানুষের হতাশা ও অবিশ্বাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায় রয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনকে ঘিরে অংশগ্রহণের সংকট, ২০১৮ সালের নির্বাচনে রাতের ভোটের অভিযোগ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ঘিরে ‘ডামি নির্বাচন’-এর রাজনৈতিক অভিধা—সব মিলিয়ে নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

এই বাস্তবতার বিপরীতে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তন করে না; এটি রাষ্ট্রের বৈধতার ভিত্তিকে পুনর্নির্মাণ করে। ভোটার যখন বিশ্বাস করেন তাঁর একটি ভোটের মূল্য আছে, তখন তিনি কেবল একজন সরকার নির্বাচন করেন না—তিনি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণে নিজের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।

এই কারণেই ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং পরবর্তী সরকারকে শুধু একটি রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এটি বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘ রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার একটি বহিঃপ্রকাশ।

রাষ্ট্রের ক্ষমতার প্রকৃত উৎস জনগণ—এই কথাটি সংবিধানে লেখা থাকলেই যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর আচরণে এই সত্যের প্রতিফলন থাকতে হয়। বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ এখানেই।

জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়া সরকার জনগণের কাছে আরও বেশি দায়বদ্ধ হতে হবে। ক্ষমতার বৈধতা যেন কখনো ক্ষমতার অহংকারে পরিণত না হয়—এটাই গণতন্ত্রের মৌলিক শিক্ষা। জনসমর্থন শুধু আবেগ নয়, এটি দায়িত্বেরও উৎস।

গত ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কর্মসূচিকে ঘিরে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি, রাজনৈতিক আবেগ এবং জনসম্পৃক্ততা রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষের ঢল কিংবা বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় বিপুল উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের আবেগ ও প্রত্যাশা প্রকাশ করেছে।

কিন্তু জনসমর্থন কোনো স্থায়ী সম্পদ নয়। এটি অর্জন করতে হয়, ধরে রাখতে হয় এবং প্রতিদিন নতুন করে প্রমাণ করতে হয়। রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা যদি সুশাসনের বিকল্প হয়ে যায়, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়। আবার সুশাসন যদি মানুষের আবেগ, প্রত্যাশা ও মর্যাদাকে উপেক্ষা করে, তাহলেও সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাই প্রয়োজন আরও বেশি দায়িত্ব, আত্মসংযম এবং জবাবদিহি।

প্রধানমন্ত্রী যেখানেই যান, মানুষ তাঁর কাছে ছুটে আসেন—এটি আনন্দের বিষয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি বড় পরীক্ষা। কারণ মানুষের প্রত্যাশা যত বেশি, সরকারের ব্যর্থতার মূল্যও তত বেশি। জনতার ভালোবাসাকে রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত না করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রূপান্তর করাই সরকারের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team