হুমায়ুন কবির ইস্যুতে প্রথম আলোর ভূমিকা: সাংবাদিকতা, নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ন্যারেটিভ?

0

হুমায়ুন কবির ইস্যুতে প্রথম আলোর ভূমিকা: সাংবাদিকতা, নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ন্যারেটিভ?

বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে প্রথম আলো নিঃসন্দেহে একটি বড় নাম। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে রাজনৈতিক ও সচেতন মহলে একটি প্রশ্ন বারবার উঠে এসেছে, পত্রিকাটি কি সত্যিই সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখে, নাকি কোনো বিশেষ ভূরাজনৈতিক প্রভাব বা স্বার্থ তাদের সংবাদ পরিবেশনে ভূমিকা রাখে?

অনেকেই চেয়েছেন, প্রথম আলোকে ঘিরে প্রচলিত এসব সন্দেহ ভুল প্রমাণিত হোক। দেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আশা করে, একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখবে। কিন্তু হুমায়ুন কবিরকে ঘিরে সাম্প্রতিক নাগরিকত্ব বিতর্ক এবং সেটি নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের সময় ও ধরন নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

প্রশ্ন হলো, হুমায়ুন কবিরের নাগরিকত্বের বিষয়টি কি জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন? অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু একই মানদণ্ড কি বাংলাদেশের সব রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, এমপি ও উপদেষ্টার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে?

বিগত সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত এমন বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের বিদেশি নাগরিকত্ব বা দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে কি একই ধরনের আগ্রাসী অনুসন্ধান, একই মাত্রার শিরোনাম এবং একই রকম জনআলোচনা তৈরি হয়েছে?

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তৈরি হয়।

ঠিক যে সময় হুমায়ুন কবির ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতা ও বাংলাদেশের মর্যাদার প্রশ্নে প্রকাশ্যে দৃঢ় অবস্থান নিলেন, তার পরপরই কেন তার নাগরিকত্বের বিষয়টি এত বড় বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এলো?

অনেকের কাছেই এই টাইমিং কেবল কাকতালীয় বলে মনে হচ্ছে না। বরং প্রশ্ন উঠছে, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান বা বক্তব্যের সঙ্গে তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের সময়ের কি কোনো সম্পর্ক আছে?

সাংবাদিকতার দায়িত্ব শুধু কারও দুর্বলতা খুঁজে বের করা নয়। সাংবাদিকতার দায়িত্ব ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা, জনস্বার্থের প্রশ্ন সামনে আনা এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য ও নীতিগত বিতর্ককে জনগণের সামনে তুলে ধরা।

হুমায়ুন কবির যখন ভারতের আধিপত্যবাদ নিয়ে কঠোর ভাষায় কথা বললেন এবং দুই দেশের সম্পর্কে সমতার প্রশ্ন তুললেন, তখন সেই বক্তব্য নিয়ে আরও গভীর আলোচনা হতে পারত। তার বক্তব্যের পক্ষে বা বিপক্ষে যুক্তিনির্ভর সম্পাদকীয় লেখা যেতে পারত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় স্বার্থ এবং আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য নিয়ে বড় আলোচনা তৈরি করা যেত।

কিন্তু যেটা দেখা গেল, মূল রাজনৈতিক প্রশ্নের বদলে আলোচনার কেন্দ্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে তার ব্যক্তিগত নাগরিকত্বের দিকে। 

ফলে প্রশ্ন উঠছে, সংবাদমাধ্যম কি সত্যিই জনগণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সামনে আনছে, নাকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আলোচনার গতিপথ এমনভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, যাতে মূল রাজনৈতিক প্রশ্ন আড়ালে পড়ে যায়?

আজকের পৃথিবীতে সংঘাত শুধু সীমান্তে ট্যাংক, যুদ্ধবিমান বা বন্দুক দিয়ে পরিচালিত হয় না। তথ্য, প্রচারণা, জনমত এবং ন্যারেটিভও আধুনিক রাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতা ও ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সংবাদমাধ্যম এই বাস্তবতার বাইরে নয়।

তাই জনগণের সচেতন হওয়া জরুরি। কোনো সংবাদ অন্ধভাবে বিশ্বাস করা ঠিক নয়, বরং প্রতিটি সংবাদ, তার সময়, প্রেক্ষাপট, ভাষা এবং একই ধরনের অন্য ঘটনায় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা তুলনা করে দেখা দরকার।

৫ আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় মানুষের মধ্যে সংবাদ ও তথ্য নিয়ে প্রশ্ন করার প্রবণতা আরও বেড়েছে। মানুষ এখন শুধু শিরোনাম পড়ে সিদ্ধান্ত নিতে চায় না। তারা জানতে চায়, কোন খবর কেন সামনে এলো, কেন একটি বিষয়কে এত গুরুত্ব দেওয়া হলো, আর একই ধরনের অন্য ঘটনাগুলো কেন আলোচনার বাইরে থেকে গেল।

হুমায়ুন কবিরকে ঘিরে নাগরিকত্ব বিতর্কও সেই কারণেই অনেক মানুষের মনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। এই বিতর্ক হয়তো তাকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার বদলে উল্টো সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা, অগ্রাধিকার এবং সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জনমনে থাকা পুরোনো সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো নেতা ভারতের বিরুদ্ধে কথা বললেই তাকে সমালোচনা করা যাবে না, এমন কথা কেউ বলছে না। সমালোচনা অবশ্যই হবে। সাংবাদিকতা প্রশ্ন তুলবেই।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই সমালোচনার মানদণ্ড কি সবার জন্য এক?

একই ধরনের পরিস্থিতিতে কি একই নীতি অনুসরণ করা হয়?

নাকি কারও রাজনৈতিক অবস্থান, বিশেষ করে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক প্রভাবশালী শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তার বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে সংবাদমাধ্যমের আগ্রহের মাত্রা বদলে যায়?

বাংলাদেশের জনগণ আজ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে। আর একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সেই প্রশ্নগুলোর জবাব স্বচ্ছতা, ধারাবাহিকতা এবং একই মানদণ্ডের মাধ্যমে দেওয়া।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team