পাওনাদারের ভয়ে পিন্টু দাসের আত্মগোপনকে ‘হিন্দুনিধন’ বানিয়ে ভারত ও আওয়ামী লীগ যে ফায়দা লোটার চেষ্টা করল-
চাঁদপুরের স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দাস পরিবারসহ বাসা ছেড়ে গেলেন। ফোন বন্ধ। দোকানের শাটার তালাবদ্ধ। খবরটা মিডিয়ায় আসতেই ভারতের সোশ্যাল মিডিয়া, আওয়ামী লীগ ও কিছু হিন্দুত্ববাদী মহল একলাফে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল—বাংলাদেশে হিন্দু নিধন শুরু হয়ে গেছে, ইসলামিস্টরা হিন্দুপরিবারকে হত্যা করে লাশ গায়েব করেছে। রংপুরে গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার হত্যার পর এই ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রং দিয়ে আঁকা হলো। কেউ কেউ ভারত সরকারকে ‘কড়া পদক্ষেপ’ নিতে বললেন। পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশন ঘেরাওয়ের ডাক উঠল। বাংলাদেশের কিছু হিন্দু নেতাও সেই সুরে গলা মিলালেন—হিন্দু জনগোষ্ঠী আতঙ্কিত, কেউ কেউ আর এ দেশে থাকতে চান না।
তারপর আজকের খবর। পুলিশ পিন্টু দাস, তার স্ত্রী রিমি এবং দুই ছেলে প্রিয়ম ও রূপমকে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি-পটিয়া এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে। তারা নিজেরাই মোবাইল বন্ধ রেখে সপ্তাহখানেক আত্মগোপনে ছিলেন। কারণ পাওনাদারকে স্বর্ণ ফেরত দিতে না পারা, বাজারে ধার বেড়ে যাওয়া, সালিশি বৈঠক ও চেকের মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীরা আগে থেকেই বলেছিলেন—পিন্টু স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা দেওয়ার ব্যবসা করতেন, সময়মতো অলংকার ফেরত দিতেন না, একাধিকবার দোকান সরিয়েছেন। পুলিশও বলেছে, নিখোঁজের ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়েছিল; তিনি স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে ছিলেন।
রংপুরের ঘটনাও আলাদা করে দেখা দরকার। গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছোট ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে দুই প্রতিবেশী তরুণ মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে। তারা হিন্দু। পুলিশের বক্তব্য, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় সংঘর্ষ ও হত্যা। সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যে পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার কোনো অভিযোগ পুলিশ এখন পর্যন্ত দায়ের করেনি। তবু এই হত্যাকে ‘হিন্দু নিধন’-এর প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হলো, তার ওপর চাঁদপুরের দেনাদারদের ভয়ে লুকিয়ে থাকা পিন্টু দাস কে অপহরণ বানিয়ে গুজব ছড়ানো হলো।
যেখানে তথ্য ছিল আর্থিক সংকট ও পলায়ন, সেখানে তৈরি করা হলো ভয়ের আখ্যান। ভারতীয় কিছু গণমাধ্যম শিরোনাম দিল ‘হিন্দু পরিবার নিখোঁজ, হুমকির আবহে’। দেশের ভেতরেও কেউ কেউ সেই আখ্যানকে সত্যি বলে চালিয়ে দিলেন। ফলে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর দেনা ও লুকিয়ে থাকার ঘটনা সীমান্ত পার হয়ে কূটনৈতিক চাপ ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার খোরাক হয়ে উঠল।
পিন্টু দাস ভারতে পালানোর পরিকল্পনা করছিলেন কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়। কিন্তু যেভাবে দুই পাড়ের কিছু মহল একযোগে ‘লাশ গায়েব’ ও ‘হিন্দু নিধন’ চিৎকার তুলেছিল, তাতে স্পষ্ট হয়—তথ্য যাচাইয়ের আগেই রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক লাভের হিসাব করা হয়েছিল। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল দেখানোর এই পুরনো ফর্মুলা আবারও কাজে লাগানোর চেষ্টা হয়েছে।
সত্য বড়ই কঠিন। একজন ব্যবসায়ী দেনায় জর্জরিত হয়ে পরিবার নিয়ে লুকিয়েছিলেন। পুলিশ তাকে খুঁজে পেয়েছে। রংপুরের হত্যাকাণ্ডও সাম্প্রদায়িক নয় বলে পুলিশ যে তদন্ত তুলে ধরেছে, তা আলাদা মামলা। এই দুই ঘটনাকে জোড়া লাগিয়ে জাতীয় আতঙ্ক তৈরি করা দেশের স্বার্থের পরিপন্থী। আর এই দুই আতঙ্ককে এক করে আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় মিডিয়াগুলো যেভাবে প্রচারণা করলো তাতে আমাদের সত্যিই সচেতনতার প্রয়োজন আছে।
সচেতন থাকতে হবে এই কারণে যে—কে কখন কোন খবরকে কী রং দিয়ে ছড়াচ্ছে, আর বাস্তবতা কী।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment