বাংলাদেশের মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া উচিত
ডেইলি স্টার যে ন্যারেটিভ দাঁড় করাচ্ছে, তা আওয়ামী লীগ আমলের ভারতকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির পুরোনো সুর
পররাষ্ট্রনীতিতে ‘র্যাশনাল অ্যাক্টর’ মডেল মানে শুধু যুদ্ধ এড়ানো নয়। এর অর্থ হলো—দেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানো, একপেশে নির্ভরতা ভাঙা এবং যে জোটে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হয় সেখানে জায়গা নেওয়া। ডেইলি স্টারের ‘মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া উচিত নয়’ শীর্ষক লেখাটি এই যুক্তিকে উল্টো দিকে টেনে নিয়েছে। প্রবন্ধটি আপাতদৃষ্টিতে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের ছদ্মবেশ ধরেছে, কিন্তু তার মূল সুর পরিচিত: ভারতকে বিরক্ত করো না, উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামো থেকে দূরে থাকো, আর ‘জোটনিরপেক্ষতা’ নামে পুরোনো ভারসাম্যহীন নীতিকেই জাতীয় স্বার্থ বলে চালিয়ে দাও।
এই সুর নতুন নয়। আওয়ামী লীগ আমলেও একই যুক্তি শোনা যেত—ভারতের সঙ্গে সামরিক সংঘাত এড়াতে হবে, তাই কৌশলগত বিকল্পও এড়াতে হবে। সমস্যা হলো, সেই নীতি বাংলাদেশকে নিরাপদ করেনি; বরং পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য ও নিরাপত্তায় একতরফা চাপের মুখে রেখেছে। মক্কা চুক্তি নিয়ে এখন যে আপত্তি তোলা হচ্ছে, তা অনেকটা সেই পুরোনো কাঠামোর প্রতিরক্ষা।
প্রথম যুক্তি ছিল—বাংলাদেশের গুরুতর বহিরাগত সামরিক হুমকি নেই, তাই প্রতিরক্ষা চুক্তির দরকার নেই। এটি বাস্তবতাবিরোধী। মিয়ানমার সীমান্তে রোহিঙ্গা সংকট, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, আরাকান সেনা ও সীমান্তবর্তী অস্থিরতা বাংলাদেশের নিরাপত্তাকে সরাসরি স্পর্শ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্ত্রধারী গোষ্ঠী, সীমান্তে পুশ-ইন, এবং প্রতিবেশীর কৌশলগত আধিপত্য—এগুলো ‘কূটনীতি দিয়েই সব মেটানো যাবে’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক চুক্তিতে যোগ দিয়েছে বলেই যে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া অবান্তর—এমন যুক্তি দুর্বল। প্রশ্ন হওয়া উচিত, বাংলাদেশ কি শুধু অন্যের হুমকির ছায়ায় থাকবে, নাকি নিজের কৌশলগত অবস্থান তৈরি করবে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প, সৌদি অর্থায়ন এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৈচিত্র্যময় করতে পারে। এটা যুদ্ধ বাড়ানো নয়, বিকল্প তৈরি করা।
দ্বিতীয় যুক্তি—পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ হলে বাংলাদেশকে ভারতের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। এটি চুক্তিকে ইচ্ছাকৃতভাবে সরল করে দেখানো। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চুক্তি ন্যাটো-ধাঁচের সম্মিলিত প্রতিরোধের কথা বলে; কিন্তু প্রতিটি পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় সেনা পাঠানোর বাধ্যবাধকতা যে অকাট্যভাবে লিখিত, তা প্রবন্ধ প্রমাণ করেনি। তুরস্ক নিজেই বলেছে, সহায়তার মাত্রা ও ধরন পরামর্শের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ হলো ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানো নয়; ভারতের সঙ্গে অসম কূটনৈতিক সম্পর্কে এককভাবে বন্দি না থাকা। তিস্তা, গঙ্গা, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি ও পুশ-ইনের সমাধান শুধু ‘আরও কূটনীতি’ দিয়ে হয়নি। সামুদ্রিক সীমানা ও স্থলসীমানা চুক্তিকে উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়, কিন্তু সেগুলো আওয়ামী লীগ আমলের ভারতঘেঁষা রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ফল—বাংলাদেশ যেসব ইস্যুতে বারবার ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে, সেগুলোর সমাধান নয়। সম্মিলিত প্রতিরোধ মানেই যুদ্ধ নয়; অনেক সময় তা চাপের ভারসাম্য তৈরি করে।
তৃতীয় যুক্তি—উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হবে, প্রবাসী শ্রম বিপন্ন হবে। বাস্তবতা উল্টোও হতে পারে। সৌদি আরব বাংলাদেশি শ্রমবাজারের অন্যতম বৃহত্তম গন্তব্য। যে রাষ্ট্র শ্রম, রেমিট্যান্স ও ধর্মীয় কূটনীতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেই রাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা কাঠামো থেকে দূরে থাকা কি সত্যিই ‘অভিবাসন কূটনীতি’? সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান ও কুয়েতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা জরুরি—কিন্তু সেটা সৌদিকে এড়িয়ে চলার অজুহাত হতে পারে না। বহুমুখী উপসাগরীয় নীতি মানে সবার সঙ্গে কথা বলা, এক পক্ষকে খুশি রাখতে অন্য পক্ষ থেকে সরে দাঁড়ানো নয়। আওয়ামী লীগ আমলে ভারতকেন্দ্রিক ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে বাংলাদেশ বারবার কৌশলগত বিকল্প সংকুচিত করেছে। সেই পথকেই এখন ‘সতর্কতা’ বলে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
চতুর্থ যুক্তি—হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বিপন্ন হবে। হরমুজ ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি। ইরান-সৌদি উত্তেজনা বাংলাদেশ চুক্তির বাইরে থাকলেও কমবে না। প্রশ্ন হলো, জ্বালানি সরবরাহকারী প্রধান রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক থাকলে ঝুঁকি কি বাড়ে, নাকি আলোচনার জায়গা বাড়ে? সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করতে পারে। উল্টোদিকে, শুধু ইরানকে না রাগানোর যুক্তিতে সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান জোট থেকে দূরে থাকা মানে আরেকটি নির্ভরতা মেনে নেওয়া—যে নির্ভরতা আগেও বাংলাদেশকে দুর্বল অবস্থানে রেখেছে।
পঞ্চম যুক্তি—বাংলাদেশ যুদ্ধে জড়ানোর সামর্থ্য রাখে না, তাই মানবিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ যুক্তির সঙ্গে দ্বিমতের জায়গা নেই যে যুদ্ধ জনগণের জন্য ধ্বংসাত্মক। কিন্তু মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া মানে যুদ্ধে নামার প্রতিশ্রুতি নয়; যুদ্ধ এড়ানোর মতো কৌশলগত ভার তৈরি করা। যে দেশ শুধু উন্নয়ন কথা বলে প্রতিরক্ষা বহুমুখীকরণ এড়ায়, সে-ই চাপে পড়ে সবচেয়ে বেশি। সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি আর জোটবদ্ধ প্রতিরোধ এক জিনিস নয়। তুরস্কের ড্রোন ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সৌদি বিনিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ সহযোগিতা বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে পারে—যাতে দেশকে হঠাৎ কোনো সংকটে এককভাবে দাঁড়াতে না হয়। স্নায়ুযুদ্ধের উদাহরণ টেনে সব প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বলে চালানো বুদ্ধিবৃত্তিক ফাঁকি। বাংলাদেশের প্রশ্ন আমেরিকা-সোভিয়েত প্রতিযোগিতায় নামার নয়; প্রতিবেশীর অসম চাপের মুখে বিকল্প অংশীদার রাখা।
ডেইলি স্টারের লেখা শেষ করেছে জোটনিরপেক্ষতার পক্ষে। কিন্তু বাংলাদেশের জোটনিরপেক্ষতা বহুদিন ধরেই নামে নিরপেক্ষ, কাজে ভারতকেন্দ্রিক ছিল। সেই নীতিকে এখন ‘জনগণের স্বার্থ’ বলে উপস্থাপন করা মানে পুরোনো ক্ষমতা কাঠামোর ভাষাকে নতুন করে সাজানো। ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশ যদি সত্যিই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে বিশ্বাস করে, তবে সৌদি আরব-তুরস্ক-পাকিস্তানের মতো মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা আলোচনাকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। যোগ দেওয়া মানে চোখ বন্ধ করে চুক্তি সই করা নয়। যোগ দেওয়া মানে শর্ত, সংরক্ষণ, জাতীয় স্বার্থ ও সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসা।
যে মিডিয়া বছরের পর বছর ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে ‘আঞ্চলিক বাস্তবতা’ বলে গ্রহণ করে, অথচ বাংলাদেশের কৌশলগত বহুমুখীকরণকে ‘যুদ্ধে জড়ানো’ বলে আতঙ্ক ছড়ায়—সেই মিডিয়ার সুরকে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ বলা যায় না। মক্কা চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, শর্ত চাওয়া যায়, ধীরগতিতে যাওয়া যায়। কিন্তু চুক্তিটিকে আগে থেকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা—এবং তাকে মানবিক নিরাপত্তার নামে ন্যায্যতা দেওয়া—আসলে পুরোনো পররাষ্ট্রনৈতিক নির্ভরতাকে রক্ষা করার চেষ্টা।
বাংলাদেশের স্বার্থ যুদ্ধে নামার নয়। বাংলাদেশের স্বার্থ হলো এমন অবস্থান তৈরি করা, যেখানে পানি, সীমান্ত, শ্রমবাজার, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা—কোনোটিই একক প্রতিবেশীর অনুগ্রহের ওপর নির্ভর না করে। সেই অর্থে মক্কা চুক্তি বিবেচনা করা উচিত। দূরে সরে থাকা নয়, শর্ত সাপেক্ষে যোগ দেওয়ার কূটনীতিই এখনকার বাস্তবসম্মত পথ।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment