গুমের অন্ধকার অতীত থেকে জবাবদিহিতার পথে বাংলাদেশ।

0

গুমের অন্ধকার অতীত থেকে জবাবদিহিতার পথে বাংলাদেশ। 

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে গুম একটি গভীর মানবিক ও রাষ্ট্রীয় সংকটের নাম। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে শত শত নয়, সরকারি অনুসন্ধান কমিশনের কাছে আসা অভিযোগ যাচাই করে ১,৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, এসব ঘটনার বড় অংশ ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তদন্তে তৎকালীন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ১,৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে ২৮৭টি ছিল ‘নিখোঁজ ও মৃত’ শ্রেণির। কমিশনের সদস্যরা প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন।

এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দিবস উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় তিনি গুমকে “মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থায় ভিন্নমত ও বিরোধী আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে গুমের মতো নিষ্ঠুর পথ বেছে নেওয়া হয়। তিনি বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে ‘আয়নাঘর’-এর মতো গোপন আটককেন্দ্রে মানুষকে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর আটকে রাখার অভিযোগের কথাও উল্লেখ করেছেন।

এখন প্রশ্ন হলো—এই অন্ধকার অধ্যায়ের পর রাষ্ট্র কীভাবে সামনে এগোবে? শুধু অতীতের ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিলেই হবে না; প্রয়োজন সত্য উদ্ঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা। সেই জায়গায় সরকারের নতুন আইনি উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬-এর খসড়ায় অনুমোদন দিয়েছে, যেখানে গুমকে পৃথক ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তদন্ত, বিচার এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণের কাঠামোর কথা রয়েছে।

তবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে আইনের কাগুজে অস্তিত্ব নয়, তার বাস্তব প্রয়োগ। অতীতের প্রতিটি গুমের সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা যেমন জরুরি, তেমনি নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন সংস্কারও প্রয়োজন, যাতে কোনো সরকার ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিরোধী বা ভিন্নমতের মানুষের বিরুদ্ধে একই ধরনের নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা ব্যবহার করতে না পারে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও জবাবদিহি ও পুনরাবৃত্তি রোধে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

গুমের শিকার মানুষের পরিবার বছরের পর বছর শুধু একজন স্বজনকে হারায়নি; তারা হারিয়েছে স্বাভাবিক জীবন, নিরাপত্তাবোধ এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গুমকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে ঘোষণা এবং তদন্ত, বিচার ও নতুন আইনি কাঠামোর ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রতিশ্রুতি বাস্তব জবাবদিহিতে রূপ নেবে। বাংলাদেশের সামনে এখন সুযোগ আছে অতীতের অন্ধকার থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার, যেখানে কোনো মানুষ আর রাষ্ট্রের ভয়াবহ নীরবতার মধ্যে হারিয়ে যাবে না।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team