পাহাড়ি-বাঙালি বিভেদ নয়, সংবিধানের ছায়ায় হোক জাতীয় ঐক্য

0


পাহাড়ি-বাঙালি বিভেদ নয়, সংবিধানের ছায়ায় জাতীয় ঐক্য

প্রতিবছর ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালিত হয়। জাতিসংঘের উদ্যোগে আয়োজিত এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার, অনন্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জানানো। কিন্তু বাংলাদেশে এই দিবসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এক রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক নতুন করে মাথাচাড়া দেয়। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হলো—পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের অনগ্রসর জাতিসত্তাগুলোকে ‘আদিবাসী’ বলা হবে, নাকি সংবিধানে উল্লেখিত ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হবে। এই প্রশ্ন শুধু শব্দচয়নের বিষয় নয়। এটি জাতীয় নিরাপত্তা, ভূ-রাজনীতি, সাংবিধানিক কাঠামো এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

বাংলাদেশের সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দের কোনো স্বীকৃতি নেই। ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ২৩ক অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এখানে ‘আদিবাসী’ শব্দটি সচেতনভাবেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক বাস্তবতা। নৃতত্ত্ব ও ইতিহাসের তথ্য অনুসারে, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ অন্যান্য অঞ্চলের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী এই ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা নয়। তারা বিভিন্ন সময়ে মায়ানমার, তিব্বত ও আসাম থেকে অভিবাসিত হয়ে এসেছে। অন্যদিকে বাঙালি জনগোষ্ঠী হাজার হাজার বছর ধরে এই পলি মাটিতে বসবাস করে আসছে। তাই আন্তর্জাতিক কোনো পরিভাষা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সাংবিধানিক পরিচয় নির্ধারণ করতে পারে না।

সংবিধানের ৬(২) অনুচ্ছেদ আরও স্পষ্ট করেছে যে, বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশি বলে পরিচিত হবেন। অর্থাৎ নাগরিক পরিচয় এক ও অভিন্ন। ২৭, ২৮, ৩১ ও ৪২ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের সমঅধিকার ও সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি ব্যবস্থাপনায় বিশেষ আইন প্রচলিত থাকায় পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের মতভেদ তৈরি হয়েছে। এই বিভেদ দূর করতে হলে কোনো রাজনৈতিক কানাঘুষা বা আন্তর্জাতিক চাপ নয়, সংবিধান ও আইনের শাসনের পথেই হাঁটতে হবে।

গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবিধানিক পরিভাষা ব্যবহার না করে উসকানিমূলক আন্তর্জাতিক শব্দচয়ন সামাজিক বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে। রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে পাহাড়ি অঞ্চল ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও প্রশাসনিক সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের মূল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের ভাষা ও ঐতিহ্য রক্ষায় গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও একক রাষ্ট্র। এখানে কোনো বিতর্ক বা আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত দেশের সর্বোচ্চ আইন—সংবিধান। রাজনৈতিক আবেগ বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর স্লোগান দিয়ে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পাহাড়ি-বাঙালি বিরোধের সুদীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তুলতে হবে। আমরা পাহাড়ের বাসিন্দা হই বা সমতলের, আমাদের সর্বপ্রধান পরিচয়—আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা সবাই বাংলাদেশি। এই চেতনাকে ধারণ করেই সকল জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার, মর্যাদা ও জাতীয় সংহতি সুনিশ্চিত করা সম্ভব।

No comments

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team