জুলাই অভ্যুত্থানের স্বতঃস্ফূর্ততা: জনগণের অংশগ্রহণই ছিল আসল শক্তি
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামোর কথা প্রাধান্য পায়। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই অভ্যুত্থানের অন্যতম গাঠনিক বৈশিষ্ট্য ছিল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন কীভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদানের মধ্য দিয়ে গণ-অভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয়—সেই প্রশ্নই তার আলোচনার কেন্দ্রে।
রাজনৈতিক সাহিত্যে ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’ নতুন কোনো ধারণা নয়। লেনিন পার্টির কেন্দ্রীভূত নেতৃত্বের ওপর জোর দিলেও রোজা লুক্সেমবার্গ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। অরাজপন্থীরা একে বিপ্লবের অপরিহার্য শর্ত বলে মনে করেন। তবে বাংলাদেশে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা কম এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়। নব্বই দশকের পর জাপাতিস্তা আন্দোলন, আরব বসন্ত বা অকুপাই ওয়াল স্ট্রিটের মতো ঘটনাগুলো দেখিয়েছে যে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কাঠামো ছাড়াই বড় আকারের আন্দোলন সম্ভব।
জুলাই অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততাকে তিনভাবে বোঝা যায়। প্রথমত, এটি প্রস্তুতিহীন বা আকস্মিক নয়। অনেক আন্দোলনকারী ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই, নো-ভ্যাট আন্দোলন, শাপলা চত্বর বা মোদি-বিরোধী আন্দোলনের অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছিলেন। তাদের অংশগ্রহণ ছিল পূর্ব অভিজ্ঞতা ও সম্পর্ক-জালের ফল।
দ্বিতীয়ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছিল অনুভূমিক। কেন্দ্রীয় কোনো কঠোর কাঠামো ছিল না। স্থানীয় পর্যায়েই কর্মসূচি নির্ধারিত হতো। অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়েও প্রান্তিক এলাকার অনেক আন্দোলনকারী কেন্দ্রীয় নেতাদের সম্পর্কে খুব কমই জানতেন। গ্রাফিতিতে নেতার ছবির পরিবর্তে শহীদ স্মরণ ও কর্মসূচি প্রাধান্য পেয়েছিল। অভ্যুত্থানের পরবর্তী কয়েক দিনের ‘রাষ্ট্রহীন’ অবস্থায় সহিংসতা মোকাবিলাও স্থানীয়ভাবেই সংগঠিত হয়েছিল।
তৃতীয়ত, সক্রিয় আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি নীরব দর্শকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। দোকানদার বিনামূল্যে পানি দিয়েছেন, রিকশাচালক বিনা ভাড়ায় যাত্রী নিয়ে গেছেন, বাড়ির ভেতর থেকে পানির বোতল বা টুথপেস্ট ছুড়ে দেওয়া হয়েছে কাঁদানে গ্যাসের প্রভাব কমাতে। এই পরোক্ষ অংশগ্রহণ ছাড়া আন্দোলন বৈপ্লবিক চেহারা পেত না।
সাম্প্রতিক বিশ্বের অনেক আন্দোলনেই একই ধরনের অনুভূমিক চরিত্র দেখা যায়। এর পেছনে কাজ করে রাজনৈতিক দলের প্রতি অনাস্থা এবং দমনমূলক শাসনে বড় সংগঠন গড়ে তোলার অসম্ভবতা।
নেতৃত্বের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু কেবল নেতা ও সংগঠনের গল্প দিয়ে গণ-অভ্যুত্থান বোঝা যায় না। বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় প্রায়শই নেতৃত্বের সিদ্ধান্তকেই কেন্দ্রে রাখা হয়। স্বতঃস্ফূর্ততার স্বীকৃতি না দিলে অভ্যুত্থানের আসল চরিত্র অধরা থেকে যায়। একই সঙ্গে এই স্বতঃস্ফূর্ততাই পরবর্তী সময়ে অর্জন ধরে রাখা ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনাকে কঠিন করে তোলে—এটি বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকেও স্পষ্ট।
জুলাই অভ্যুত্থানকে পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে হলে সক্রিয় আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণের ইতিহাসও তুলে আনতে হবে। সেই ‘নীরব দর্শকদের’ সক্রিয়তা এখনো অনেকটাই অনালোচিত রয়ে গেছে।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment