জুলাইকে ম্লান করছে কারা?
জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই আন্দোলনে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন, আবার অনেকে আজও সেই ঘটনার শারীরিক ও মানসিক ক্ষত বহন করছেন। এই অভ্যুত্থান কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল বৈষম্য, দমন-পীড়ন, দুর্নীতি, গুম, বিচারহীনতা এবং রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে এক গণজাগরণ। তাই জুলাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণ মানে শুধু একটি তারিখ স্মরণ করা নয়; এর পেছনের কারণ, প্রেক্ষাপট ও আত্মত্যাগকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, জুলাই মাসজুড়ে সেই স্মৃতিচর্চা কি আমরা যথেষ্ট দেখেছি?
যেসব রাজনৈতিক শক্তি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম সারির সমন্বয়কেরা জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের দাবিদার, তাদের কাছ থেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ছিল মাসব্যাপী স্মরণমূলক কর্মসূচি। প্রত্যাশা ছিল শহীদদের স্মরণসভা, আহতদের নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান, শহীদ পরিবারের সঙ্গে সংহতি, গণশুনানি, গবেষণা প্রকাশ, আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য জুলাইয়ের ইতিহাস তুলে ধরার উদ্যোগ।
কিন্তু জনপরিসরে যে চিত্র বেশি দৃশ্যমান হয়েছে, তা হলো রাজনৈতিক বক্তব্য, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কোথাও কোথাও পদযাত্রা বা সমাবেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করাই যেন মূল আলোচনায় পরিণত হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—জুলাইয়ের মূল চেতনা কি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার আড়ালে চাপা পড়ছে?
আরও একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। জুলাই অভ্যুত্থান কেন হয়েছিল? যে বৈষম্য, দুর্নীতি, গুম, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, সেই বাস্তবতাকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার জন্য কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
জুলাইজুড়ে কি আমরা এমন কোনো বড় প্রামাণ্যচিত্র উৎসব দেখেছি, যেখানে সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ, নিহত-আহতদের সাক্ষ্য বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের দলিল উপস্থাপন করা হয়েছে? পতিত সরকারের আমলে আলোচিত দুর্নীতি, গুম, নির্যাতন ও বিচারহীনতার নথিভিত্তিক প্রদর্শনী কি আয়োজন করা হয়েছে? জুলাইয়ের গ্রাফিতি, আলোকচিত্র, ভিডিও আর্কাইভ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার কিংবা তথ্যভিত্তিক ডকুমেন্টারি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক কোনো উদ্যোগ কি চোখে পড়েছে?
এসব উদ্যোগ থাকলে জুলাই শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে থাকত না; বরং একটি জীবন্ত জাতীয় স্মৃতিতে পরিণত হতো। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানতে পারত কেন মানুষ জীবন দিয়েছিল, কী ছিল সেই আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি এবং কোন বাস্তবতার বিরুদ্ধে সেই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল।
জুলাই স্মৃতিকে স্মরণের পরিবর্তে রাজনৈতিক সংঘাত কি ইচ্ছাকৃত। যদি একটি ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিচর্চার চেয়ে দলীয় রাজনীতি বেশি গুরুত্ব পায়, তাহলে সেই অভ্যুত্থানের মূল বার্তা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্ষতি তখনই হয়, যখন শহীদদের আত্মত্যাগ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছায়ায় ঢাকা পড়ে। একটি গণ-অভ্যুত্থান কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়; এটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতি। তাই জুলাইকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন গবেষণা, দলিল সংরক্ষণ, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ, গ্রাফিতি ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী, শহীদ ও আহতদের জীবনকাহিনি তুলে ধরা এবং সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চা।
আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আমরা কি জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করছি, নাকি শুধু জুলাইকে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করছি? যদি স্মৃতির চেয়ে স্লোগান, গবেষণার চেয়ে বক্তৃতা এবং শহীদদের চেয়ে দলীয় প্রতিযোগিতা বেশি গুরুত্ব পায়, তাহলে জুলাইকে ম্লান করে বলে প্রচারিত এমন ব্যক্তিরা বা দল। এটা কি আমাদের সম্মিলিত রাজনৈতিক ব্যর্থতা? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো ভিন্ন উদ্দেশ্য?
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment