পুলিশ ‘বাহিনী’ নয়, ‘সংস্থা’: ভাষার এই পরিবর্তন কি সময়ের দাবি?

0

Uploading: 2996837 of 2996837 bytes uploaded.

পুলিশ ‘বাহিনী’ নয়, ‘সংস্থা’: ভাষার এই পরিবর্তন কি সময়ের দাবি?


শব্দ শুধু ভাষার অলংকার নয়; রাষ্ট্রের দর্শনও প্রকাশ করে। একটি রাষ্ট্র তার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কী নামে ডাকে, সেটি সেই প্রতিষ্ঠানের চরিত্র, দায়িত্ব ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক সম্পর্কে একটি বার্তা দেয়। এ কারণেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ—বাংলাদেশ পুলিশকে আমরা কি "পুলিশ বাহিনী" বলব, নাকি "পুলিশ সংস্থা" বা "আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা" বলব?

ঐতিহাসিকভাবে "পুলিশ বাহিনী" শব্দটির উৎস ঔপনিবেশিক শাসন। ১৮৬১ সালের ব্রিটিশ Police Act-এ Police Force শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার এমন একটি পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তোলে, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উপনিবেশিক শাসন টিকিয়ে রাখা। সেই ব্যবস্থার ভাষাও ছিল কর্তৃত্বকেন্দ্রিক। "Force" শব্দটি তাই কেবল প্রশাসনিক পরিভাষা নয়; এটি একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বাস্তবতারও প্রতিফলন।

কিন্তু স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের ভূমিকা কি এখনও সেই একই? উত্তর হলো—না।

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পুলিশকে Civilian Law Enforcement Agency বা বেসামরিক আইন-প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। তাদের কাজ যুদ্ধ করা নয়; আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। তাদের প্রতিপক্ষ কোনো বিদেশি সেনাবাহিনী নয়; অপরাধ, বিশৃঙ্খলা ও আইনভঙ্গ। তাদের অস্ত্র আছে, কিন্তু সেই অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষমতা সংবিধান, আইন ও বিচারিক তদারকির অধীন। এই মৌলিক বৈশিষ্ট্যই পুলিশকে সামরিক বাহিনী থেকে পৃথক করে।

বিশ্বের অনেক দেশ এ বাস্তবতা ভাষায়ও প্রতিফলিত করেছে। যুক্তরাজ্যের রাজধানীর পুলিশ সংস্থার নাম Metropolitan Police Service। এখানে "Service" শব্দটি কেবল নামের পরিবর্তন নয়; এটি একটি নীতিগত ঘোষণা—পুলিশ জনগণের সেবক, শাসক নয়। কানাডা, নিউজিল্যান্ড এবং ইউরোপের বহু দেশে সরকারি নথিতে পুলিশের পরিচয় "Law Enforcement Agency" বা "Police Service" হিসেবে বেশি গুরুত্ব পায়। এমনকি যেখানে "Police Force" নামটি রয়ে গেছে, সেখানেও পুলিশকে সামরিক বাহিনীর সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় না; বরং একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাই বজায় থাকে।

বাংলাদেশেও বাস্তবতা একই। বাংলাদেশ পুলিশ সংবিধান অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীর অংশ নয়। সংবিধানে সশস্ত্র বাহিনী বলতে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে বোঝানো হয়েছে। পুলিশ একটি পৃথক বেসামরিক প্রতিষ্ঠান, যার দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ তদন্ত, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন করা। আন্তর্জাতিক সংস্থা, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন একাডেমিক গবেষণায়ও বাংলাদেশ পুলিশকে একটি civilian police organization হিসেবেই বর্ণনা করা হয়।

তাহলে প্রশ্ন আসে—"বাহিনী" শব্দটি ব্যবহার করলে আপত্তি কোথায়?

আইনগতভাবে "পুলিশ বাহিনী" ভুল নয়। কারণ ঐতিহাসিকভাবে Police Force থেকেই এর উৎপত্তি। কিন্তু ভাষা কেবল আইন অনুসরণ করে না; সময়ের সঙ্গে সমাজের ধারণাও প্রতিফলিত করে। "বাহিনী" শব্দটি বাংলা ভাষায় সাধারণ মানুষের মনে প্রথমেই সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনীর ধারণা তৈরি করে। এতে পুলিশের সেবামূলক পরিচয়ের চেয়ে বলপ্রয়োগকারী পরিচয় বেশি সামনে আসে। অন্যদিকে "সংস্থা" বা "আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা" শব্দটি প্রতিষ্ঠানের সাংবিধানিক অবস্থান, জবাবদিহি এবং নাগরিকসেবার চরিত্রকে আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।

এটি কেবল শব্দের বিতর্ক নয়; এটি রাষ্ট্রের দর্শনের প্রশ্ন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ জনগণের ওপর কর্তৃত্ব করার প্রতিষ্ঠান নয়, বরং জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি আইন-প্রয়োগকারী সংস্থা। বিশ্বের বহু দেশে কমিউনিটি পুলিশিং, মানবাধিকারভিত্তিক পুলিশিং এবং নাগরিককেন্দ্রিক সেবার ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে ভাষার এই পরিবর্তনও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাংলাদেশেও যদি আমরা একটি আধুনিক, পেশাদার, জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, তবে প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায় "পুলিশ সংস্থা" বা "আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা" শব্দ ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে ইতিহাস অস্বীকার করা হবে না; বরং ইতিহাসের উত্তরাধিকারকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে।

রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান বদলায় সংস্কারের মাধ্যমে, আর সংস্কারের সূচনা অনেক সময় ভাষা থেকেই হয়। "বাহিনী" থেকে "সংস্থা"—এই পরিবর্তন হয়তো ছোট একটি ভাষাগত পদক্ষেপ, কিন্তু এর মধ্যে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার সম্ভাবনা। 

তাই পুলিশ সংস্কারের প্রথম ধাপ শুরু হোক ‘পুলিশ সংস্থা’ নামকরণ দিয়েই। 

No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo