মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন: সমাজ কি চুপ থাকবে?

0


 মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন: সমাজ কি চুপ থাকবে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক ভয়াবহ চিত্র ভাইরাল হচ্ছে। কওমি মাদ্রাসার এক শিক্ষক ছোট ছোট শিশুদের বেধড়ক প্রহার করছেন—ভিডিওতে দেখা যায় নিরীহ শিশুদের কান্না, চিৎকার, আর নির্যাতনের দৃশ্য। আরেক জায়গায় শিক্ষক শিশুর মুখে বেত ঢুকিয়ে নির্যাতন করে নিজেই ভিডিও করে ফেসবুকে পোস্ট করেন, ক্যাপশনে লেখেন—‘পিচ্চি পোলাপানকে কান্না করাতে ভালোই লাগে’। নরসিংদীতে সাত বছরের শিশুকে গোসল করতে অনীহা প্রকাশের অজুহাতে এমন মারধর করা হয় যে শরীরে গভীর ক্ষত আর রক্তপাত হয়। পটুয়াখালী, কুষ্টিয়া, লক্ষ্মীপুর, সাভার—একের পর এক মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ উঠছে। শিক্ষকরা পালিয়ে যাচ্ছেন, শিশু নিখোঁজ হচ্ছে।

এসব চিত্র দেখেও সমাজ কি চুপ থাকবে?

ধর্মের নামে, শিক্ষার নামে এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে হাজার হাজার শিশু আশ্রয় নেয়। গরিব পরিবার তাদের সন্তানকে পাঠায় এই ভরসায় যে সেখানে ধর্মীয় শিক্ষা পাবে, খাবার-থাকার ব্যবস্থা হবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক জায়গায় সেই মাদ্রাসা পরিণত হয়েছে নির্যাতনের কেন্দ্রে। শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নিপীড়ন, এমনকি যৌন নির্যাতন—এসব এখন আর গোপন নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রমাণ করে দিচ্ছে কতটা ভয়াবহ পরিস্থিতি।

তবু সমাজ নীরব। কেউ বলে ‘সব মাদ্রাসা এক নয়’। কেউ বলে ‘এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা’। কেউ আবার সালিশের নামে মীমাংসা করে দায় এড়ায়। প্রশাসনও অনেক সময় ধীরগতির, মামলা হলেও আপস হয়ে যায়, অভিযুক্তরা ছাড়া পেয়ে যায়। ফলে নির্যাতনকারীরা সাহস পায় আরও। শিশুরা ভয় পেয়ে মুখ বন্ধ রাখে। পরিবারগুলো লজ্জায় বা চাপে নীরব থাকে।

এই নীরবতাই সবচেয়ে বড় অপরাধ। শিশু নির্যাতন কোনো ধর্মের অংশ নয়, কোনো শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ নয়। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। যে সমাজ শিশুর কান্না শুনেও চোখ বন্ধ করে রাখে, সে সমাজ নিজেই অসুস্থ। যে রাষ্ট্র শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, সে রাষ্ট্র ব্যর্থ।

এখন আর চুপ থাকার সময় নেই। মাদ্রাসাগুলোতে কঠোর মনিটরিং চাই। নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। শিশু সুরক্ষা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ চাই। ধর্মীয় নেতৃত্বকেও সোচ্চার হতে হবে—নির্যাতনকারীদের আড়াল না করে প্রকাশ্যে নিন্দা জানাতে হবে।

সোশ্যাল মিডিয়ার সেই রক্তাক্ত চিত্রগুলো শুধু ভিডিও নয়—এগুলো আমাদের সমাজের মুখোশ খুলে দিচ্ছে। এখন যদি আমরা চুপ থাকি, তাহলে আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা অপরাধী হিসেবেই চিহ্নিত হব। শিশুর নিরাপত্তা কোনো বিতর্কের বিষয় নয়। এটি মানবতার ন্যূনতম দাবি। সমাজ কি এবার জেগে উঠবে, নাকি আবার নীরবতায় ডুবে থাকবে?

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team