এনসিপির জনসভায় উস্কানিমূলক বক্তব্য: ইচ্ছা করেই সংঘাতের খোঁজ, নাকি চাপের রাজনীতি?
জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)—যে দলটি সেই অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতৃত্ব থেকে জন্ম নিয়েছে—এখন রাস্তায়। ‘জুলাই পদযাত্রা’, পথসভা, জনসভা—একের পর এক কর্মসূচি। আর সেই মঞ্চ থেকে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে কঠোর, উত্তেজক বক্তব্য। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগই যথেষ্ট নয়, তাঁকে গ্রেপ্তার করতে হবে। বিএনপি সরকার জুলাই সনদের গণরায়কে অস্বীকার করছে। সংস্কার ছাড়া নির্বাচন মানে শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি। এমন কথা শোনা যাচ্ছে প্রায় প্রতিটি সমাবেশে।
কেন এই ভাষা?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখলে চিত্রটা পরিষ্কার হয়। সাভারে এনসিপির সমাবেশস্থলে ককটেল বিস্ফোরণ। হবিগঞ্জে পদযাত্রার সময় নেতাদের গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ। জামালপুরে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে আগুন। কিশোরগঞ্জে হামলার শঙ্কা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন। এনসিপি নেতারা বলছেন, এসব আওয়ামী লীগের ধ্বংসাবশেষ কিংবা বিএনপির কর্মীদের কাজ। প্রশাসনকে দোষারোপ করছেন নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার জন্য। একদিকে আক্রমণের অভিযোগ, অন্যদিকে মঞ্চ থেকে পাল্টা হুঁশিয়ারি—‘সমুচিত জবাব দেওয়া হবে’।
এই পরিস্থিতিতে উস্কানিমূলক বক্তব্য শুধু আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়। এটি কৌশলও। এনসিপি জানে, তাদের শক্তি এখনো সীমিত। সংসদে কয়েকজন এমপি, রাস্তায় যুবশক্তি। পুরনো দলগুলোর মতো সংগঠিত মেশিনারি নেই। তাই তীব্র ভাষা ব্যবহার করে মনোযোগ আকর্ষণ, নিজেদের ভিত্তিকে একত্র করা এবং সরকারের ওপর চাপ তৈরি করাই তাদের মূল অস্ত্র। জুলাই চেতনার ‘রক্ষক’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চায় তারা। সংস্কার না হলে, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে ও কর্মসংস্থানের দাবি পূরণ না হলে—তারা রাস্তায় থাকবে, এমন বার্তা বারবার দেওয়া হচ্ছে।
তারা কি ইচ্ছা করেই সংঘাত চাইছে?
নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর উদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ উস্কানিমূলক বক্তব্য দেখে আপাতত তাই মনে হচ্ছে । ইচ্ছা করেই তারা সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ানোর মতো ভাষা ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন নজির নতুন নয়। শক্তিশালী হয়ে ওঠার জন্য অনেক দলই একসময় উত্তেজক স্লোগান ও হুমকির ভাষা ব্যবহার করেছে। এনসিপির ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, তারা একদিকে ‘নতুন রাজনীতি’ ও ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’-এর কথা বলছে, অন্যদিকে পুরনো ধারার রাজনীতির ভাষা ব্যবহার করছে। বিএনপির সমালোচনায় তারা যতটা কঠোর, নিজেদের কর্মসূচিতে হামলার অভিযোগ তুলেও ততটাই আক্রমণাত্মক।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে দুই ধরনের হিসাব কাজ করছে। এক, অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় যাওয়ার যে আশা তৈরি হয়েছিল, তার অপূর্ণতা নিয়ে হতাশা। দুই, রাজনৈতিক জায়গা দখলের প্রতিযোগিতা। বিএনপি ক্ষমতায়, জামায়াত এনসিপি বিরোধী দলে । এনসিপিকে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং ভোটারদের কাছে প্রাসঙ্গিক থাকতে হলে শক্ত অবস্থান দেখাতে হয়। নরম ভাষায় কথা বললে তারা হারিয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা হয়তো তাদের মধ্যে কাজ করছে।
তবে এই কৌশলের ঝুঁকিও আছে। উস্কানিমূলক বক্তব্য যখন রাস্তায় প্রতিফলিত হয়, তখন সহিংসতা বাড়তে পারে। সাভারের বিস্ফোরণ বা হবিগঞ্জের হামলার মতো ঘটনা যদি বারবার ঘটে, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আর তখন দায় শুধু এক পক্ষের ওপর চাপানো যাবে না।
এনসিপির জনসভার ভাষা তাই শুধু বক্তৃতা নয়—এটি এক ধরনের রাজনৈতিক সংকেত। তারা সংঘাত চায়, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হওয়ার মতো উপাদান তারা মঞ্চে তুলে ধরছে। জুলাইয়ের চেতনা যদি সত্যিই শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন ও সংস্কারের হয়, তাহলে সেই চেতনাকে উত্তেজনার ভাষায় আটকে রাখা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সে প্রশ্নটাও উঠছে।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment