সুহাস চাকমার বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভ: পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিরতার আড়ালে সত্য লুকিয়ে রাখার চেষ্টা

0


সুহাস চাকমার বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভ: পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিরতার আড়ালে সত্য লুকিয়ে রাখার চেষ্টা

সুহাস চাকমার সাম্প্রতিক ফেসবুক পোস্টটি পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতাকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করে উপস্থাপন করেছে। তিনি যে ‘ভ্রাতৃঘাতী হত্যাকাণ্ডের নীতি’ এবং ডিজিএফআই-সেনাবাহিনীর ষড়যন্ত্রের গল্প বুনেছেন, তা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একপেশে প্রচারেরই নতুন সংস্করণ মাত্র। এ ধরনের ন্যারেটিভ পার্বত্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে ব্যবহৃত হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সহিংসতার মূল উৎস হলো আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। ইউপিডিএফের বিভিন্ন উপদল এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে সংঘর্ষ নতুন কিছু নয়। একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, হত্যা, অপহরণ ও অস্ত্রের লড়াই নিয়মিত ঘটনা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও এ ধরনের সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটেছে, যেখানে এক গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে। সেনাবাহিনী বা ডিজিএফআইকে এসবের পেছনে দেখানো হলেও বাস্তবে এগুলো মূলত গোষ্ঠীগত সংঘাত।

সেনাবাহিনী ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পার্বত্য অঞ্চলে অভিযান চালায় সশস্ত্র তৎপরতা, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে। আইএসপিআরের বিবৃতিতে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, অভিযানের সময় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা গুলি চালালে সেনাবাহিনী আত্মরক্ষায় পাল্টা ব্যবস্থা নেয় এবং অস্ত্র উদ্ধার করে। এ ধরনের অভিযানের ফলে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। একে ‘ভ্রাতৃঘাতী হত্যাকাণ্ডের নীতি’ বলে চালিয়ে দেওয়া হলো বাস্তবতাকে উল্টে দেখানোর চেষ্টা।

ডিজিএফআইর নামে ভুয়া নথি বা পত্রকে কেন্দ্র করে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা যাচাইযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই উপস্থাপন করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার নামে এমন ভুয়া নথি যে কেউ কম্পিউটারে টাইপ করে প্রিন্ট করাতেই পারে। পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন গোষ্ঠীর নেতারা নিজেদের স্বার্থে এরকম নানা দলিল তৈরি বা প্রচার করে থাকেন। একজন নেতার অন্য গোষ্ঠীতে যোগ দেওয়া বা অভ্যন্তরীণ বিভেদকে রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র বলে চালিয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু তা সত্য প্রমাণ করে না। শ্যামল কান্তি চাকমা (তরু) নিজেই ডিজিএফআইয়ের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন। এ ধরনের অভ্যন্তরীণ ভাঙাগড়ার ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ বলে দেখানো হলো উদ্দেশ্যমূলক।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও উন্নয়নের স্বার্থে কাজ করে আসছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পর অঞ্চলটিতে উন্নয়নমূলক কার্যক্রম, পর্যটন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতাই স্থানীয় জনগণের জীবনকে অস্থির করে তোলে। সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনী যখন এসব তৎপরতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তখন তাকে ‘নিপীড়ন’ বলে প্রচার করা হয়। অথচ বাস্তবে এ ধরনের ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ত।

সুহাস চাকমার মতো ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে একতরফা অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেন। তাদের ন্যারেটিভে পার্বত্য অঞ্চলের জটিল বাস্তবতা, গোষ্ঠীগত সংঘাত এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তার প্রশ্ন প্রায় উপেক্ষিত থাকে। বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সকল সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অপ্রমাণিত অভিযোগ ও উসকানিমূলক প্রচার এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে মাত্র।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন বাস্তবসম্মত আলোচনা ও চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘাত বন্ধ এবং অস্ত্র নিষ্ক্রিয়করণই প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করে বিভ্রান্তি ছড়ানো কোনো সমাধান নয়—এটি শুধু অস্থিরতাকে উসকে দেয়।

No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo