রোহিঙ্গা ইস্যুতে আরাকান আর্মির অপরাধ আড়াল করছেন বিশ্লেষকরা? থমাস কেইন ও স্টিভ রসের বিতর্কিত অবস্থান

0

রোহিঙ্গা ইস্যুতে আরাকান আর্মির অপরাধ আড়াল করছেন বিশ্লেষকরা? থমাস কেইন ও স্টিভ রসের বিতর্কিত অবস্থান

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘নিরপেক্ষ নীতি বিশ্লেষক’ হিসেবে পরিচিত দুই ব্যক্তিত্বের বক্তব্য ও লেখালেখি নিয়ে এখন তুমুল বিতর্ক চলছে। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের (আইসিজি) সিনিয়র কনসালট্যান্ট থমাস কেইন এবং ওয়াশিংটন ডি.সি.-ভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো স্টিভ রস রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে যেভাবে আরাকান আর্মি (এএ)-কে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছেন, তা অনেককেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে আরাকান আর্মির অভিযোগিত গণহত্যা, যৌন সহিংসতা, গ্রাম পোড়ানো এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির মতো গুরুতর অপরাধের বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে তারা এই সশস্ত্র গোষ্ঠীকে রাখাইন রাজ্যে ‘বাস্তববাদী শক্তি’ এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ‘অপরিহার্য অংশীদার’ হিসেবে তুলে ধরছেন।

২০২২ সালে আইসিজিতে প্রকাশিত এক নীতিপত্রে থমাস কেইন স্পষ্টভাবে বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, বড় আকারের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব করতে হলে আরাকান আর্মির সাথে সম্পৃক্ত হওয়া জরুরি। তিনি আরাকান আর্মিকে ‘ডি-ফ্যাক্টো অথরিটি’ ও ‘প্রটো-স্টেট’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের সাথে অতীতের আচরণের তুলনায় তাদের অধীনে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারত।

অন্যদিকে স্টিভ রস তার বিভিন্ন বিশ্লেষণে সীমান্ত নিরাপত্তা ও প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রিত এলাকায় স্থিতিশীলতার কথা বললেও, এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দিয়েছেন।

মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা কিন্তু একেবারে ভিন্ন। ২০২৪ সালের ২ মে বুথিডংয়ের তানশোয়েখান গ্রামে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে প্রায় ৬০০ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুকে হত্যার অভিযোগ ওঠে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই (জানুয়ারি-জুন) আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে ৮৩ জন রোহিঙ্গাকে হত্যা, ১৮৭ জনকে আহত এবং শতাধিক বাড়িঘর-দোকান ধ্বংসের অভিযোগ উঠেছে।

এমনকি আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে মাদক পাচার, মানব পাচার এবং অপরাধমূলক অর্থায়নেরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। আইসিজির কিছু প্রতিবেদনেও এসব বিষয় স্বীকার করা হয়েছে। তবু থমাস কেইন ও স্টিভ রস আরাকান আর্মিকে ‘শাসনক্ষম শক্তি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পক্ষে তাদের যুক্তি উপস্থাপন করে চলেছেন।

সমালোচকরা বলছেন, এই ধরনের অবস্থান রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির দাবিকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকট শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা বা প্রত্যাবাসনের প্রশ্ন নয়— এটি মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। তাই প্রভাবশালী বিশ্লেষকদের প্রতিটি মন্তব্য ও সুপারিশকে আরও গভীরভাবে যাচাই করা সময়ের দাবি।

সূত্র: আইসিজি রিপোর্ট, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, স্টিমসন সেন্টার এবং সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের তথ্য।

No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo