পতিত শক্তির প্রত্যাবর্তন, নাকি নতুন কোনো খেলা? সাম্প্রতিক আইইডি উদ্ধারের ঘটনায় যেসব প্রশ্ন সামনে আসছে-

0

পতিত শক্তির প্রত্যাবর্তন, নাকি নতুন কোনো খেলা? সাম্প্রতিক আইইডি উদ্ধারের ঘটনায় যেসব প্রশ্ন সামনে আসছে-

৩০ জুলাই ২০২৬ সন্ধ্যা। আশুলিয়ার খেজুর বাগান এলাকার একটি ছোট মুদি দোকানে ত্রিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি এসে একটি কোমল পানীয় কেনেন। তিনি বড় অঙ্কের একটি নোট দেন। দোকানদার খুচরা আনতে ব্যস্ত হয়ে পড়লে লোকটি নিঃশব্দে সেখান থেকে চলে যায়। যাওয়ার আগে দোকানের সামনে একটি বেঞ্চে একটি ব্যাগ রেখে যায়।

কয়েক ঘণ্টা পর স্থানীয়দের সন্দেহ হলে ব্যাগটি খোলা হয়। ভেতরে পাওয়া যায় কালো টেপে মোড়ানো একটি প্রেসার কুকার, যার মধ্যে ছিল বিস্ফোরক পদার্থ ও অসংখ্য বেয়ারিং বল। এটি ছিল প্রাণঘাতী একটি ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (IED)। পরে পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেটি ধ্বংস করে।

এর ঘটনার ঠিক এক সপ্তাহ আগে, ২৪ জুলাই রাজধানীর মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে উদ্ধার করা হয় আরেকটি অত্যন্ত কৌশলী আইইডি। একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতরে লুকিয়ে রাখা ওই পাইপ বোমায় ছিল সালফার, বেয়ারিং বল, ব্যাটারি ও এমন একটি সার্কিট, যা ছাতা খোলার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারত। ঘটনাস্থলের পাশ দিয়েই সে সময় উল্টো রথযাত্রার শোভাযাত্রা অতিক্রম করছিল। বোমা নিষ্ক্রিয় করার সময় একজন পথচারী আহত হন।

মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে রাজধানী ও আশুলিয়ায় দুটি উন্নতমানের আইইডি উদ্ধার—দুটিই জনবহুল স্থানে, দুটিই অজ্ঞাত ব্যক্তির রেখে যাওয়া, এবং সৌভাগ্যক্রমে বিস্ফোরণের আগেই শনাক্ত হওয়া;  ঘটনাগুলো স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এই ঘটনাদুটোর সাথে মনে পড়ে যায়, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের সেই ভয়াবহ দিনটির স্মৃতি। সেদিন জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) মাত্র আধাঘণ্টার মধ্যে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬৩ জেলায় প্রায় ৫০০টি বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। আদালত, সরকারি স্থাপনা ও জনসমাগমস্থল ছিল হামলার লক্ষ্য। বিভিন্ন স্থানে ইসলামি শাসনব্যবস্থার দাবিতে লিফলেটও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রাণহানি তেমন না হলেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল সারাদেশে।

তবে ২০২৬ সালের এ ঘটনাগুলোর ধরন ভিন্ন।

২০০৫ সালের হামলা ছিল সমন্বিত, দেশব্যাপী এবং একটি পরিচিত জঙ্গি সংগঠন প্রকাশ্যে দায়ও স্বীকার করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক দুটি আইইডি পাওয়াকে বলা যায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তৈরি হলেও এগুলো কোনো সমন্বিত বিস্ফোরণ অভিযানের অংশ বলে এখন পর্যন্ত প্রতীয়মান হয়নি। কোনো সংগঠন দায়ও স্বীকার করেনি, কোথাও কোনো লিফলেট বা রাজনৈতিক বার্তাও পাওয়া যায়নি। তবে এভাবে বিস্ফোরক রেখে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কৌশল দেখে কয়েকটা প্রশ্ন মাথায় আসছে।  

শুরুতেই আসি সময়ের প্রেক্ষাপট নিয়ে- 

জাতীয় নির্বাচন শেষ হয়েছে। বিএনপি সরকার গঠন করেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই রাজধানী ও আশপাশে এ ধরনের বিস্ফোরক উদ্ধার হওয়া স্বাভাবিকভাবেই একাধিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এগুলো কি কেবল বিচ্ছিন্ন জঙ্গি তৎপরতার পুনরুত্থান? নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য?

প্রশ্ন উঠছে—ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ কি দেশে অস্থিরতার একটি চিত্র তুলে ধরতে চায়? তারা কি জনগণের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছে যে সরকার পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে? অথবা রাজনৈতিকভাবে নতুন সরকারকে চাপে ফেলতে কি কেউ পরিকল্পিতভাবে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে?

আবার অন্য দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রশ্ন রয়েছে। কোনো বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি বা সংগঠন কি নতুন সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরতে চায়? জনগণের মধ্যে সরকারের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করাই কি উদ্দেশ্য?

আরও একটি সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে কোনো বিদেশি শক্তি, আঞ্চলিক স্বার্থগোষ্ঠী বা প্রক্সি নেটওয়ার্ক কি সক্রিয় হয়ে উঠেছে?

প্রেসার কুকার বোমা কিংবা ছাতার ভেতরে লুকানো আইইডি তৈরি করা সাধারণ অপরাধীর কাজ নয়। এ ধরনের বিস্ফোরক তৈরিতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উপকরণ সংগ্রহের সক্ষমতা এবং পরিকল্পিত প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। জনবহুল বাণিজ্যিক এলাকা ও গণপরিবহন কেন্দ্রকে লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেওয়া থেকে বোঝা যায়, উদ্দেশ্য শুধু প্রাণহানি নয়; বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে দেখানোর জন্য সামনে নিয়ে আসা।

বিশেষ করে একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রার রাস্তার কাছাকাছি এমন বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করে।

বাংলাদেশ অতীতে বহুবার রাজনৈতিক সহিংসতা ও জঙ্গিবাদের নামে নানা হয়রানি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বর্তমান ঘটনাগুলো আকারে ছোট হলেও উদ্বেগের কারণ কম নয়। কারণ এগুলো পরিচিত কৌশল কিন্তু নতুন কিছুর ইঙ্গিত বহন করছে। যদি বিস্ফোরণ ঘটত, তাহলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেক বড় হতে পারত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্কতা ও সরকারের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে বিপর্যয় এড়ানো গেছে।

তবে বিস্ফোরকগুলো উদ্ধার হওয়াই শেষ কথা নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কারা এগুলো রেখেছিল, কেন রেখেছিল এবং তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? 

সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা। অন্যথায় পতিত শক্তি বা বিরোধী শক্তির উদ্দেশ্য সফল হবে, তারা জনমনে এমন ধারণা জন্ম নিতে পারে যে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আবারও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

যতক্ষণ পর্যন্ত দায়ীদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট না হচ্ছে, ততক্ষণ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে না—এটি কি নতুন কোনো জঙ্গি তৎপরতার সূচনা, নাকি নবগঠিত সরকারকে চাপে ফেলতে পরিকল্পিত রাজনৈতিক নাশকতার অংশ? নাকি পর্দার আড়ালে আরও জটিল কোনো খেলা ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে?


No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo