ভারত কি শেখ হাসিনাকে প্রেস কনফারেন্স করতে দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করল?
২০২৬ সালের ৫ আগস্ট। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী। বাংলাদেশের মানুষ যখন শহীদদের স্মরণ করছে, তখন নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ায় এক ভার্চুয়াল প্রেস কনফারেন্সে কথা বললেন শেখ হাসিনা। অডিও লিঙ্কের মাধ্যমে। ভিডিওতে দেখা যায়নি। এটা তার গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম সরাসরি মিডিয়া মতবিনিময়।
শেখ হাসিনা বললেন, ডিসেম্বরে তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। গ্রেপ্তার হোক, কারাগারে যাক, এমনকি মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হোক—ভয় পাচ্ছেন না। তিনি দাবি করলেন, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না, বরং ‘পরিকল্পিত শাসন পরিবর্তন’। আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ারও দাবি জানালেন। তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বললেন, ভারত তাকে ‘রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদা’ দিয়ে রেখেছে।
বাংলাদেশ সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল স্পষ্ট ও তীব্র। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে বলেছে—‘ঢাকা ক্ষুব্ধ’। তারা আগেই ভারতকে জানিয়েছিল যে এই অনুষ্ঠান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবু অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে শেখ হাসিনাকে ‘পলাতক দোষী সাব্যস্ত গণহত্যাকারী’ বলে উল্লেখ করা হয় এবং বলা হয়, ভারতীয় মাটিতে থেকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘বিষাক্ত আক্রমণ’ চালানো হয়েছে। এটাকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি অপমান বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা কি ‘নির্বাসিত নেতা’?
না। তিনি গণঅভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যাওয়া নেতা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তার ১৫ বছরের শাসনের পতন ঘটে। হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটে। জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের হিসাবে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হন।
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাকে অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ট্রাইব্যুনাল বলেছে, তিনি বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র, ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং গণহত্যা রোধে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সরকার বারবার ভারতের কাছে তাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। ভারত বলেছে, বিষয়টি পরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
শেখ হাসিনা নিজেকে ‘নির্বাসিত’ দাবি করলেও বাংলাদেশের আইনি বাস্তবতা ভিন্ন। তিনি আদালতের রায় এড়িয়ে পলাতক। আন্তর্জাতিক আইনেও একজন দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে অন্য দেশ থেকে রাজনৈতিক মঞ্চ দেওয়া স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ।
ভারত কি হস্তক্ষেপ করল?
ভারত সরকার বলেছে, অনুষ্ঠানটি বেসরকারি উদ্যোগে হয়েছে। সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই, কোনো মতামতকে সমর্থনও করে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো—শেখ হাসিনা দুই বছর ধরে ভারতে অবস্থান করছেন। নিরাপত্তা পাচ্ছেন। প্রেস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়েছে ভারতীয় ভূখণ্ডে। বাংলাদেশ আগেই আপত্তি জানিয়েছিল। তবু অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশ সরকার ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ’ হিসেবেই দেখছে। একজন দোষী সাব্যস্ত, পলাতক এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অন্য দেশের মাটিতে বসে বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ দেওয়া কূটনৈতিক সৌজন্যের সীমা অতিক্রম করে। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের বার্ষিকীতে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক পুনর্গঠনের যে প্রচেষ্টা চলছে, এই ঘটনা তাতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। বাংলাদেশ স্পষ্ট করেছে—সার্বভৌমত্ব, পারস্পরিক সম্মান এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা—এই ভিত্তিতেই সম্পর্ক এগোতে পারে।
শেখ হাসিনার প্রেস কনফারেন্স শুধু একজন পলাতক নেতার বক্তব্য নয়। এটি বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়া, গণঅভ্যুত্থানের স্বীকৃতি এবং প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। ভারত যদি সত্যিই ‘বেসরকারি অনুষ্ঠান’ বলে দায় এড়াতে চায়, তাহলে এমন অনুষ্ঠান অনুমোদন না দেওয়ার নৈতিক ও কূটনৈতিক দায়িত্বও তার ওপর বর্তায়।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment