এসএসসি'র রেজাল্ট একটি অধ্যায় মাত্র, পুরো জীবন নয়

0


 এসএসসি'র রেজাল্ট একটি অধ্যায় মাত্র, পুরো জীবন নয়

প্রতি বছর যখন এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়, তখন লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর মধ্যে অনেকেই এমন এক ফলাফল হাতে পান, যা তাদের নিজের কাছে, পরিবারের কাছে, প্রতিবেশীর কাছে যথেষ্ট মনে হয় না। কারও জিপিএ কাঙ্ক্ষিত মানের নিচে থাকে, কেউবা এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়। সেই মুহূর্তে মনে হয়, যেন গোটা জীবনের ভবিষ্যৎ একটি কাগজের টুকরোয় লেখা কয়েকটি সংখ্যার মধ্যে বন্দি হয়ে গেছে। বাড়িতে মন খারাপের ছায়া নামে, বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজনের প্রশ্ন এড়িয়ে চলতে ইচ্ছা করে, নিজেকে ব্যর্থ মনে হতে থাকে। অথচ ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, পরীক্ষার খাতায় ভালো ফল না করেও অসংখ্য মানুষ পরবর্তী জীবনে এমন উচ্চতায় পৌঁছেছেন, যা কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়।

বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথাই ধরা যাক। শৈশবে তিনি কলকাতার একাধিক স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু প্রথাগত শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনায় মন বসাতে পারেননি এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন সম্পূর্ণ করেননি। যে মানুষটি পরবর্তী জীবনে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জিতে সমগ্র এশিয়ার গর্ব হয়ে উঠলেন, তাঁর শুরুটা প্রচলিত অর্থে মোটেও মসৃণ ছিল না। বিদ্যালয়ের গণ্ডির মধ্যে যাকে মাপা যায়নি, তিনিই পরবর্তীতে বিশ্বকবি হয়ে উঠেছিলেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসেও এমন উদাহরণ আছে, যা সরাসরি একজন রাষ্ট্রপ্রধানের নিজের মুখে বলা। সাবেক রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ একাধিক অনুষ্ঠানে খোলাখুলি বলেছেন, ছাত্রজীবনে তিনি বহুবার পরীক্ষায় ফেল করেছেন, ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে যথাসময়ে ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেননি। কিন্তু তিনি এটাও গর্বের সঙ্গে বলেছেন যে, পাস করার জন্য কখনো নকলের মতো অসৎ পথ বেছে নেননি। যিনি একসময় বারবার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি, তিনিই পরবর্তীতে বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘতম মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এই গল্প শুধু ব্যর্থতার নয়, বরং সততা আর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সেই ব্যর্থতা পেরিয়ে যাওয়ার গল্প।

পশ্চিমা বিশ্বেও এই তালিকা দীর্ঘ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনকে নেতৃত্ব দেওয়া উইনস্টন চার্চিল ছাত্রজীবনে মোটেও উজ্জ্বল ছাত্র ছিলেন না। স্কুলে তাঁর ফলাফল ছিল হতাশাজনক, আর সামরিক প্রশিক্ষণ একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার প্রবেশিকা পরীক্ষায় তিনি একাধিকবার ব্যর্থ হয়েছিলেন। অথচ সেই মানুষটিই পরবর্তী জীবনে একটি জাতিকে যুদ্ধের ভয়াবহতম সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারও অর্জন করেছেন। উদ্ভাবক টমাস আলভা এডিসনের ছেলেবেলাও ছিল প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে বেমানান। তাঁর শিক্ষকরা তাঁকে পড়াশোনায় অমনোযোগী ও দুর্বল বলে মনে করতেন, স্কুলে তাঁর সময়টা ছিল সংক্ষিপ্ত ও কঠিন। অথচ পরবর্তী জীবনে হাজারের বেশি উদ্ভাবনের মাধ্যমে তিনি আধুনিক বিশ্বকে বদলে দিয়েছেন।

প্রযুক্তি জগতের দিকে তাকালেও একই চিত্র। মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও ডিগ্রি সম্পন্ন করার আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিলেন, কারণ তিনি নিজের একটি স্বপ্নকে তাড়া করতে চেয়েছিলেন। প্রথাগত সনদের পথ অনুসরণ না করেও তিনি আজ বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ও সফল ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, একটি নির্দিষ্ট রাস্তায় না হাঁটলেও সাফল্যের গন্তব্যে পৌঁছানো যায়।

এই সব উদাহরণ থেকে একটি বার্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরীক্ষার ফল একটি নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে, নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে একজন শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি মূল্যায়ন করে মাত্র। এটি কোনোভাবেই একজন মানুষের মেধা, সম্ভাবনা, চরিত্র বা ভবিষ্যতের সম্পূর্ণ পরিচয় বহন করে না। জীবনে সাফল্যের পথ অনেক, আর সেই পথের শুরুটা প্রত্যেকের জন্য একরকম হয় না। যে শিক্ষার্থী এবার প্রত্যাশিত ফল পায়নি, তার সামনে এখনও পুরো জীবন পড়ে আছে। দরকার শুধু হতাশায় থমকে না গিয়ে নিজের আগ্রহ, শক্তি আর অধ্যবসায়কে চেনার এবং সেই পথে এগিয়ে যাওয়ার সাহস। একটি পরীক্ষার ফল দিয়ে কারও গোটা জীবনের মূল্য নির্ধারিত হয় না, বরং জীবন নিজেই বহু পরীক্ষার সমষ্টি, আর প্রকৃত পরীক্ষা হলো হতাশার মুখে দাঁড়িয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। 

ফলে তোমরা যারা পরীক্ষায় একটু কম ভালো রেজাল্ট করেছো, বা অনেকেই এবার কৃতকার্য হতে পারো নি, তার মানে এই নয় যে আগামী তুমি পারবে না। 

প্রতিজ্ঞা কর, আগামীতে তুমিই হবে বোর্ডের সেরা স্টৃুডেন্ট। স্কুলের সেরা ছাত্র বা ছাত্রী। 

No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo