‘আদিবাসী’ স্লোগানের আড়ালে কী আছে?

0

 ‘আদিবাসী’ স্লোগানের আড়ালে কী আছে?

পার্বত্য চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাস, পরিচয় ও সংবিধানের প্রশ্নে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে ‘উপজাতি’ ও ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তা কেবল ভাষাগত নয়—এটি রাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক আইন ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গেও জড়িত।

১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তিতে ধারাবাহিকভাবে ‘উপজাতি’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর ২৩ক অনুচ্ছেদেও রাষ্ট্রকে উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও নৃতাত্ত্বিক সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখানে ‘আদিবাসী’ শব্দটি নেই। সংবিধানের ৬ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিককে বাংলাদেশি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে এবং ২৮ অনুচ্ছেদে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় পরিভাষায় তাই ‘উপজাতি’ ও ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ই স্বীকৃত।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘Indigenous Peoples’ বলতে সাধারণত কোনো অঞ্চলের ঐতিহাসিক আদি অধিবাসীদের বোঝায়, যাদের উৎপত্তির স্পষ্ট ইতিহাস নেই। নৃতত্ত্ববিদ লুইস হেনরি মর্গান তাদের ‘ভূমিপুত্র’ বলেছেন। অক্সফোর্ড অভিধানেও Indigenous বলতে ‘original inhabitants’ বোঝানো হয়েছে। অন্যদিকে ILO কনভেনশন ১৬৯ অনুযায়ী উপজাতি হলো সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে পৃথক জনগোষ্ঠী, যাদের জীবন নিজস্ব প্রথা দ্বারা পরিচালিত। বাংলাদেশ এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি এবং UNDRIP-এর ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সংবিধানই সর্বোচ্চ।

ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান জনগোষ্ঠীগুলো এ অঞ্চলের আদি অধিবাসী নয়। চাকমারা মধ্য মায়ানমারের আরাকান থেকে এসেছে। তাদের রাজবংশের ইতিহাস অনুযায়ী ১৩৩৩ খ্রিষ্টাব্দের পর তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে। ত্রিপুরারা মূলত ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য ও আসাম থেকে এসেছে। মারমারা বার্মার পেগু ও আরাকান থেকে ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীতে আসে। খুমি, চাক, পাঙ্খো, বম, খিয়াং ও তঞ্চঙ্গ্যারাও আরাকান, চীন হিলস বা মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কয়েকশ বছর আগে অভিবাসিত। ব্রিটিশ রেকর্ড, বেঙ্গল গেজেটিয়ার ও ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম ম্যানুয়ালে তাদের ‘ইমিগ্র্যান্ট ট্রাইবস’ বা অভিবাসী উপজাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অঞ্চলের প্রাচীন অধিবাসী ছিলেন আর্য-মঙ্গোল সংকর বাঙালি জনগোষ্ঠী।

২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এ দেশে কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী নেই। ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবির পেছনে আন্তর্জাতিক লবির প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। এ স্বীকৃতি পেলে ভূমি ও খনিজ সম্পদের ওপর বিশেষ অধিকার দাবির সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা সংবিধান ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

পরিচয় বিতর্কের বাইরে বাস্তবতা হলো—রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু ‘আদিবাসী’ স্লোগানকে দেশের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ব্যবহারের চেষ্টা ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মনে করা হয়। সংবিধান ও শান্তিচুক্তির ভাষাকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়।


No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo