জেএসএস-ইউপিডিএফ কোন্দলে জিম্মি পাহাড়ের মানুষ

0

জেএসএস-ইউপিডিএফ কোন্দলে জিম্মি পাহাড়ের মানুষ

পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড় এখন আর শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতীক নয়। এখানে জেএসএস ও ইউপিডিএফের দীর্ঘদিনের আধিপত্যের লড়াইয়ে সাধারণ পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠী জিম্মি হয়ে পড়েছে। দুই সংগঠনের মধ্যে চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলা দ্বন্দ্বের খেসারত দিতে হচ্ছে নিরীহ মানুষকে। সরকার ও সেনাবাহিনী যখন শান্তি ও নিরাপত্তা ফেরাতে নানা উদ্যোগ নেয়, তখনই সেই উদ্যোগগুলোর সমালোচনা করে সংগঠন দুটি। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

প্রায় দুই দশক ধরে তিন পার্বত্য জেলা থেকে কাঠ কিনে ব্যবসা করা এক বাঙালি ব্যবসায়ীর অভিজ্ঞতায় এই বাস্তবতা স্পষ্ট। তিনি বলেন, এখানে ব্যবসা করতে হলে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। প্রতি সিএফটি কাঠের জন্য জেএসএসকে ৬০ টাকা আর ইউপিডিএফকে ৫৫ টাকা দিতে হয়। গরুপ্রতি চাঁদা ওঠে সাতশ’ থেকে হাজার টাকা। এভাবে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার চাঁদা তোলা হয়। অর্থ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশের বাইরে চলে যায় এবং তার অংশবিশেষ দিয়ে ভারত ও মিয়ানমার থেকে অস্ত্র কেনা হয়। এই চাঁদাবাজির নেটওয়ার্কের শিকার হন ব্যবসায়ী, কৃষক, পরিবহনচালকসহ সাধারণ মানুষ। চাঁদা না দিলে হুমকি, অপহরণ এমনকি প্রাণনাশের ঝুঁকি থাকে।

গতএসএস ও ইউপিডিএফের মধ্যকার এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ বাসিন্দারা। গত ছয় মাসে ১৬টি হত্যাকাণ্ড ও ১ হাজার ৫২০টি চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ। ১৯৯৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ২৮৭ জন ইউপিডিএফ সদস্য জেএসএসের হামলায় নিহত হয়েছেন বলে সংগঠনটির হিসাব। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও দুই পক্ষের সংঘর্ষে কমপক্ষে ৩৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই দ্বন্দ্বের আগুনে পুড়ছে নিরীহ মানুষের জীবন।

সেনাবাহিনীসহ নিরাপত্তা বাহিনীগুলো যখন অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও শান্তি রক্ষার অভিযান চালায়, তখন সংগঠন দুটি সেগুলোর সমালোচনা করে। অভিযানগুলোকে ‘দমন’ বা ‘অধিকার হরণ’ বলে চিত্রিত করা হয়। অথচ সেনাবাহিনীর ২৭১ জন সদস্য ইতোমধ্যে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। সহস্রাধিক আহত হয়েছেন। সরকারের উদ্যোগগুলোও একইভাবে সমালোচিত হয়। ফলে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

ভূমি মালিকানার অমীমাংসিত জটিলতা এই কোন্দলকে আরও তীব্র করেছে। ঐতিহাসিক সনাতন আইন ও আধুনিক আইনের বিরোধ, পাহাড়ি-বাঙালি আস্থার সঙ্কট প্রায়ই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নেয়। বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ব্যবসায়ী ও কৃষকরা বিশেষভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও উন্নয়ন কার্যক্রমে তাদের স্বার্থ উপেক্ষিত থাকার অভিযোগও রয়েছে।

ইউপিডিএফের উত্থানও এই অস্থিরতার সঙ্গে জড়িত। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে সশস্ত্র পথ বেছে নেয় তারা। চাঁদাবাজির বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। অপহরণ, সেনা কর্মকর্তা হত্যাসহ ধারাবাহিক সহিংসতায় অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের প্রাণ গেছে। ভারতের মিজোরাম সীমান্ত থেকে অস্ত্র ও লজিস্টিক সাপোর্ট পাওয়ার প্রমাণও উঠে এসেছে।

এই পরিস্থিতিতে সরকার ও সেনাবাহিনীর উদ্যোগগুলো যখন সমালোচিত হয়, তখন সাধারণ মানুষ আরও বেশি অসহায় হয়ে পড়ে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ এবং জনসংখ্যা-সাম্যের ভিত্তিতে উন্নয়ন বরাদ্দ ছাড়া শান্তি ফেরানো সম্ভব নয়। মিয়ানমার সীমান্তের অস্থিরতাও সমীকরণকে জটিল করে তুলছে।

পাহাড়ের সাধারণ মানুষ এখন জেএসএস-ইউপিডিএফ কোন্দলের জিম্মি। সরকার ও সেনাবাহিনীর উদ্যোগগুলো যতদিন সমালোচনার বেড়াজালে আটকে থাকবে, ততদিন এই রক্তাক্ত অধ্যায়ের অবসান ঘটবে না।

No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo