মোদি কেন জাতিসংঘে অনুপস্থিত থাকেন?
নিজ দেশে একের পর এক জনসভা, বিশাল র্যালি আর ক্যামেরাঘেরা মেগা ইভেন্টে নরেন্দ্র মোদির জুড়ি মেলা ভার। অনুগত সংবাদমাধ্যম আর দলীয় সমর্থকদের কাছে তিনি 'বিশ্বগুরু'। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, বিশ্বের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক মঞ্চ—জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (UNGA) মূল অধিবেশনে যখন বিশ্বনেতারা মুখোমুখি হন, মুখোমুখি হয় বৈশ্বিক বিতর্ক, তীব্র কূটনৈতিক প্রশ্নবাণ আর সংবাদমাধ্যমের উন্মুক্ত মুখোমুখি জবাবদিহিতা—তখনই নিজদেশে 'বিশ্বগুরু' খ্যাত মোদিকে দেখা যায় সবচেয়ে দূরত্ব বজায় রাখতে।
কিন্তু কেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের মতো প্ল্যাটফর্মকে এত কৌশলে এড়িয়ে যান বা কেবল প্রথাগত ভিডিও বার্তা/প্রতিনিধি পাঠাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন? এর কয়েকটি কারণ রয়েছে-
টেলিপ্রম্পটার ছাড়া স্ক্রিপ্টহীন সাংবাদিকতার ভয়: মোদির রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো খোলামেলা বা আনস্ক্রিপ্টড প্রশ্নোত্তরের মুখোমুখি না হওয়া। এছাড়াও তিনি ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন না। তাই আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় টেলিপ্রম্পটার ছাড়া কোনো প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে পারেন না। দিল্লিতে হোক কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে—লাইভ প্রেস কনফারেন্সে সাংবাদিকদের তীক্ষ্ণ প্রশ্নের উত্তর তিনি দেন না। কিন্তু জাতিসংঘ চত্বরে বিশ্ব গণমাধ্যমের স্বাধীন প্রশ্নবাণ ও মানবাধিকার, সংখ্যালঘু অধিকার বা কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে সোজাসুজি প্রশ্নের উত্তর এড়ানোর সুযোগ থাকে না।
বিশ্বমঞ্চে গৃহপালিত মিডিয়ার অভাব: ভারতে মূলধারার বড় একটি গণমাধ্যম যেখানে দিনরাত প্রশংসাগীতি গাইতে ব্যস্ত, জাতিসংঘের নিউ ইয়র্ক সদর দপ্তরে সেই 'সুবিধা' পাওয়ার সুযোগ নেই। সেখানে সাংবাদিকরা চাটুকারিতার বদলে প্রশ্ন করেন বাস্তব সমস্যা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, পরিবেশ নীতি ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে। ফলে ক্যামেরার সামনে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ার ঝুঁকি তিনি নিতে চান না।
‘বিশ্বগুরু’ ভাবমূর্তির বেলুন ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা: নিজ দেশে প্রচার চালানো হয় যে পুরো বিশ্ব নাকি মোদির নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক ফোরামে কোনো ব্যক্তির একক কোনো কর্তৃত্ব থাকে না—সেখানে অন্যান্য বিশ্বনেতাদের মতোই তিনিও সমমর্যাদার একজন রাষ্ট্রপ্রধান মাত্র। বিশ্বনেতাদের নিরপেক্ষ বা শীতল আচরণ দেশের তৈরি করা কৃত্রিম 'মহাপুরুষ' ইমেজকে এক লহমায় গুঁড়িয়ে দিতে পারে।
প্রশ্নের মুখে ভারতের মানবাধিকার ও নীতি: জাতিসংঘের বহু মানবাধিকার পরিষদ ও আন্তর্জাতিক নজরদারি সংস্থাগুলোতে বারবার ভারতের অভ্যন্তরীণ সংখ্যালঘুদের অবস্থা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকোচন এবং ভিন্নমত দমনের অভিযোগ উঠেছে। জাতিসংঘের মূল অধিবেশনে উপস্থিত হওয়া মানেই এসব অস্বস্তিকর বৈশ্বিক প্রশ্নের মুখে পড়া।
মূলত বিশ্বমঞ্চের আসল চ্যালেঞ্জ, জবাবদিহিতা ও উন্মুক্ত বিতর্ক মোকাবেলা করার মতো সাহসের অভাব ঢাকতেই মোদির এই 'কূটনৈতিক অনুপস্থিতি'। নিজের তৈরি করা ঘরোয়া ইমেজের দুর্গ নিরাপদ রাখতেই আন্তর্জাতিক সব বড় বিতর্ক থেকে দূরত্ব বজায় রেখে 'বিশ্বগুরু' সাজাই যেন তাঁর সবচেয়ে বড় স্ট্র্যাটেজি।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment