সরকারকে দোষারোপের সংস্কৃতি: রাজনৈতিক বয়ান, আবেগের রাজনীতি নাকি ন্যারেটিভ কৌশল?

0

 সরকারকে দোষারোপের সংস্কৃতি: রাজনৈতিক বয়ান, আবেগের রাজনীতি নাকি ন্যারেটিভ কৌশল?  

ঘটনা ঘটলেই সরকারকে দোষারোপ করার যে সহজ অভ্যাস গড়ে উঠেছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনা সেই প্রবণতার একটি তাজা উদাহরণ। রাতে একটি আবাসন প্রকল্পে হামলা হয়েছে, ক্ষতি হয়েছে, একজন জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন—এসব অস্বীকার করার কিছু নেই। কিন্তু ঘটনার পরপরই লাইভে এসে পুরো রাষ্ট্র ও একটি রাজনৈতিক দলকে চাঁদাবাজ আখ্যা দেওয়া এবং তাকেই মূল বয়ান বানিয়ে তোলা ন্যায়বিচার নয়, আবেগের রাজনীতি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সালমান মুক্তাদিরকে ভিকটিম বলেই স্বীকার করেছেন। ক্ষতি দেখা গেছে, প্রাথমিক তদন্ত হয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু তিনি একইসঙ্গে বলেছেন, সালমান নিজেই স্বীকার করেছেন তাঁর কাছে কেউ সরাসরি চাঁদা চায়নি। চাইলে তিনি দিতেনও। তারপরও বিএনপিকে ‘চাঁদাবাজ দল’ বলে ঢালাও অভিযোগ করা হয়েছে। এটা নির্দিষ্ট অভিযোগ নয়, রাজনৈতিক স্লোগান। যেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি চিহ্নিত নয়, সেখানে একটি দলকে সমূলে দায়ী করা তদন্তকে সাহায্য করে না, বরং জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ায়।

পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অন্য ছবি দেখায়। ইসিবি চত্বরের মানিকদী নামাপাড়ায় প্রায় ৩৫ কাঠা জমি নিয়ে নিউ গিনি প্রপার্টিজ এবং অবসরপ্রাপ্ত এক সিনিয়র সেনা কর্মকর্তার পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের দখল-বেদখলের বিরোধ চলছিল। রাতে দখল নিতে যাওয়া একটি দল স্থাপনা ভাঙচুর করে। সালমানের স্টুডিও সেই স্থাপনার ভিতরে ছিল। অর্থাৎ স্টুডিও মূল টার্গেট নাও হতে পারে। এটা চাঁদাবাজির নাটক নয়, পুরনো জমি বিরোধের রাতের অভিযান—যা বাংলাদেশে নতুন নয়। পুরনো সরকারের আমলেও এমন ঘটনা ঘটেছে। পার্থক্য এই যে, এখন পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছে, আটক করেছে, মামলা হয়েছে।

গ্রেপ্তারের তালিকাও নীরবতা ভাঙে। মূল পরিকল্পনাকারীসহ কয়েকজন আটক। তাদের মধ্যে সাবেক যুবলীগ নেতাও রয়েছেন, যাঁর নাম মিরপুরের পুরনো সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে ডিবি দাবি করেছে। অর্থাৎ যে বয়ান বলছে ‘ক্ষমতাসীন দলের লোক হামলা করেছে’, সেই বয়ানের সঙ্গে মাঠের তথ্য মিলছে না। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই রাষ্ট্রকে দোষী সাব্যস্ত করা মানে প্রমাণের আগে রায় দেওয়া।

সরকারের কাজ দুটো। এক, ভুক্তভোগীর ক্ষতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দুই, অপরাধীকে পরিচয় নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনা। সেই কাজ শুরু হয়েছে। নাগরিকের কাজ হলো ঘটনাকে ঘটনা হিসেবে দেখা—জমি বিরোধ, স্থানীয় প্রভাব, অস্ত্রধারী দল—এগুলোকে স্বীকার করা। প্রতিটি সহিংসতাকে সঙ্গে সঙ্গে সরকারি চক্রান্ত বানিয়ে ফেললে আসল অপরাধী রক্ষা পায়, তদন্ত দুর্বল হয়, আর জনগণ শুধু ক্ষোভের নাটক দেখে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হলে দোষারোপের এই স্বয়ংক্রিয় বোতাম বন্ধ করতে হবে। নইলে প্রতিটি রাতের হামলাই রাজনৈতিক যুদ্ধে পরিণত হবে, ন্যায়বিচার নয়।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team