জিয়া পরিবারের তৃতীয় অধ্যায়: জাতিসংঘ মঞ্চে তারেক রহমান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেবেন। এতে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে তিনি জাতিসংঘের কেন্দ্রীয় মঞ্চে দাঁড়াবেন। এটা শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ নয়। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এক কূটনৈতিক ধারাবাহিকতার নতুন পর্বও বটে।
আজ সকালে তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিনিধিদল তাঁর সঙ্গে রয়েছেন। সফর সংক্ষিপ্ত। ২৫ সেপ্টেম্বর রাতেই তিনি ঢাকার পথে ফিরবেন।
জিয়া পরিবারের জাতিসংঘ উপস্থিতির সূচনা হয় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে। ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট তিনি সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দেন। তখন বাংলাদেশ সদ্য স্বাধীন একটি দরিদ্র দেশ। জিয়া সেদিন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈষম্য, দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও অস্ত্র প্রতিযোগিতার প্রশ্ন তোলেন। ব্রান্ট কমিশনের সুপারিশ তুলে ধরে তিনি বলেন, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি থাকলেও দরিদ্র দেশগুলো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি থেকে পিছিয়ে থাকছে। শান্তি, ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে আরও ন্যায়সংগত বিশ্বব্যবস্থার দাবি ছিল সেই ভাষণের মূল সুর। জাতিসংঘের সরকারি নথিতে সেই বক্তব্য সংরক্ষিত আছে।
১৩ বছর পর, ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ৪৮তম অধিবেশনে ভাষণ দেন। তিনি বাংলায় কথা বলেন। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন। এরপরও তিনি একাধিকবার জাতিসংঘ মঞ্চে ফিরে আসেন—১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে, ২০০২ সালে শিশুবিষয়ক বিশেষ অধিবেশনে এবং ২০০৫ সালে ৬০তম অধিবেশনের বিভিন্ন কার্যক্রমে। জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন পর্বে তাঁর বক্তব্যের একাধিক রেকর্ড রয়েছে।
এই দুই প্রজন্মের পর এবার মঞ্চে তারেক রহমান। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর ভাষণে জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষ গুরুত্ব পাবে। বাংলাদেশের ঝুঁকি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জলবায়ু অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরা হবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, বক্তব্যে থাকবে গণতান্ত্রিক রূপান্তর, উন্নয়নের অগ্রাধিকার, বৈশ্বিক শান্তি এবং আন্তর্জাতিক সংকটের টেকসই সমাধান। দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং রোহিঙ্গা সংকটও এবারের অগ্রাধিকারের তালিকায় আছে।
জিয়াউর রহমান যেখানে বৈশ্বিক বৈষম্য ও উন্নয়ন আলোচনা করেছিলেন, খালেদা জিয়া যেখানে গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থ তুলে ধরেছিলেন, তারেক রহমান সেই ধারাকে জলবায়ু ও রোহিঙ্গা ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত করতে যাচ্ছেন। সময় বদলেছে। ইস্যুও বদলেছে। কিন্তু মঞ্চ একই।
এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এখন ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি। তিনি দ্বিতীয় বাংলাদেশি, যিনি এই পদে আছেন। অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘Restoring trust, managing transformation: A United Nations that delivers for all’। সাধারণ বিতর্ক ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে; ২৮ সেপ্টেম্বরও কার্যক্রম থাকবে। একই সময়ে একজন বাংলাদেশি সভাপতির অধীনে আরেকজন বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ—এটা কূটনৈতিকভাবে বিরল মুহূর্ত।
১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে বৈষম্যের কথা বলেছিলেন, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়া যে মঞ্চে বারবার ফিরেছিলেন, ২০২৬ সালে সেই মঞ্চে তারেক রহমান প্রথমবার দাঁড়াবেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। পরিবারের ধারাবাহিকতা এখানে প্রতীকী। কিন্তু আসল পরীক্ষা ভাষণের বিষয়বস্তুতে। জলবায়ু অর্থায়ন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন এবং ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর বয়ান তিনি কতটা স্পষ্ট ও কার্যকরভাবে তুলতে পারেন, সেটাই নির্ধারণ করবে এই ভাষণ শুধু পারিবারিক ইতিহাসের নতুন অধ্যায় হবে, নাকি কূটনৈতিক ফলও দেবে।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment