আইনের রক্ষক যখন নিজেই ভক্ষক: রাকসু নেতা সালাউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে রেল স্টেশনে তাণ্ডব

বেলচা বিতর্কের পর রাকসু নেতা সালাউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে রেল স্টেশনে তাণ্ডব

শিক্ষার্থী লাঞ্ছনার জেরে বিচার চাওয়া বা প্রতিবাদ করা যেকোনো সচেতন নাগরিক ও ছাত্রনেতার নৈতিক অধিকার। কিন্তু সেই অধিকার আদায়ের নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদে আগুন দেওয়া, রেল স্টেশন ভাঙচুর করা এবং জনভোগান্তি তৈরি করা কোনো দায়িত্বশীল ছাত্রনেতার কাজ হতে পারে না। সম্প্রতি রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে রাকসু আন্দোলনকারী নেতা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে ঘটে যাওয়া তাণ্ডব আইনকানুন ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিয়ে এক মারাত্মক প্রশ্ন তুলে ধরেছে।

আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা এবং একজন ছাত্রনেতার এমন বেপরোয়া ভূমিকায় কয়েকটি বিষয় খেয়াল করুন-  

১. আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে মব জাস্টিস: একজন শিক্ষার্থী মারধরের শিকার হওয়ার পর যেখানে পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি জমা দেওয়া বা গণতান্ত্রিক উপায়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালনের আইনি সুযোগ ছিল—সেখানে সালাউদ্দিন আম্মার উসকানিমূলকভাবে শিক্ষার্থীদের জড়ো করে নৈরাজ্যের পথ বেছে নিয়েছেন। আইন হাতে তুলে নেওয়ার এই 'মব মেন্টালিটি' বা মব জাস্টিস কি কোনো হবু ছাত্রনেতার আদর্শ হতে পারে?

২. রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতিসাধন ও জনভোগান্তি: স্টেশনের সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর, হেল্প ডেস্ক ও কাউন্টারে তাণ্ডব এবং রেললাইনে আগুন দেওয়ার কারণে স্থবির হয়ে পড়েছিল উত্তরবঙ্গের সাথে সারাদেশের ট্রেন যোগাযোগ। ধূমকেতু এক্সপ্রেসসহ কয়েকটি ট্রেনের শত শত সাধারণ যাত্রী, নারী ও শিশুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা চরম আতঙ্কের মধ্য দিয়ে সময় কাটিয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় তৈরি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ধ্বংস করে সালাউদ্দিন আম্মার কিসের 'অধিকার আন্দোলন' প্রমাণ করতে চাইলেন?

৩. 'আইন মানি না' মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ: আইন ও বিচার সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। কিন্তু সালাউদ্দিন আম্মার নিজেকে আইনের চেয়ে বড় মনে করছেন কি না—এই প্রশ্ন এখন সুশীল সমাজের। যদি একজন সাধারণ নাগরিক সরকারি দফতর বা রেল স্টেশনে এমন ভাঙচুর চালাতেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ফৌজদারি মামলা হতো। তাহলে ছাত্রনেতা পরিচয়ের দোহাই দিয়ে প্রকাশ্যে নেতৃত্ব দিয়েও তিনি কীভাবে আইনের আওতার বাইরে থাকেন?

৪. সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের অপচেষ্টা: নিজের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রভাব জাহির করতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ইমোশনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ নতুন নয়। আনসার ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর রাগ মেটাতে গিয়ে পুরো রেল স্টেশন ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার এই ঘটনা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

প্রতিবাদ অবশ্যই হবে, তবে তা হতে হবে আইনের সীমারেখা ও শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে। ছাত্রনেতা হওয়ার প্রথম শর্তই হলো আইন ও শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। নিজের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সুবিধা হাসিল করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসকারী এই তাণ্ডবের জন্য সালাউদ্দিন আম্মার ও তাঁর সহযোগীদের অবশ্যই আইনের মুখোমুখি করা উচিত।

মামুর বেটির মহাজাগতিক গবেষণা: "তারেক রহমান নিউইয়র্কের বাইরে যাবেন কেন?"

 মামুর বেটির মহাজাগতিক গবেষণা: "তারেক রহমান নিউইয়র্কের বাইরে যাবেন কেন?"

আওয়ামী লীগ সমর্থিত 'মহাগবেষক' ও প্রেস-প্যাডের বুদ্ধিজীবীরা সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সম্মেলন (UNGA) নিয়েও এক অলৌকিক তত্ত্ব আবিষ্কার করে বসেছেন! আমাদের শ্রদ্ধেয় নবনীতা চৌধুরী দারুণ এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন—"তারেক রহমান নিউইয়র্কের বাইরে যেতে পারছেন না কেন?"

আহারে! উনাদের চিন্তাভাবনার গভীরতা দেখে বিজ্ঞানী আইনস্টাইনও আজ কবরে শুয়ে নতুন করে থিওরি অব রিলেটিভিটি লিখতেন!

১. জাতিসংঘ কি ওয়াশিংটন ডিসিতে নাকি নিউ ইয়র্কে? উনাদের হয়তো কেউ বুঝিয়ে বলেনি যে, জাতিসংঘের সদর দপ্তর বিশ্ব মানচিত্রে নিউ ইয়র্ক শহরেই অবস্থিত! প্রধানমন্ত্রী কি জাতিসংঘের ভাষণে যোগ দিতে নিউ ইয়র্ক ছেড়ে টেক্সাসে গিয়ে বারবিকিউ পার্টি করবেন, নাকি ওয়াশিংটন ডিসির মলে শপিং করতে যাবেন? কাজের মূল কেন্দ্র ছেড়ে কি উনি অহেতুক রোড ট্রিপে বের হবেন?

২. ‘পলায়নপর’ মানসিকতার আয়না: যাঁরা শেখ হাসিনার চীন সফর সংক্ষিপ্ত করে মাঝপথ থেকে তড়িঘড়ি 'দিল্লি পালিয়ে আসা' দেখে অভ্যস্ত, তাঁদের কাছে প্রটোকল অনুযায়ী জাতিসংঘে কাজ করাটাও অবরুদ্ধ মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। হাসিনামার্কা 'উপস্থিতির নামে লোক দেখানো ট্রিপ' না পেয়ে উনাদের গা জ্বলছে।

৩. সাইডলাইন ডিপ্লোম্যাসি বনাম ঘুরাঘুরি: আমেরিকা সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বনেতাদের সাথে ব্যাক-টু-ব্যাক বাইলেটারাল ও সাইডলাইন মিটিং করা, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশের নতুন রূপরেখা তুলে ধরা। কাজের চাপে যেখানে নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই, সেখানে মামুর বেটিরা খুঁজছেন—'উনি নিউ ইয়র্কের বাইরে ঘুরতে যান না কেন?'

৪. তোষামোদকারী মিডিয়ার নতুন আবিষ্কার: ১৫ বছর ধরে দিল্লির প্রেস নোট দেখে নিউজ করা এই 'সাংবাদিকরা' এখন এতই অসহায় যে, জাতিসংঘের হেডকোয়ার্টারে প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল কূটনৈতিক ব্যস্ততাকেও 'আটকে পড়া' হিসেবে গিলানোর চেষ্টা করছেন!

মূল কথা হলো: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মর্যাদা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক ব্যস্ততা দেখে যাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে, তাদের জন্য একটাই পরামর্শ—একটু ভালো ভূগোল বই আর বিশ্ব রাজনীতির ম্যানুয়াল পড়ে আসুন। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বনেতারা 'পার্কের ট্রিপ' দিতে যান না, দেশের কাজ করতে যান!

দেবাশীষ রায়: রাজকীয় পোশাকের আড়ালে সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী

দেবাশীষ রায়: রাজকীয় পোশাকের আড়ালে সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী

দেবাশীষ রায়—যার পারিবারিক ইতিহাস জড়িয়ে আছে ১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কুখ্যাত পিতা ত্রিদিব রায়ের সরাসরি অবস্থান ও পাকিস্তান আনুগত্যের সাথে। তবে কেবল পারিবারিক ইতিহাসের আড়ালেই তাঁর নেতিবাচক পরিচয় সীমাবদ্ধ নয়; পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থির রাখা, পাহাড়ে বিভেদ সৃষ্টি এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী এজেন্ডাকে উসকে দেওয়ার নেপথ্য কারিগর হিসেবে তিনি বহুল সমালোচিত।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তিনি বর্তমানে কোনো সাধারণ অভিযোগের মুখোমুখি ব্যক্তি নন, বরং তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে ভূমি জালিয়াতি ও রাষ্ট্রদ্রোহমূলক অপরাধের দায়ে আদালত প্রদত্ত ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের সুস্পষ্ট রায় ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। একজন সাধারণ নাগরিকের জন্য আইন যে কঠোরতায় প্রয়োগ হয়, দেবাশীষ রায়ের ক্ষেত্রে সেই আইনের দীর্ঘ নীরবতা বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে তীব্র জনক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ঐতিহ্যবাহী পরিচয়ের আড়ালে থাকা এই সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের মুখোমুখি করাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।

মোদি কেন জাতিসংঘে অনুপস্থিত থাকেন?


মোদি কেন জাতিসংঘে অনুপস্থিত থাকেন? 

নিজ দেশে একের পর এক জনসভা, বিশাল র‍্যালি আর ক্যামেরাঘেরা মেগা ইভেন্টে নরেন্দ্র মোদির জুড়ি মেলা ভার। অনুগত সংবাদমাধ্যম আর দলীয় সমর্থকদের কাছে তিনি 'বিশ্বগুরু'। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, বিশ্বের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক মঞ্চ—জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (UNGA) মূল অধিবেশনে যখন বিশ্বনেতারা মুখোমুখি হন, মুখোমুখি হয় বৈশ্বিক বিতর্ক, তীব্র কূটনৈতিক প্রশ্নবাণ আর সংবাদমাধ্যমের উন্মুক্ত মুখোমুখি জবাবদিহিতা—তখনই নিজদেশে 'বিশ্বগুরু' খ্যাত মোদিকে দেখা যায় সবচেয়ে দূরত্ব বজায় রাখতে। 

কিন্তু কেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের মতো প্ল্যাটফর্মকে এত কৌশলে এড়িয়ে যান বা কেবল প্রথাগত ভিডিও বার্তা/প্রতিনিধি পাঠাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন? এর কয়েকটি কারণ রয়েছে- 

টেলিপ্রম্পটার ছাড়া স্ক্রিপ্টহীন সাংবাদিকতার ভয়: মোদির রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো খোলামেলা বা আনস্ক্রিপ্টড প্রশ্নোত্তরের মুখোমুখি না হওয়া। এছাড়াও তিনি ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন না। তাই আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় টেলিপ্রম্পটার ছাড়া কোনো প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে পারেন না। দিল্লিতে হোক কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে—লাইভ প্রেস কনফারেন্সে সাংবাদিকদের তীক্ষ্ণ প্রশ্নের উত্তর তিনি দেন না। কিন্তু জাতিসংঘ চত্বরে বিশ্ব গণমাধ্যমের স্বাধীন প্রশ্নবাণ ও মানবাধিকার, সংখ্যালঘু অধিকার বা কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে সোজাসুজি প্রশ্নের উত্তর এড়ানোর সুযোগ থাকে না। 

বিশ্বমঞ্চে গৃহপালিত মিডিয়ার অভাব: ভারতে মূলধারার বড় একটি গণমাধ্যম যেখানে দিনরাত প্রশংসাগীতি গাইতে ব্যস্ত, জাতিসংঘের নিউ ইয়র্ক সদর দপ্তরে সেই 'সুবিধা' পাওয়ার সুযোগ নেই। সেখানে সাংবাদিকরা চাটুকারিতার বদলে প্রশ্ন করেন বাস্তব সমস্যা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, পরিবেশ নীতি ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে। ফলে ক্যামেরার সামনে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ার ঝুঁকি তিনি নিতে চান না।

‘বিশ্বগুরু’ ভাবমূর্তির বেলুন ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা: নিজ দেশে প্রচার চালানো হয় যে পুরো বিশ্ব নাকি মোদির নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক ফোরামে কোনো ব্যক্তির একক কোনো কর্তৃত্ব থাকে না—সেখানে অন্যান্য বিশ্বনেতাদের মতোই তিনিও সমমর্যাদার একজন রাষ্ট্রপ্রধান মাত্র। বিশ্বনেতাদের নিরপেক্ষ বা শীতল আচরণ দেশের তৈরি করা কৃত্রিম 'মহাপুরুষ' ইমেজকে এক লহমায় গুঁড়িয়ে দিতে পারে। 

প্রশ্নের মুখে ভারতের মানবাধিকার ও নীতি: জাতিসংঘের বহু মানবাধিকার পরিষদ ও আন্তর্জাতিক নজরদারি সংস্থাগুলোতে বারবার ভারতের অভ্যন্তরীণ সংখ্যালঘুদের অবস্থা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকোচন এবং ভিন্নমত দমনের অভিযোগ উঠেছে। জাতিসংঘের মূল অধিবেশনে উপস্থিত হওয়া মানেই এসব অস্বস্তিকর বৈশ্বিক প্রশ্নের মুখে পড়া।

মূলত বিশ্বমঞ্চের আসল চ্যালেঞ্জ, জবাবদিহিতা ও উন্মুক্ত বিতর্ক মোকাবেলা করার মতো সাহসের অভাব ঢাকতেই মোদির এই 'কূটনৈতিক অনুপস্থিতি'। নিজের তৈরি করা ঘরোয়া ইমেজের দুর্গ নিরাপদ রাখতেই আন্তর্জাতিক সব বড় বিতর্ক থেকে দূরত্ব বজায় রেখে 'বিশ্বগুরু' সাজাই যেন তাঁর সবচেয়ে বড় স্ট্র্যাটেজি।

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বনাম ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতন

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বনাম ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতন

বাংলাদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মের মানুষ শতাব্দী ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। পূজা, বড়দিন কিংবা বুদ্ধপূর্ণিমা—উৎসবের দিনগুলোতে প্রতিবেশী মুসলিম পরিবারও শামিল হয় আনন্দে। এই সহাবস্থান কোনো আরোপিত নীতি নয়, বরং সমাজের গভীরে প্রোথিত এক বাস্তবতা।

মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঘটনা ঘটে— কিন্তু প্রতিটি ঘটনার তদন্তে উঠে এসেছে ব্যক্তিগত শত্রুতা বা সম্পত্তি বিরোধের মতো কারণ, ধর্মীয় নিপীড়নের কোনো সংগঠিত রূপ নয়। রংপুরের ঘটনায় তো অপরাধীরাই ছিল সনাতন ধর্মাবলম্বী—যা প্রমাণ করে এটি সাম্প্রদায়িক সংঘাত ছিল না। প্রতিটি ক্ষেত্রে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে, বিচার প্রক্রিয়া এগিয়েছে।

এর বিপরীতে ভারতের চিত্র ভিন্ন প্রকৃতির। সেখানে মুসলিম, খ্রিষ্টান, দলিত, আদিবাসী—একাধিক জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতেই নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে। জাতিসংঘের সিইআরডি কমিটি সরাসরি সতর্ক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতন নিয়ে। খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে ৮৩০টি হামলার মধ্যে মামলা হয়েছে মাত্র ৩৯টিতে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, বাংলাভাষী মুসলিমদের আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ঠেলে দেওয়া হচ্ছে সীমান্তের ওপারে।

এই তুলনা থেকে যে পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়, তা হলো—বাংলাদেশে বিচ্ছিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র দাঁড়ায়, ভারতে অভিযোগের কেন্দ্রেই থাকে রাষ্ট্র নিজে। 

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদের গতি উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম 'মুসলিম মিরর'-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু গত জুন মাসের আগের দেড় মাসে বিভিন্ন রাজ্যে অন্তত ২৩টি মসজিদ, মাদরাসা, ঈদগাহ ও দরগাহ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে—এর বড় অংশই ঘটেছে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে। এর আগে উত্তর প্রদেশে একাই প্রায় তিনশোর কাছাকাছি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙার খবর উঠে আসে।

পশ্চিমবঙ্গে এপ্রিলের বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পায়। নির্বাচনের আগে থেকেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রকাশ্য জনসভায় রাজ্য সরকার পরিবর্তনের ডাক দেন এবং অভিযোগ তোলেন যে তৃণমূল সরকার সীমান্তে বেড়া নির্মাণে বাধা দিয়ে "অনুপ্রবেশকারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল" তৈরি করেছে। নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই সেপ্টেম্বরে সামনে আসে আরেকটি বিতর্ক—রাজ্য গোয়েন্দা বিভাগের নির্দেশে পুলিশ পশ্চিমবঙ্গজুড়ে মসজিদ, মাদ্রাসা, ঈদগাহ ও মাজারগুলোর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ শুরু করে, একুশ দফা ফরম পূরণ করিয়ে। রাজ্যজুড়ে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্ক তৈরি হয়, এমনকি রাজ্য সরকার আগে হাইকোর্টকে জানিয়েছিল—এমন কোনো নির্দেশ তারা দেয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সংসদেও প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এক সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি বলেন—"ভারতে যে হারে মসজিদ ভাঙা হয়, বাংলাদেশে কি সে হারে মন্দির ভাঙা হয়?"—এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানান। 

কারণ ইতিহাস বলে, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দুদের সবচেয়ে বড় শারদীয় ‍পুজা অনুষ্ঠিত হয়। আর উৎসবের এই সময়টাকেই বেছে নিয়ে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তৈরি করে ফায়দা লুটতে চায় একটি চক্র। গুজব ছড়ানো, উসকানিমূলক পোস্ট, মিথ্যা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া—এসব ষড়যন্ত্র প্রায়ই আসে সীমান্তের ওপার থেকেও, যেখানে বাংলাদেশের প্রতিটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে বড় করে দেখানোর একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তাই প্রশাসন, গণমাধ্যম আর সাধারণ মানুষ—সবাইকে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। কোনো গুজবে কান না দিয়ে, কোনো উসকানিতে পা না দিয়ে, প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকাটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team