জাতীয় পরিচয়ের স্বাভাবিক প্রতিফলনকে ইসলামীকরণ বলছে কারা?

0

জাতীয় পরিচয়ের স্বাভাবিক প্রতিফলনকে

ইসলামীকরণ বলছে কারা?

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি নবগঠিত ব্যাটালিয়নের কোম্পানিগুলোর নাম খোলাফায়ে রাশেদীন—হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.), হযরত উমর (রা.), হযরত উসমান (রা.) ও হযরত আলী (রা.)-এর নামে রাখাকে কেন্দ্র করে কিছু মহল এটিকে “সেনাবাহিনীর ইসলামীকরণ” বলে বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের সামরিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ঐতিহাসিক, জাতীয় ও ইসলামী ব্যক্তিত্বের নামে নামকরণ নতুন কিছু নয়।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠদের স্মৃতি, ত্যাগ ও বীরত্বকে সম্মান করার ঐতিহ্য আছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটেও বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক—এই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সামরিক সম্মাননার ধারাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীতেও বহুদিন ধরেই ইসলামী ইতিহাসের ব্যক্তিত্বদের নামে যুদ্ধজাহাজ ও স্থাপনার নাম আছে। উদাহরণ হিসেবে—BNS Abu Bakr, BNS Umar Farooq, BNS Abu Ubaidah, BNS Ali Haider, BNS Khalid Bin Walid—এসব নাম বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজের তালিকায় পাওয়া যায়।

এছাড়া নৌবাহিনীর স্থাপনার নামেও BNS Issa Khan, BNS Titumir, BNS Haji Mohsin, BNS Shaheed Moazzam—এর মতো ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক নাম দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও একই ধারা আছে। দেশের প্রধান বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর—বাংলাদেশের সম্মানিত সুফি সাধক শাহজালাল (র.)-এর নামে নামকরণ করা হয়েছে। চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও একজন ইসলামী সাধকের নামে।

তাহলে প্রশ্ন হলো—বিমানবন্দর, নৌবাহিনীর জাহাজ, সামরিক স্থাপনা বা জাতীয় প্রতিষ্ঠান ইসলামী ঐতিহ্যের ব্যক্তিত্বের নামে হলে সমস্যা হয় না; কিন্তু সেনাবাহিনীর একটি ব্যাটালিয়নের কোম্পানির নাম খোলাফায়ে রাশেদীনের নামে হলে হঠাৎ “ইসলামীকরণ” বলে চিৎকার কেন?

বাংলাদেশের সংবিধানের ২ক অনুচ্ছেদে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম বলা হয়েছে; একই সঙ্গে অন্যান্য ধর্মের সমান মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।  ২০২২ সালের জাতীয় আদমশুমারি অনুযায়ী দেশের প্রায় ৯১% মানুষ মুসলমান।  তাই ইসলামী ইতিহাসের মহান ব্যক্তিত্বদের নামে নামকরণ বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও জাতীয় ঐতিহ্যের স্বাভাবিক প্রতিফলন।

খোলাফায়ে রাশেদীন শুধু ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নন; তাঁরা নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ, রাষ্ট্রপরিচালনা ও সামরিক প্রজ্ঞার প্রতীক। সেনাবাহিনীর মতো একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের নাম সৈনিকদের নৈতিকতা, সাহস ও নেতৃত্বের অনুপ্রেরণা দিতে পারে।

এই তালিকায় ভবিষ্যতে হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর নামও যুক্ত হতে পারে। তিনি “সাইফুল্লাহ” নামে পরিচিত এবং ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামরিক কৌশলবিদ। তাঁর নামে নৌবাহিনীর জাহাজও আছে—BNS Khalid Bin Walid।

তাই এই নামকরণকে “ইসলামীকরণ” বলা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এটি বরং বাংলাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের ঐতিহাসিক স্মৃতি, সামরিক অনুপ্রেরণা এবং জাতীয় পরিচয়ের স্বাভাবিক প্রকাশ।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রতিষ্ঠিত, পেশাদারিত্বে পরিচালিত এবং জনগণের আস্থার প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং ইসলামী ঐতিহ্য—এই তিনটি একে অপরের বিরোধী নয়; বরং বাংলাদেশের বাস্তব পরিচয়েরই অংশ।

যারা অযথা বিতর্ক তৈরি করছেন, তাদের সমস্যা নামকরণে নয়; সমস্যা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের স্বাভাবিক প্রকাশে।


বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী, পেশাদার, দেশপ্রেমিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন রাখতে এমন ইতিবাচক উদ্যোগকে স্বাগত জানানো উচিত।

No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo