ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় কোন দিকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক?

0

সাম্প্রতিক মতামতমূলক কিছু লেখা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভারতের আচরণ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা শুধু আবেগের নয়—এটি দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের প্রতিফলন। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সম্পর্কের ‘গোল্ডেন এরা’ শেষ হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি ঘোষণা করে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ঢাকা আর কোনো প্রতিবেশীর অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকবে না।

এই পরিবর্তন ভারতের জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। সিলিগুড়ি করিডর (চিকেন্স নেক) ঘিরে ভারতের সামরিক শক্তিবৃদ্ধি—ব্রহ্মোস মিসাইল, নতুন গ্যারিসন (চোপড়া, ধুবড়ি, কিশানগঞ্জ)—চীনের সম্ভাব্য হুমকি ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অস্থিরতার প্রতিক্রিয়া। কিন্তু বাংলাদেশের দৃষ্টিতে এটি সীমান্তঘেঁষা চাপ। বাংলাদেশের যুক্তি বাস্তবসম্মত: প্রত্যেক স্বাধীন রাষ্ট্রের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ার অধিকার আছে। ভারত যখন রাফায়েল বা ফ্রান্স-ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তি করে, তখন প্রতিবেশীদের অনুমতি নেয় না। একইভাবে বাংলাদেশও চীন, তুরস্ক বা অন্যদের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে পারে।

সীমান্ত ‘পুশ-ইন’ ও অভিবাসন ইস্যু সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে। উভয় পক্ষই অভিযোগ করছে, কিন্তু ফোর্সড পুশ-ইন কূটনৈতিক শিষ্টাচারবিরোধী। ভারতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হাজার হাজার হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। বাংলাদেশ বলছে এগুলো রাজনৈতিক, কিন্তু ভারত এটিকে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার প্রমাণ হিসেবে দেখে। এই ইস্যু কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার হয়ে উঠলে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হয়।

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির মূল শক্তি বঙ্গোপসাগরের ভূ-কৌশলগত অবস্থান। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট পলিসির মাঝে বাংলাদেশ ভারসাম্য রক্ষা করতে চায়। অর্থনৈতিক আন্তনির্ভরশীলতা (বাণিজ্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার) থাকলেও রাজনৈতিক অবিশ্বাস গভীর। গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ ২০২৬-এ শেষ হচ্ছে—এটি একটি বড় পরীক্ষা।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারতের ‘বড় ভাই’সুলভ মনোভাব আচরণ এবং ক্রমাগত বাংলাদেশের উপর বৈরি আচরণ উভয়ের দেশের জন্যই ঝুঁকি তৈরি করছে। ছোট দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সম্পর্ক স্বাভাবিক, কিন্তু অন্য দেশের সাথে ঘনিষ্ঠতা কেন ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ায়?

সমাধানের পথ সংলাপ ও পারস্পরিক সম্মানে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদার, পানি-বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন এবং অভ্যন্তরীণ সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। আবেগীয় জাতীয়তাবাদের বদলে বাস্তববাদী কূটনীতি না এলে অবিশ্বাস আরও গভীর হবে। শুধু বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ইস্যু নয় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা সবার স্বার্থ।

No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo