"বন্ধুত্ব, নাকি প্রভাব? বাংলাদেশের সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্ন"

0

"বন্ধুত্ব, নাকি প্রভাব? বাংলাদেশের সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্ন"

বন্ধুত্ব... একটি শব্দ। কিন্তু রাষ্ট্রের সম্পর্কে এই শব্দের প্রকৃত অর্থ কী?

বন্ধুত্ব কি শুধু কূটনৈতিক হাসি, যৌথ বিবৃতি আর আনুষ্ঠানিক সফরে সীমাবদ্ধ? নাকি বন্ধুত্বের প্রকৃত পরীক্ষা হয় আচরণে, পারস্পরিক সম্মানে এবং একে অপরের সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে?

আজ বাংলাদেশের অনেক মানুষের মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে...

ভারত কি সত্যিই বাংলাদেশকে সমমর্যাদার বন্ধু হিসেবে দেখে, নাকি একটি প্রভাবাধীন প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়?

এই প্রশ্নের উত্তর আবেগে নয়। উত্তর খুঁজতে হবে বাস্তবতায়।

বাংলাদেশের চারপাশে ভারতের সামরিক অবকাঠামো গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। সীমান্তের কাছাকাছি বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা, বিমানঘাঁটির আধুনিকায়ন, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার সম্প্রসারণ এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কৌশলগত প্রস্তুতি স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ভারত বলতেই পারে, এগুলো তাদের জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজন।

কিন্তু একইভাবে বাংলাদেশেরও একটি প্রশ্ন করার অধিকার আছে।

একটি বন্ধুসুলভ প্রতিবেশীর সীমান্তের এত কাছে ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি কি পারস্পরিক আস্থা বাড়ায়? নাকি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে?

বাংলাদেশ কখনোই কোনো প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে আগ্রাসনের নীতি অনুসরণ করেনি।

বাংলাদেশ কারও ভূখণ্ড দাবি করে না।

কারও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায় না।

কিন্তু নিজের সীমান্ত, আকাশসীমা, সমুদ্রসীমা এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত রক্ষা করা প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক অধিকার।

এই কারণেই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়।

এটি আত্মরক্ষার প্রস্তুতি।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাভাবিক দায়িত্ব।

তাহলে প্রশ্ন আসে...

বাংলাদেশ কোন দেশ থেকে যুদ্ধবিমান কিনবে...

কোথা থেকে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহ করবে...

কার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করবে...

সেটি কি অন্য কোনো রাষ্ট্রের অনুমতির বিষয়?

বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রই নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী প্রতিরক্ষা অংশীদার নির্বাচন করে।

বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়।

একই নীতি প্রযোজ্য পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও।

চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, তুরস্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উপসাগরীয় দেশ, পাকিস্তান কিংবা ভারত...

বাংলাদেশ সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারে।

কিন্তু সেই সম্পর্কের ভিত্তি হবে একটাই।

বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ।

কোনো দেশের সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি নয়।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি অন্য কোনো রাজধানী থেকে পরিচালিত হতে পারে না।

বন্ধুত্ব কখনো নিয়ন্ত্রণের নাম নয়।

বন্ধুত্ব মানে সম্মান।

পারস্পরিক আস্থা।

এবং সমমর্যাদা।

তবে সম্পর্কের আরেকটি দিকও রয়েছে।

সীমান্তে কথিত "পুশ-ইন" নিয়ে বিতর্ক, অবৈধ অভিবাসন ইস্যু, কিংবা রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রচারণা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সেগুলো কেবল আবেগ দিয়ে নয়, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক আইন মেনেই সমাধান হওয়া উচিত।

একইভাবে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।

কিন্তু যে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়কে রাজনৈতিক চাপ বা ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার হাতিয়ার বানানো হলে তা পারস্পরিক আস্থাকে দুর্বল করতে পারে।

বাংলাদেশের জনগণ চায়...

শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক।

সম্মানের সম্পর্ক।

এবং সমান মর্যাদার সম্পর্ক।

কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।

কারও অধীনতাও নয়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার সামরিক সক্ষমতা নয়।

এই দেশের শক্তি তার মানুষ।

তার অর্থনীতি।

তার ভৌগোলিক অবস্থান।

বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব।

এবং পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগস্থলে তার অবস্থান।

আজকের বিশ্বে বাংলাদেশ আর কোনো প্রান্তিক রাষ্ট্র নয়।

বরং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের নীতিও হওয়া উচিত স্পষ্ট।

সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব।

কারও প্রতি শত্রুতা নয়।

কিন্তু...

কোনো প্রভুত্বও নয়।

বাংলাদেশ যুদ্ধ চায় না।

সংঘাত চায় না।

উত্তেজনা চায় না।

কিন্তু জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীন সিদ্ধান্তের প্রশ্নে আপসও চায় না।

কারণ স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ শুধু একটি পতাকা নয়।

স্বাধীনতার অর্থ...

নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া।

নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নির্ধারণ করা।

এবং বিশ্বের সঙ্গে মাথা উঁচু করে সমমর্যাদার ভিত্তিতে পথচলা।

বাংলাদেশের বার্তা তাই একটাই...

আমরা কারও বিরুদ্ধে নই।

আমরা বাংলাদেশের পক্ষে।

আমরা শান্তি চাই...

কিন্তু আত্মসমর্পণ নয়।

আমরা সহযোগিতা চাই...

কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নয়।

আমরা বন্ধুত্ব চাই...

কিন্তু প্রভুত্ব নয়।

এটাই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকার।

এটাই সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি।

এবং অনেকের দৃষ্টিতে...

এটাই "বাংলাদেশ ফার্স্ট" নীতির মূল দর্শন।

No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo