প্রতারণার জগতে কোনো নিয়ম নেই, শুধু রূপ বদলানোর কৌশল আছে। একজন প্রতারক যখন ধর্মের আড়ালে বা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় আশ্রয় নেয়, তখন তার শঠতা আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস ওরফে তাওহিদ ইসলাম এর উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি একই সাথে হিন্দু সাধু ও মুসলিম পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিশ্বাসকে হাতিয়ার বানিয়েছেন বলে অভিযোগ।
হরিদাসের জীবন রূপান্তরের এক জাদুকরী গল্প। একসময় ডোম সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষ, এসি মেকানিক ও সবজি বিক্রেতা হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ২০১৯ সালের দিকে তিনি ধর্মান্তরিত হয়ে তাওহিদ ইসলাম নাম নেন এবং একজন মুসলিম নারীকে বিয়ে করেন। এই বিয়ের উদ্দেশ্য নিয়ে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন — এটি কি সুবিধার জন্য ধর্মান্তর ও পরিচয় বদলের কৌশল ছিল? পরবর্তীতে তিনি আবার হিন্দু পরিচয়ে ফিরে এসে পলাশবাড়ীতে বিশাল মন্দির কমপ্লেক্স গড়ে তোলেন। দ্বৈত পরিচয়ের এই খেলা তাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সুবিধা দিয়েছে বলে অভিযোগ।
মন্দির নির্মাণের ভাবনা কেন এল?
পলাশবাড়ীর একটি পুরনো, জরাজীর্ণ মন্দির চত্বরকে কেন্দ্র করে তিনি এই প্রকল্প শুরু করেন। কয়েক কোটি থেকে ২২-৪০ কোটি টাকার বিশাল স্কেলে রাধা-গোবিন্দ, কালী মন্দির, শিবমূর্তি, এমনকি রামমূর্তি নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। সনাতন ধর্মের কোনো ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় নেতা বা পুরোহিত হিসেবে তার পরিচয় নয় — তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠাতা ও সেবক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। সমর্থকরা বলেন, এটি ধর্মীয় উন্নয়ন ও সমাজসেবা। কিন্তু সমালোচকরা প্রশ্ন করেন: সাধারণ জীবন থেকে হঠাৎ এত বিপুল অর্থের উৎস কোথায়?
২০২২ সালে র্যাব ও এনএসআইয়ের অভিযানে তাকে গ্রেফতার করা হয় প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের ভুয়া প্রোটোকল অফিসার সেজে টেন্ডার জালিয়াতি, প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে। এরপর মন্দির প্রকল্পকে অনেকে তার অবৈধ অর্থ লন্ড্রিং ও অতীত ঢাকার আড়াল হিসেবে দেখেন। ধর্মের নামে বিপুল দান-অনুদান ও ভক্তি সংগ্রহ করে ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তার — এটি লালসালুর মজিদের আধুনিক সংস্করণ।
হরিদাস কি সনাতন ধর্মের কোনো ধর্মীয় নেতা? না। তিনি একজন স্ব-ঘোষিত উদ্যোক্তা যিনি ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে বড় প্রকল্প গড়েছেন। তার কর্মকাণ্ডে সনাতনী সম্প্রদায়ের কেউ কেউ উপকৃত হলেও, অর্থের উৎসের স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত। একদিকে মুসলিম নারীকে বিয়ে করে ধর্মান্তর, অন্যদিকে হিন্দু মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা — এই বহুরূপী চরিত্র ধর্মকে যেন ব্যক্তিগত স্বার্থের সিঁড়ি বানিয়েছে।
প্রতারকরা জানে, ধর্মীয় অনুভূতি সবচেয়ে সহজে শোষণযোগ্য। রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক আড়াল নিয়ে তারা সমাজকে বিভক্ত করে নিজেদের সাম্রাজ্য গড়ে। হরিদাসের ঘটনা আমাদের সতর্ক করে: অন্ধ বিশ্বাস ও অস্বচ্ছতা যেন নতুন কোনো লালসালু তৈরি না করে। স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহিতা এবং ধর্মকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক খেলা থেকে মুক্ত রাখাই একমাত্র সমাধান। অন্যথায় বহুরূপীরা বারবার রূপ বদলে সমাজকে ঠকিয়ে যাবে।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment