পলাশবাড়ির হরিদাস কি এ যুগের লালসালুর মজিদ?

0

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর অমর উপন্যাস লালসালু-তে মজিদ এক অখ্যাত কবরকে পীরের দরগায় পরিণত করে লাল সালু ঢেকে গ্রামবাসীদের অন্ধবিশ্বাসের সুযোগ নেয়। ধর্মের নামে সে ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাব গড়ে তোলে। তার ভণ্ডামি সমাজের কুসংস্কার ও ধর্মীয় শোষণের প্রতীক হয়ে ওঠে।

আজকের বাংলাদেশে, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা হরিদাস চন্দ্র তরণীদাস (ওরফে তাওহিদ ইসলাম) কি সেই মজিদেরই আধুনিক সংস্করণ? একটি বিশাল মন্দির কমপ্লেক্স (২২-২৮ কোটি টাকার দাবি), শতাধিক দেব-দেবীর বিগ্রহ, উঁচু কৃষ্ণমূর্তি — সবকিছু দেখে মনে হয় ধর্মীয় উন্নয়নের জয়গান। কিন্তু পর্দার আড়ালে যে গল্পটা আছে, তা মজিদের চেয়ে কম চমকপ্রদ নয়।

মজিদের মতো হরিদাসও সাধারণ জীবন থেকে উঠে এসেছেন। একসময় এসি মেকানিক ও সবজি বিক্রেতা ছিলেন। ২০১৯ সালে ধর্মান্তরিত হয়ে তাওহিদ ইসলাম নাম নেন। তারপর হঠাৎ করে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের প্রোটোকল অফিসার সেজে টেন্ডার জালিয়াতি, প্রতারণা ও কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২২ সালে র‍্যাব ও এনএসআইয়ের হাতে গ্রেফতার হন।

মজিদ যেমন একটা কবরকে পীরের আস্তানা বানিয়ে গ্রামের মানুষের দান-সাহায্য ও ভক্তি কুড়িয়েছিলেন, হরিদাসও ধর্মের আড়ালে বিপুল অর্থের উৎস তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ। আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে — সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে রাতারাতি কীভাবে এত বড় মন্দির নির্মাণ সম্ভব? সমালোচকরা বলেন, এটি অবৈধ অর্থের লন্ড্রিং এবং পূর্বের প্রতারণার ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল। একই ব্যক্তি দ্বৈত পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ।

তুলনা করলে দেখা যায়, দুজনের কৌশল প্রায় একই — ধর্মকে হাতিয়ার বানিয়ে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের সুযোগ নেওয়া। মজিদ গ্রামীণ কুসংস্কারকে কাজে লাগিয়েছিলেন, হরিদাস আধুনিক যুগে বড় স্কেলে মন্দিরের মাধ্যমে সনাতনী সম্প্রদায়ের আবেগকে ব্যবহার করছেন। মজিদের মতোই তার চরিত্রে চতুরতা ও রূপান্তরের ছায়া স্পষ্ট।

তবে পার্থক্যও আছে। লালসালু একটি সাহিত্যিক সৃষ্টি, যেখানে মজিদের ভণ্ডামি স্পষ্টভাবে উন্মোচিত। হরিদাসের ক্ষেত্রে বিষয়টি এখনও বিতর্কিত — সমর্থকরা তাকে ধর্মীয় উন্নয়নকারী ও সমাজসেবক বলেন, যিনি মন্দিরকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। সমালোচকরা প্রতারণার অভিযোগ তুলে নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন।

এ যুগের মজিদরা আরও চতুর। তারা সোশ্যাল মিডিয়া, বড় প্রকল্প ও রাজনৈতিক আড়াল ব্যবহার করে। ধর্ম যেখানে মানুষের আশ্রয় হওয়ার কথা, সেখানে তা প্রতারণার আড়াল হয়ে উঠলে সমাজের ক্ষতি হয়। লালসালুর মজিদের গল্প আমাদের সতর্ক করে — অন্ধবিশ্বাস ও অস্বচ্ছতা যেন নতুন করে কোনো ধর্মীয় সাম্রাজ্য গড়ে না তোলে।

পলাশবাড়ির ঘটনা আমাদের প্রশ্ন করায়: ধর্ম কি সত্যিই মানুষের কল্যাণে, নাকি কয়েকজনের স্বার্থে? স্বচ্ছতা ও তদন্তই পারে সত্য উন্মোচন করতে। অন্যথায়, এ যুগের লালসালু আরও বড় আকারে ছড়িয়ে পড়বে।

No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo