চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডর: অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য

0

 চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডর: অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার পাশাপাশি চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই করিডর বাস্তবায়িত হলে শুধু তিন দেশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়বে না, বরং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

এই ধারণা নতুন নয়। ১৯৯০-এর দশকে বিসিআইএম (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার) করিডরের প্রস্তাব উঠলেও রাজনৈতিক কারণে তা স্থবির হয়ে পড়ে। বর্তমান প্রস্তাবটি তারই পরিবর্তিত রূপ, যেখানে ভারত নেই। সম্ভাব্য রুট বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মিয়ানমারের রাখাইন ও মান্দালয় হয়ে চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। ঐতিহাসিক বাণিজ্যপথকে আধুনিক রূপে ফিরিয়ে আনার এই উদ্যোগ আঞ্চলিক সংযোগকে নতুন মাত্রা দেবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক লাভের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য। মোংলা, চট্টগ্রাম, বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ট্রানজিট দেশের চেয়ে উৎপাদন ও সরবরাহশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি বৃদ্ধি ও বৈদেশিক বিনিয়োগের নতুন দুয়ার খুলবে। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ বাড়িয়ে ‘পূর্বমুখী নীতি’ বাস্তবায়নে এটি সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

তবে ভূরাজনৈতিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে হরমুজ প্রণালিসহ বিভিন্ন সংকটের কারণে বিকল্প পথের চাহিদা বেড়েছে। চীনের জন্য এই করিডর বঙ্গোপসাগরে অর্থনৈতিক উপস্থিতি জোরদার করবে। ভারতের কৌশলগত বিশ্লেষকরা এতে বঙ্গোপসাগরে চীনের প্রভাব বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও চীন মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দরসহ অন্যান্য প্রকল্পের মাধ্যমে ইতোমধ্যে অঞ্চলে উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে, তবু এই করিডর আঞ্চলিক বাণিজ্যকে আরও কার্যকর করার অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবেও দেখা যায়। ভারতও ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির আওতায় একই ধরনের সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যা প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতার সম্ভাবনাও তুলে ধরে।

নিরাপত্তা ঝুঁকি উপেক্ষা করা যায় না। করিডরের সম্ভাব্য অংশ রাখাইন অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যেতে পারে, যেখানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ ও রোহিঙ্গা সংকট বিদ্যমান। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হবে। চীনের প্রভাবশালী ভূমিকা এখানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনসহ স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

অর্থনৈতিক ঝুঁকিও বিবেচনাযোগ্য। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের কিছু প্রকল্পে ঋণের বোঝা, স্বচ্ছতার অভাব ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাই বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা, জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখে চীন, ভারত, জাপান ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়াই বাংলাদেশের জন্য সঠিক পথ। এই করিডর যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলবে, কিন্তু সতর্কতা অবলম্বন ছাড়া ঝুঁকিও বাড়বে।

No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo