পার্বত্য চট্টগ্রাম বাঙালিরা কীভাবে সেটেলার?

0


পার্বত্য চট্টগ্রাম বাঙালিরা কীভাবে সেটেলার?

পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেউ কেউ এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যেন এটি কেবল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের একান্ত ভূমি। বাঙালিদের সেখানে ‘সেটেলার’ বা অনধিকারী বলে আখ্যা দেওয়া হয়। এই বক্তব্যটি ইতিহাস, জনমিতি ও সংবিধান— কোনোটার সঙ্গেই মিলে না।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ যেমন বসবাস করেন, তেমনি বাঙালিরাও দীর্ঘদিন ধরে এই পাহাড়ের বাসিন্দা। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুসারে পার্বত্য তিন জেলার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০.০৬ শতাংশই বাঙালি। অর্থাৎ সংখ্যায় তারা এখন অর্ধেকেরও বেশি বা প্রায় সমান। বান্দরবানে বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, খাগড়াছড়িতেও তাদের অনুপাত বেশি। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে শুধু নৃ-গোষ্ঠীদের এলাকা বলার চেষ্টা সংবিধানবিরোধী।

বাংলাদেশের সংবিধান স্পষ্ট। দেশের যেকোনো নাগরিক যেকোনো স্থানে বসবাস, জমি ক্রয় ও জীবিকা নির্বাহের অধিকার রাখেন। পার্বত্য অঞ্চল এর ব্যতিক্রম নয়। কোনো এলাকাকে নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তি বলে ঘোষণা করার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তিতে নৃ-গোষ্ঠীদের জন্য কিছু বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই চুক্তি বাঙালিদের অধিকার খর্ব করেনি বা তাদেরকে ‘বহিরাগত’ বলে চিহ্নিত করেনি।

তবুও কেন ‘সেটেলার’ শব্দটি এত জোরালোভাবে ব্যবহার করা হয়? এর পেছনে রয়েছে একধরনের রাজনৈতিক অবস্থান। ইতিহাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন বাঙালিরা হঠাৎ করে এসে পাহাড় দখল করেছে। বাস্তবতা ভিন্ন। পাহাড়ে বাঙালি বসতি অনেক পুরনো। ব্রিটিশ আমল থেকেই এখানে বাঙালিরা কৃষি, ব্যবসা ও প্রশাসনিক কাজে যুক্ত ছিলেন। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে সরকারি পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে কিছু পরিবার এসেছে— এটা সত্য। কিন্তু সেটাকেই একমাত্র সত্য বলে উপস্থাপন করা এবং সব বাঙালিকে ‘অনধিকারী’ আখ্যা দেওয়া ইতিহাসের বিকৃতি।

যারা বাঙালিদের সেটেলার বলেন, তারা প্রশ্ন করেন না— নৃ-গোষ্ঠীগুলোই কি এই পাহাড়ের আদি বাসিন্দা? অনেক নৃ-গোষ্ঠীরই পূর্বপুরুষ বিভিন্ন সময়ে আরাকান, ত্রিপুরা বা অন্যান্য অঞ্চল থেকে এসেছেন। ইতিহাস জটিল। একপেশে বয়ান দিয়ে সত্য আড়াল করা যায় না।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও সম্প্রীতি চাইলে বাস্তবতাকে স্বীকার করতে হবে। এখানে নৃ-গোষ্ঠী ও বাঙালি— উভয়েরই সমান অধিকার। একপক্ষকে ‘মূল’ আর অন্যপক্ষকে ‘সেটেলার’ বলে চিহ্নিত করা বিভাজন তৈরি করে। সংবিধান সব নাগরিককে সমান চোখে দেখে। জনমিতিও বলে, পাহাড় এখন আর শুধু এক গোষ্ঠীর নয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের। এখানে যারা নাগরিক, তারা সবাই এই মাটির অধিকারী।

No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo