পার্বত্য বান্দরবানের দুর্গম এক ম্রো পাড়ার ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলকে যেভাবে আবার চালু করা হচ্ছে —
গতপরশু বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার পূর্বপরিচিত একজন শিক্ষকের ফোনকল পেলাম। ভীষণ হতাশার সুরে জানালেন ওই পার্বত্য জেলার আলীকদম উপজেলার নয়াপাড়া ইউনিয়নের এক দুর্গম এলাকা সাক্লান পাড়াতে একটা স্কুল অতিবর্ষণে ভেঙে পুরোপুরি মাটিতে মিশে গিয়েছে। বান্দরবানে অতিবৃষ্টি
আর বন্যায় এবার যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
অতীতে বেশ কয়েকবছর ধরে বান্দরবানের অবহেলিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভলান্টারি কাজ করতাম। ফেইসবুকে আমাকে যারা লম্বা সময় ধরে ফলো করেন, তারা হয়ত অতীতের ওইসব কাজকর্মের সাথে টুকটাক পরিচিত ছিলেন। পাহাড় আমার কাছে বিশাল মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে থাকা অনুভূতির নাম। সেইসব কাজের সূত্রে বেশকয়েকজন চেনাজানা মানুষ ছিলেন। তাদের ভেতরেরই দুইজন শিক্ষক ব্যাপারটা আমার নজরে আনলেন।
ম্রো সম্প্রদায়ের লোকজন এমনিতেই সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর একটি। খুবই দুর্গম এলাকায় বসতি তাদের। শিক্ষা ব্যাপারটাই তাদের কাছে যেন ভিন্নলোকের কোন এক বিলাসিতা!
পাহাড়ের ঢালে বাঁশ দিয়ে লোকাল অবকাঠামো দাঁড় করিয়ে ওই পাড়াতে চলে এই স্কুল। ছাত্র ৩৫ জন, শিক্ষক ২জন। বেসরকারি স্কুল যেহেতু, তাই একবার এই যাত্রা থমকে গেলে আবার যে চালু হবে সেই ব্যাপারটাও থাকে তীব্র অনিশ্চয়তায়।
আর এই স্কুলটা বন্ধ হলে, হয়তো ওই পাহাড়ি পাড়ার অধিকাংশ বাচ্চার জন্যই শিক্ষার দুয়ার সারাজীবনের জন্য বন্ধও হয়ে যেতে পারে!
খবর পাওয়ার দিনই উপজেলা সদর থেকে লোক পাঠিয়ে ওই জায়গার ডিটেইলস খোঁজ খবর নিলাম। উপজেলা সদর থেকে ওই এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাও খুবই জটিল। ঝিরিপথ পাড়ি দিয়ে লম্বা সময় ট্রেকিং করে যেতে হয় সেখানে।
এরপর বান্দরবানের ডিসির সাথে যোগাযোগ করে পুরো ঘটনাটা ব্রিফ করলাম। ডিসি সাহেবকে কিছু ইন্সট্রাকশন দেওয়ার পর উনি ভীষণ তৎপরতার সাথে কাজ এগিয়ে নিলেন। ডিসি এরপর সংশ্লিষ্ট ইউএনও-কে সাথে নিয়ে চটজলদি কাজে নেমে পড়েছেন। গতকাল রাতেই ইউএনও সাহেব লোকাল কিছু মানুষের সাথে বসে কর্মপরিকল্পনা সাজিয়ে নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছেন।
সাক্লানপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংস্কার কার্যক্রম আজকে থেকে শুরু করা হয়েছে। যেই জায়গাতে স্কুলঘরটা ছিলো, সেটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় একটু দূরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে কিছুটা ভালো জায়গায়। পাশে যাতে খেলাধুলার জায়গা থাকে, সেটাও বিবেচনায় রয়েছে। ট্রাইবাল মোটিফকে বজায় রেখে নতুন ভবনের কাজ আজ শুরু হয়েছে। বেঞ্চ, টেবিল, চেয়ার, বোর্ড থেকে শুরু করে শিক্ষকদের ফ্যাসিলিটি যোগাতে সরকারি উদ্যোগে খরচ দেওয়া হচ্ছে।
বান্দরবান জেলা প্রশাসন হতে টিআর বরাদ্দের ৮ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যার বাজার মূল্য প্রায় তিন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে কাজ শুরু হবে। তাছাড়া অতিবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হিসাবে ওই জেলায় ইতোপূর্বে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের টাকার বেচে যাওয়া টাকা থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা ওই স্কুল নির্মাণে বরাদ্দ দিয়েছে জেলা প্রশাসন। ১০ বান্ডেল কালার ৩৪মিমি টিন আজকে হস্তান্তর করা হয়েছে।
আশা করা যাচ্ছে অচিরেই দৃষ্টিনন্দন নতুন স্কুলটি প্রাণ ফিরে পাবে এবং অতি অবশ্যই অতীতের চেয়ে ভালো স্কুলঘর হবে। সবার জন্য পড়াশোনার ন্যূনতম উপকরণ নিশ্চিত করা হবে। বান্দরবানের জেলা প্রশাসক এবং আলীকদম উপজেলার ইউএনও এর কর্মতৎপরতা সত্যিই আমাকে মুগ্ধ করেছে। আর যেই মানুষগুলো কোনকিছু প্রাপ্তির আশা না করে কেবল নিজেদের এলাকাটাকে ভালোবেসে ভলান্টিয়ার হিসাবে কাজ করে যাচ্ছেন এই উদ্যোগে, তাদের প্রতিও রইলো সীমাহীন কৃতজ্ঞতা।
শুধু শহরাঞ্চল বা সুবিধাসম্পন্ন এলাকাগুলোতে কাজ করাটাই আমাদের দায়িত্ব না, বরং দুর্গম এসব এলাকায় যাদের কথা সচরাচর কেউ ভাবতে চায় না, তাদের কথা ভাবনায় রাখাটাও আমাদের সরকারের একটা ভিশন।সেটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্যই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। বাংলাদেশটা সবার হোক— সেটাই প্রত্যাশা।
-Saiyed Abdullah
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment