দীর্ঘমেয়াদি রোহিঙ্গা সংকট: শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো অঞ্চলের মানবিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ

রোহিঙ্গা, Rohingya
0


 দীর্ঘমেয়াদি রোহিঙ্গা সংকট: শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো অঞ্চলের মানবিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ

রোহিঙ্গা সংকট আর কোনো সাময়িক মানবিক সমস্যা নয়। এটি এখন দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রায় নয় বছর ধরে বাংলাদেশ দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলো এখন বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী বসতি। কিন্তু এই বোঝা শুধু বাংলাদেশের নয়—এটি পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য এক বড় মানবিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আরাগান আর্মি (এএ) এখন রাখাইনের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, যার মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তও রয়েছে। প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির কোনো বাস্তব অগ্রগতি নেই। বরং নতুন করে সংঘাত ও সহিংসতা চলছে। এর ফলে ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। অস্ত্রধারী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, চোরাচালান, মাদক ব্যবসা এবং চরমপন্থী সংযোগের আশঙ্কা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এটি শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয় নয়—সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া পর্যন্ত এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ফাঁক রয়ে গেছে। বিমসটেক বা আসিয়ানের মতো ফোরামগুলোতে রোহিঙ্গা ইস্যুকে রাজনৈতিক বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। অথচ এই সংকট সরাসরি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে। চীন ও ভারত উভয়েরই রাখাইনে কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কার্যকর চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা সীমিত। এর ফলে বাংলাদেশ একাই বোঝা বহন করছে—অর্থনৈতিক, পরিবেশগত, সামাজিক এবং নিরাপত্তাগত সব দিক থেকেই।

আন্তর্জাতিক অর্থায়নও ক্রমশ কমে আসছে। জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। ক্যাম্পে খাদ্য, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা সেবা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ বাড়ছে। সীমান্তে বেড়া নির্মাণ, নজরদারি বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নিচ্ছেন বাংলাদেশ, কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান ছাড়া এগুলো শুধু উপশম।

এই সংকটের মূল শিকড় মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও কাঠামোগত ব্যর্থতায়। রোহিঙ্গাদের পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রহীন করে তোলা হয়েছে। এখন প্রত্যাবাসন সম্ভব করতে হলে শুধু মিয়ানমার সামরিক কর্তৃপক্ষ নয়, রাখাইনের বাস্তব নিয়ন্ত্রক শক্তিগুলোর সঙ্গেও বাস্তবসম্মত আলোচনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আঞ্চলিক দেশগুলোকে এই সংকটকে নিজেদের নিরাপত্তা স্বার্থ হিসেবে দেখতে হবে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া এই সংকট শুধু বাংলাদেশকেই নয়—পুরো অঞ্চলকেই অস্থিতিশীল করে তুলবে। সময় এসেছে এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে সমন্বিত আঞ্চলিক কূটনীতি ও নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণের।

No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo