দীর্ঘমেয়াদি রোহিঙ্গা সংকট: বাংলাদেশের একার বোঝা নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জও রয়েছে
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের মুখে প্রায় সাত থেকে আট লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আজ প্রায় সাত বছর পার হয়ে গেছে, কক্সবাজার ও ভাসানচরে প্রায় দশ লাখের বেশি রোহিঙ্গা এখনও অস্থায়ী শিবিরে বসবাস করছে। এই সংকটকে শুধু "বাংলাদেশের সমস্যা" হিসেবে দেখা একটি বিপজ্জনক সরলীকরণ, কারণ এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে গোটা অঞ্চলে।
মানবিক দিক থেকে দেখলে সংকট ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে আর সমাধান আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের কোনো বাস্তব অগ্রগতি নেই। রাখাইনে চলমান গৃহযুদ্ধ, আরাকান আর্মি ও জান্তা বাহিনীর সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, ফলে যে পরিবেশে রোহিঙ্গারা নিরাপদে ফিরতে পারে, সেটাই অনুপস্থিত। এদিকে আন্তর্জাতিক তহবিল ক্রমাগত কমছে; জাতিসংঘের খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি একাধিকবার রেশন কমাতে বাধ্য হয়েছে। এক প্রজন্ম শিশু রোহিঙ্গা শিবিরেই বেড়ে উঠছে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ ছাড়াই।
নিরাপত্তার প্রশ্নটিও শুধু বাংলাদেশ সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘমেয়াদি শিবির-জীবন মানব পাচার, মাদক (বিশেষত ইয়াবা) চোরাচালান এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়োগের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে। এই নেটওয়ার্কগুলো জাতীয় সীমানা মানে না, মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত মানব পাচারের রুট বিস্তৃত। সমুদ্রপথে রোহিঙ্গাদের বিপজ্জনক যাত্রা, বিশেষত আন্দামান সাগর ও মালাক্কা প্রণালী দিয়ে, নিয়মিত মানবিক বিপর্যয় ঘটায়, যা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উপকূলীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করে।
এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা ও দায় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। রাখাইন রাজ্যের সংলগ্ন হওয়ায় এবং নিজস্ব উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে ভারত এই সংকটে নীরব দর্শক থাকতে পারে না, যদিও তার নীতি মূলত মিয়ানমারের জান্তার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক রক্ষা এবং সীমিত মানবিক সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। চীন মিয়ানমারে তার বিনিয়োগ ও প্রভাবের কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। আসিয়ান প্রাতিষ্ঠানিকভাবে "অ-হস্তক্ষেপ" নীতির কারণে জোটবদ্ধভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে, যদিও থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত। আর জাতিসংঘ ও পশ্চিমা দাতাদের মনোযোগ ইউক্রেন, গাজাসহ অন্যান্য সংকটে সরে যাওয়ায় রোহিঙ্গা ইস্যু ক্রমেই "ভুলে যাওয়া সংকটে" পরিণত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ একাই এই বোঝা বহন করছে, আর্থিক, পরিবেশগত (কক্সবাজারের বনভূমি ধ্বংস), সামাজিক (স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পদ প্রতিযোগিতা) এবং নিরাপত্তাগত, সব দিক থেকে। অথচ সমাধানের চাবিকাঠি মূলত বাংলাদেশের সীমানার বাইরে: মিয়ানমারে রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সমন্বিত কূটনৈতিক চাপ, এবং টেকসই তহবিল ব্যবস্থা। এই সংকটকে দ্বিপাক্ষিক বা স্থানীয় সমস্যা হিসেবে না দেখে যদি একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবিক অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা না হয়, তাহলে এর মূল্য একা বাংলাদেশ নয়, গোটা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকেই দীর্ঘমেয়াদে চোকাতে হবে।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।