সার্ক পুনরুজ্জীবন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্মার্ট কূটনীতি: বদলে যাওয়া দক্ষিণ এশিয়ায় ঢাকার নতুন কৌশল
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি আজ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে প্রতিবেশী দেশগুলোর পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ছে, কিন্তু রাজনৈতিক আস্থার সংকট আঞ্চলিক সহযোগিতাকে বারবার থামিয়ে দিচ্ছে। প্রায় এক-চতুর্থাংশ বিশ্ব জনসংখ্যার আবাসভূমি এই অঞ্চল এখনো বিশ্বের সবচেয়ে কম সংযুক্ত অঞ্চলগুলোর একটি। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত সার্ক একসময় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আনার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু ভারত–পাকিস্তান বৈরিতার কারণে ২০১৪ সালের পর আর কোনো শীর্ষ সম্মেলন হয়নি।
তবু সার্কের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। বরং বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এর গুরুত্ব নতুনভাবে সামনে আসছে। ভারত–পাকিস্তান সম্পর্কের টানাপোড়েন যতই গভীর হোক, সার্কই এমন একটি আঞ্চলিক কাঠামো যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশ একই টেবিলে বসতে পারে। রাজনৈতিক ইস্যুতে অগ্রগতি সম্ভব না হলেও জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা ও আঞ্চলিক যোগাযোগের মতো তুলনামূলক কম সংবেদনশীল খাতে সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
এই জায়গাতেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সার্কের প্রতিষ্ঠাতা দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শুধু সংগঠনটির পুনরুজ্জীবনের পক্ষে কথা বলতেই পারে না; বরং ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দূরত্বের মধ্যেও একটি বাস্তবসম্মত আঞ্চলিক সহযোগিতার পথ তৈরি করতে পারে। ২০২৫–২৬ সালে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মালদ্বীপের পক্ষ থেকে সার্ক পুনরুজ্জীবনের যে আগ্রহ দেখা গেছে, সেটিকে একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক উদ্যোগে রূপ দেওয়ার সুযোগ এখন ঢাকার সামনে রয়েছে।
তবে বাংলাদেশের কৌশল শুধু সার্ককেন্দ্রিক হলে চলবে না। কারণ একই সময়ে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কও একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছিল, ২০২৬ সালে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা পুনর্গঠনের চেষ্টা শুরু হয়েছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে, ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়েছে, উচ্চপর্যায়ের সফর ও যোগাযোগ হয়েছে এবং ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রাষ্ট্রীয় সফরের জন্যও বলা হচ্ছে। অর্থাৎ, সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘রিসেট’ অবস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
কিন্তু এই সম্পর্ক এখনো ভঙ্গুর। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সংখ্যালঘু ইস্যু, বাণিজ্যিক ভারসাম্য এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ—সবকিছুই ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের জন্য বড় পরীক্ষা।
বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৬-এ শেষ হওয়ার কথা। ফলে চুক্তির নবায়ন হতে পারে নতুন বাংলাদেশ সরকারের জন্য ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি। বাংলাদেশের উচিত এই আলোচনাকে আবেগ বা রাজনৈতিক উত্তেজনার জায়গায় না নিয়ে তথ্য, পানিবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক নদী আইন এবং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু বাস্তবতার ভিত্তিতে পরিচালনা করা।
এখানেই প্রয়োজন বাংলাদেশের ‘স্মার্ট কূটনীতি’।
স্মার্ট কূটনীতি মানে ভারতের সঙ্গে সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়। আবার প্রতিটি মতপার্থক্যকে ভারতবিরোধী অবস্থানে রূপান্তর করাও নয়। এর অর্থ হলো—যেখানে সহযোগিতা সম্ভব সেখানে সহযোগিতা, যেখানে জাতীয় স্বার্থ জড়িত সেখানে দৃঢ় দর-কষাকষি, আর একই সঙ্গে বিকল্প অংশীদার তৈরি করা।
বাংলাদেশের চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, পাকিস্তান এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো তাই স্বাভাবিক পররাষ্ট্রনীতির অংশ হতে পারে। কিন্তু এই বহুমুখীকরণকে ভারতের বিরুদ্ধে কোনো কৌশল হিসেবে উপস্থাপন করা হলে তা আস্থার সংকট বাড়াতে পারে। বরং ঢাকার বার্তা হওয়া উচিত—বাংলাদেশ কারও বলয়ে যাচ্ছে না; বাংলাদেশ নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে।
এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানই বাংলাদেশের কৌশলগত সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
একইভাবে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত না করে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো জরুরি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, যৌথ নদী কমিশন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, বাণিজ্যিক সংস্থা ও নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের মৌলিক কাঠামো বদলে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে।
আর সার্কের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের কৌশল হতে হবে বাস্তববাদী। এখনই ভারত–পাকিস্তানের মধ্যে বড় রাজনৈতিক সমঝোতা হবে—এমন প্রত্যাশা অবাস্তব। তাই শীর্ষ সম্মেলনের জন্য অপেক্ষা না করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু, খাদ্য নিরাপত্তা ও শিক্ষা নিয়ে ছোট আকারের আঞ্চলিক প্রকল্প শুরু করা যেতে পারে। কয়েকটি দেশ চাইলে একসঙ্গে এগিয়ে যাবে, অন্য দেশগুলো পরে যুক্ত হতে পারবে।
বাংলাদেশ একই সঙ্গে সার্ক ও বিমসটেক—দুই প্ল্যাটফর্মেই সক্রিয় থাকতে পারে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা এখন এমন যে, একটি আঞ্চলিক কাঠামো দিয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বিমসটেক যেমন বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করে, সার্ক তেমন দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশকে একই কাঠামোর মধ্যে রাখে।
অতএব, বাংলাদেশের কূটনৈতিক লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো একটি জোটের দিকে ঝুঁকে পড়া নয়; বরং একাধিক প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে নিজের অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও কৌশলগত পরিসর বাড়ানো।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর নীতি হতে পারে—ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কিন্তু নির্ভরশীলতা নয়; চীনের সঙ্গে অংশীদারিত্ব, কিন্তু কৌশলগত নির্ভরতা নয়; সার্কের পক্ষে অবস্থান, কিন্তু বাস্তবতার বাইরে নয়।
দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূরাজনীতিতে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর মাঝখানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতা। এই তিনটিকে সমন্বিত করতে পারলে বাংলাদেশ শুধু ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ই তৈরি করতে পারবে না, বরং সার্কের মতো অচল হয়ে পড়া আঞ্চলিক কাঠামোকেও ধীরে ধীরে কার্যকর করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারে।
এটাই হতে পারে বাংলাদেশের স্মার্ট কূটনীতির মূল দর্শন—কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে নয়, বরং নিজের জাতীয় স্বার্থের পক্ষে।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment