পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ভারতে বসবাসকারী কয়েকজন চাকমার চক্রান্ত: ইতিহাসের নামে সীমানা ভাঙার দিবাস্বপ্ন
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু মহল থেকে করা হচ্ছে চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র। আর এ রাজনৈতিক চক্রান্তটা করছে ভারতে বসবাসকারী কয়েকজন চাকমা নেতা। তারা ১৯৪৭ সালের ক্ষোভকে অস্ত্র বানিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর আঘাত হানতে চাইছেন।
১৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে অসমের সংবাদমাধ্যম DY365 জানায়, ভারতীয় চাকমা নেতারা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের দাবি—রেডক্লিফ কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামকে “অবৈধভাবে” পূর্ব পাকিস্তানে দিয়েছিল, তাই এলাকাটি এখন ভারতের অংশ হওয়া উচিত। পরদিন টাইমস অব ইন্ডিয়া একই বক্তব্য তুলে ধরে শিরোনাম করে: Chakmas call for Chittagong Hill Tracts’ inclusion in India।
আর এর পেছনে যারা রয়েছে তারা হলেন রসিক মোহন চাকমা—মিজোরাম বিধানসভার সদস্য, অধ্যাপক গৌতম চাকমা—হিউম্যানিটি প্রোটেকশন ফোরামের সভাপতি, প্রীতিময় চাকমা—অরুণাচলের চাকমা-হাজং এল্ডার্স ফোরাম, আরেকজন হলেন সুহাস চাকমা—চাকমা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা। এরা কেউ বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত কোনো চাকমা প্রতিনিধি নন। অথচ এরা ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশের ভূখণ্ড নিয়ে ষড়যন্ত্র করছেন।
এখানেই বিশ্বাসঘাতকতার শেষ নয়। যে রাষ্ট্র তাদের আশ্রয় দিয়েছে, নাগরিকত্ব দিয়েছে, সংসদ ও মন্ত্রিত্ব পর্যন্ত দিয়েছে—সেই বাংলাদেশের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে তারা প্রতিবেশী দেশের রাজধানী ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে বিষোদগার করছেন। অন্যদিকে ভারতেই চাকমাদের নাগরিকত্ব এখনো অসম্পূর্ণ। অরুণাচল প্রদেশে হাজার হাজার চাকমা এখনো পূর্ণ ভোটাধিকার ও নাগরিক স্বীকৃতি পাননি। নিজেদের অধিকারহীনতার ক্ষোভ ঢাকতে তারা অন্য দেশের সীমানা নিয়ে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে সুহাস চাকমার যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে তখন অমুসলিম ছিল প্রায় ৯৮.৫ শতাংশ, তাই এলাকাটি ভারতে যাওয়া উচিত ছিল। তিনি মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা ও Indian Independence Act-এর উল্লেখ করে ICJ-তে যাওয়ার কথা বলেন। DY365 পরবর্তী এক প্রতিবেদনে জানায়, একই নেতারা ভারত সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন—বাংলাদেশে ডিজেল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করতে। অর্থাৎ দাবিটির মাধ্যমে তারা জ্বালানি সরবরাহকে অস্ত্র বানাতে চাইছেন।
এ মুহূর্তে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট রয়েছে। ঢাকা ভারতের কাছে অতিরিক্ত ডিজেল চেয়েছে। ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন দিয়ে বার্ষিক প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল যায়। আদানি গ্রুপের গোড্ডা কেন্দ্র থেকেও বিদ্যুৎ আসে। এই মুহূর্তে “সরবরাহ বন্ধ করো” বলা মানে কূটনৈতিক চাপ তৈরি করা। চাকমা অধিকার রক্ষা নয়—এটি সম্পর্ক উত্তপ্ত করার রাজনীতি।
ইতিহাসের যে অংশ তারা ব্যবহার করেন, তা আংশিক সত্য। ১৫ আগস্ট ১৯৪৭-এ রাঙামাটিতে ভারতীয় পতাকা ওঠে। ১৭ আগস্ট রেডক্লিফ অ্যাওয়ার্ড পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব পাকিস্তানে দেয়। চট্টগ্রাম বন্দরের পশ্চাদ্ভূমি ও জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনার যুক্তিতে সিদ্ধান্ত হয়। অনেক চাকমা একে অন্যায় মনে করেন। প্রতি বছর ১৭ আগস্ট মিজোরামে “চাকমা ব্ল্যাক ডে” পালিত হয়। টাইমস অব ইন্ডিয়া ১৭ আগস্টের আরেক প্রতিবেদনে সেই কর্মসূচির কথাও লিখেছে।
কিন্তু ক্ষোভ আর রাষ্ট্রভাঙার দাবি এক জিনিস নয়। রেডক্লিফ অ্যাওয়ার্ড ১৯৪৭ সালের আইনের অংশ। ভারত ও পাকিস্তান সীমানা মেনে নিয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর সেই সীমানাই বহাল আছে। ১৯৭৪ ও ২০১৫ সালের স্থলসীমানা চুক্তিতে দুই দেশ সীমানা চূড়ান্ত করেছে। ICJ কোনো পক্ষের সম্মতি ছাড়া ৭৯ বছর আগের মানচিত্র মুছে দিতে পারে না। ভারত সরকারও এই দাবি তোলেনি। তাই “আদালতে যাব” বলা আইনি পথ নয়—প্রচারণার হুমকি।
চক্রান্তের ধরন এখানেই- প্রথমে ১৯৪৭-কে “অবৈধ” বলে আন্তর্জাতিক সহানুভূতি আদায়। তারপর পার্বত্য চুক্তির অসম্পূর্ণতাকে “নিপীড়ন” হিসেবে উপস্থাপন। তারপর ইউপিডিএফ-সহ বিচ্ছিন্নতাবাদী বয়ানের সঙ্গে সুর মেলানো। শেষে ভারতের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধের দাবি তুলে ঢাকার ওপর চাপ তৈরি। এটি ধাপে ধাপে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অখণ্ডতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা।
বাংলাদেশে চাকমা জনগোষ্ঠী সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও স্থানীয় প্রশাসনে আছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ—এসব কাঠামো সেই বাস্তবতার অংশ। সেই বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে ভারতের মাটিতে বসে “পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতে যুক্ত হোক” বলা হলো বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, যার নাগরিক হিসেবে তারা বা তাদের পূর্বপুরুষেরা অধিকার ভোগ করেছেন কিংবা আশ্রয় পেয়েছেন।
ভারতীয় পত্রিকার বয়ানও দুই মুখো। একদিকে তারা নেতাদের দাবি হুবহু ছাপাচ্ছে—“illegal award”, “inclusion in India”, ICJ। অন্যদিকে দিল্লির এমন কোনো আইনি ও নৈতিক শক্তি নেই নেই যে সীমানা খুলবে। অর্থাৎ সংবাদমাধ্যম একটি প্রান্তিক দাবিকে শিরোনাম দিয়ে বড় করে তুলছে, আর সেই শিরোনামই উসকানি হিসেবে কাজ করছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কয়েকজন ভারতীয় চাকমা নেতার দিবাস্বপ্নে ভূগোল বদলাবে না। কিন্তু তাদের বয়ান পার্বত্য অঞ্চলে অস্থিরতা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বিষাক্ত ছায়া ফেলতে পারে। ইতিহাসের স্মৃতি আওড়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে স্বপ্ন দেখা রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব। আর যাই হোক-বাপ দাদারা যে মাটিতে বড় হয়েছে তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করা কোনো ভালো মানুষের কাজ নয়।
TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment