ভারত কি আসলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে?
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত নাকি “দুইবার আমন্ত্রণ” জানিয়েছে, গত কয়েকদিন ধরে ভারতের কিছু গণমাধ্যম এবং বাংলাদেশের দ্য ডেইলি স্টারে এমন একটি বয়ান বেশ জোরেশোরে প্রচার করা হচ্ছে। শুনলে মনে হয়, ভারত যেন বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে মরিয়া। কিন্তু ঘটনাগুলো একটু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়, “দুইবার আমন্ত্রণ” কথাটির আড়ালে বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক আখ্যানই বেশি।
প্রথম আমন্ত্রণটি আসে তারেক রহমানের শপথের পর। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি চিঠি লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ঢাকায় এসে পৌঁছে দেন। চিঠিতে নির্বাচনী বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে তারেক রহমান, তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানকে সুবিধাজনক সময়ে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু এখানে ছিল না কোনো নির্দিষ্ট তারিখ, সফরসূচি, আলোচনার বিষয় কিংবা দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কাঠামো। অর্থাৎ এটি ছিল প্রচলিত কূটনৈতিক সৌজন্যের একটি চিঠি। এটিকে বিশেষ রাজনৈতিক উদ্যোগ বা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণ হিসেবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করার সুযোগ খুবই সীমিত।
দ্বিতীয় “আমন্ত্রণ” আরও স্পষ্টভাবে ভিন্ন প্রকৃতির। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আমন্ত্রণ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর জন্য আলাদাভাবে নয়। তিনি তখন বিমসটেকের চেয়ারম্যান। আর ব্রিকসের আউটরিচ সেশনে আঞ্চলিক জোটের প্রধানদের আমন্ত্রণ জানানো একটি প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া। অর্থাৎ সেখানে ব্যক্তি তারেক রহমান মুখ্য নন, পদটিই মুখ্য।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানও বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আমন্ত্রণটি তারেক রহমানকে ব্যক্তিগতভাবে নয়, বিমসটেকের চেয়ারম্যান পদাধিকারীকে দেওয়া হয়েছে। এমনকি তিনি সাংবাদিকদের দুই আমন্ত্রণের পার্থক্য বোঝার আহ্বান জানিয়েছেন। তাহলে প্রশ্ন হলো, যেখানে বাংলাদেশ সরকার নিজেই বলছে দ্বিতীয় আমন্ত্রণটি পদাধিকারবলে, সেখানে সেটিকে “ভারতের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে দ্বিতীয়বার বিশেষ আমন্ত্রণ” হিসেবে প্রচার করার উদ্দেশ্য কী?
এখানেই পুরো বয়ানের রাজনৈতিক চরিত্র স্পষ্ট হয়। একটি সাধারণ সৌজন্যপত্র এবং একটি বহুপাক্ষিক সম্মেলনের প্রাতিষ্ঠানিক আমন্ত্রণকে জোড়া দিয়ে “ভারত দুইবার দাওয়াত দিয়েছে” বলা মূলত একটি ইমেজ তৈরির চেষ্টা। যেন ভারত সম্পর্কের বরফ গলাতে ব্যস্ত, আর বাংলাদেশই শুধু সাড়া দিচ্ছে না।
অথচ একই সময়ে শেখ হাসিনা ভারত থেকে বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন, এবং তাঁকে প্রত্যর্পণের বাংলাদেশের বারবার অনুরোধেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বাংলাদেশের জন্য এই ঘটনাগুলো নিছক কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় নয়, এগুলো সার্বভৌমত্ব, বিচার এবং পারস্পরিক আস্থার প্রশ্ন।
তাই “দুইবার আমন্ত্রণ” নিয়ে উচ্ছ্বাস ছড়ানোর আগে বাস্তবতাটা দেখা দরকার। আমন্ত্রণের সংখ্যা দিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের উষ্ণতা মাপা যায় না। একটি সত্যিকারের অর্থবহ রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণের সঙ্গে থাকে স্পষ্ট উদ্দেশ্য, নির্দিষ্ট কর্মসূচি, পারস্পরিক স্বার্থের আলোচনা এবং সম্মানজনক কূটনৈতিক উদ্যোগ। এসব বাদ দিয়ে রুটিন আমন্ত্রণকে বিশেষ সৌহার্দ্যের প্রমাণ বানানো হলে সেটি কূটনীতি নয়, নিছক রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণ।

TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment