প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত কি আসলে "দুইবার আমন্ত্রণ": জানিয়েছে?
কয়েকদিন ধরে ভারতের কিছু গণমাধ্যম আর বাংলাদেশের দ্য ডেইলি স্টারে একটা কথা বারবার ঘুরেফিরে আসছে — বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত নাকি দুইবার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। কথাটা শুনতে আন্তরিক লাগে, যেন প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত সত্যিই সম্পর্কের বরফ গলাতে উদগ্রীব। কিন্তু এই "দুইবার আমন্ত্রণ" শব্দবন্ধের আড়ালে যে বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, সেটা একটু খুঁটিয়ে দেখলেই ধরা পড়ে যায় পুরো গল্পটার ফাঁকিবাজি।
প্রথম আমন্ত্রণটির কথা বলা যাক। গত ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান শপথ নেওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একটি চিঠি পাঠান, যা লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা স্বয়ং ঢাকায় এসে হস্তান্তর করেন। চিঠিতে নির্বাচনী বিজয়ে অভিনন্দন জানানো হয় এবং তারেক রহমান, তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানকে "সুবিধাজনক সময়ে" ভারত ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানানো হয়। শুনতে চমৎকার। কিন্তু লক্ষ করুন — এখানে কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নেই, কোনো সূচি নেই, কোনো আলোচ্যসূচি নেই। এটি নিছক একটি কূটনৈতিক সৌজন্যপত্র, যা যেকোনো নতুন সরকারপ্রধানের কাছে পাঠানো হয় রীতি মেনে। এর মধ্যে বিশেষ কোনো উষ্ণতা খোঁজা মূলত নিজের মনের মাধুরী মেশানো।
দ্বিতীয় "আমন্ত্রণ" নিয়েই আসল কারসাজি। গত ৪ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাংবাদিক ব্রিফিংয়ে জানান, তারেক রহমানকে সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় অষ্টাদশ ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কিন্তু কীসের ভিত্তিতে? জয়সওয়াল নিজের মুখেই স্পষ্ট করে বলেছেন — বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে। তাঁর নিজের ভাষায়, ব্রিকসের আউটরিচ সেশনে আঞ্চলিক জোটপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানানো একটি প্রতিষ্ঠিত রীতি, এবং অন্য আঞ্চলিক জোটগুলোর প্রধানদেরও একই কায়দায় ডাকা হয়েছে। অর্থাৎ এটি বাংলাদেশের প্রতি কোনো বিশেষ সৌজন্য নয়, এটি একটি রুটিন প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, যা বিমসটেকের চেয়ারের পদে যিনিই বসতেন তাঁর কাছেই যেত।
সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, খোদ বাংলাদেশ সরকারই এই ফাঁকিটা ধরিয়ে দিয়েছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের সরাসরি বলেছেন, বিমসটেকের আমন্ত্রণ তারেক রহমানকে ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া হয়নি, বরং বিমসটেকের চেয়ারপার্সন পদাধিকারীকে সম্বোধন করে দেওয়া হয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের এই দুই আমন্ত্রণের মধ্যকার পার্থক্য বোঝারও অনুরোধ জানান। এমনকি তারেক রহমান আদৌ দিল্লি যাবেন কিনা, সে সিদ্ধান্তও তখনো নেওয়া হয়নি। তাহলে প্রশ্ন জাগে — যেখানে বাংলাদেশ সরকার নিজেই বলছে এটা প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া আমন্ত্রণ নয়, সেখানে "দুইবার দাওয়াত দেওয়া হয়েছে" বলে যে উষ্ণতার আখ্যান তৈরি করা হচ্ছে, তার ভিত্তি কোথায়?
একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে সত্যিকারের রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণ জানাতে হলে যা যা লাগে — একটা সুনির্দিষ্ট সূচি, আলোচনার নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু, স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে পারস্পরিক আশ্বস্ততা, এবং সবচেয়ে জরুরি, একটা যথাযথ কূটনৈতিক চ্যানেলে সেই আমন্ত্রণ পৌঁছানো — এসবের কোনোটাই এই ঘটনায় নেই। ভারত পুরোনো দাদাগিরি স্টাইলেই থেকে গেছে, যেন প্রতিবেশীর বাড়িতে দায়সারা ভাবে বলা "ভাই, আসিয়েন বাসায়"-এর মতো একটা কথা বলে দিলেই দায়িত্ব শেষ। অথচ আমাদের প্রধানমন্ত্রী কি শুধু ছবি তোলার জন্য সেখানে যাবেন?
এই সৌজন্যের প্রশ্নটা আরও তীব্র হয় যখন একই সময়ে ঘটে যাওয়া অন্য ঘটনাগুলোর দিকে তাকাই। গত ৫ আগস্ট, জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনেই, শেখ হাসিনা নয়াদিল্লি থেকে ভার্চুয়ালি মিডিয়ার সঙ্গে মতবিনিময় করেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদদের প্রতি চরম অসম্মান। ভারত অবশ্য দায় এড়িয়ে বলেছে এটি এক বেসরকারি মিডিয়া সংস্থার আয়োজিত অনুষ্ঠান মাত্র, সরকারের এতে কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় — কোন দেশ তার মাটিতে একজন পলাতক, গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রকাশ্যে মিডিয়ার সামনে কথা বলার সুযোগ দেয়, অথচ একই সময়ে আরেক দেশের বৈধ প্রধানমন্ত্রীকে "রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণ" নামে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রুটিন চিঠি পাঠিয়ে সৌজন্যের ভান করে?
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রত্যর্পণ চুক্তির প্রশ্নটিও। বাংলাদেশ বারবার ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে, কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি বলে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। একদিকে বিচারাধীন এক আসামিকে আশ্রয় দিয়ে তার প্রচার-প্রচারণার সুযোগ করে দেওয়া, অন্যদিকে সেই একই সময়ে "আমন্ত্রণ, আমন্ত্রণ" বলে সৌহার্দ্যের বয়ান তৈরি করা — এই দ্বিচারিতাই ভারতের প্রকৃত অবস্থানকে স্পষ্ট করে দেয়।
আর এই পুরো গল্পটাকে আরও জোরেশোরে প্রচার করছে ভারতের ডেইলি হান্ট ধরনের প্ল্যাটফর্মগুলো, যেগুলো বাংলাদেশ সম্পর্কে সংবেদনশীল বিষয়ে প্রায়ই একপেশে ও উত্তেজনা-সৃষ্টিকারী বয়ান ছড়ানোর জন্য পরিচিত। একটা প্রাতিষ্ঠানিক রুটিন আমন্ত্রণকে "দুইবার দাওয়াত" নাম দিয়ে সেটাকে সৌহার্দ্যের প্রতীক বানিয়ে তোলা, আসলে একটা সুপরিকল্পিত ভাবমূর্তি নির্মাণের কৌশল — যেখানে বাস্তবতার চেয়ে আখ্যান তৈরির কাজটাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
সত্যি বলতে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ যা প্রত্যাশা করে তা হলো সম্মানজনক, সমতাভিত্তিক আচরণ — নিছক কূটনৈতিক সৌজন্যের মোড়কে মোড়ানো একতরফা আধিপত্যবাদী মনোভাব নয়। যতক্ষণ না ভারত তার মাটিতে আশ্রিত পলাতক আসামির রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করবে, প্রত্যর্পণের অনুরোধে সাড়া দেবে, এবং প্রকৃত অর্থে একটি সুনির্দিষ্ট, সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণ জানাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত "দুইবার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে" গোছের প্রচারণা নিছকই একটি রাজনৈতিক আখ্যান তৈরির কৌশল হয়ে থাকবে — বাস্তব সৌহার্দ্যের প্রতিফলন নয়।

TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment