কলকাতা থেকে দিল্লি, কোথাও নিরাপদ নয় বাংলাদেশিরা- ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারতে, বিশেষ করে কলকাতায়, বাংলাদেশীদের যাতায়াত কিছুদিন প্রায় বন্ধ ছিল। কয়েক দিন পরই দেখা গেল, বাংলাদেশী পর্যটক না আসায় হায়-হায় রব উঠেছে গোটা পশ্চিমবঙ্গে। হোটেল-মোটেল খালি, দোকান-মল বন্ধপ্রায়, এমনকি কর্মচারীদের বেতন পর্যন্ত দিতে পারছেন না কলকাতার ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশীরা আবার আসছেন—এমন খবর ছড়াতেই শুরু হলো উৎসব। চলল মিষ্টিমুখ করানো। অতিথিকে ভগবান মনে করা ভারতীয়রা বাংলাদেশীদের আমন্ত্রণ জানাতে কম কিছু করেননি। এরপর বাংলাদেশীরা যখন আবার কলকাতায় যাতায়াত শুরু করলেন, তখনই খবর এলো—কলকাতার নিউ মার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে মারা গেছেন নয় বাংলাদেশী। যে হোটেলে আগুন লেগে এতগুলো বাংলাদেশীর প্রাণ গেল, সেটি ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তর থেকে একেবারে ঢিলছোড়া দূরত্বে। এমন একটি জায়গায় আগুন কীভাবে এতটা ছড়িয়ে পড়ল, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিতও দিচ্ছেন। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, হোটেলটিতে জরুরি ভিত্তিতে আগুন নেভানোর মতো পর্যাপ্ত পানি কিংবা আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। সরু সিঁড়ি ও ঘিঞ্জি পরিবেশের মধ্যে পাঁচতলা ভবনের প্রতিটি তলায় আলাদা আলাদা হোটেল চালানো হচ্ছিল। অর্থাৎ একেবারে খোয়ারের মতো অবস্থা। বাংলাদেশী নামক ‘টাকার জাহাজ’রা আসবে, টাকা দিয়ে চলে যাবে—তাদের নিরাপত্তারই বা কী দরকার? ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় নয় বাংলাদেশী মারা গেছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, মৃতদের মধ্যে চার বছরের একটি শিশুও রয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি আছেন আরও ১৫ জন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, হোটেল থেকে ধোঁয়া বের হওয়ার পথ এতটাই সংকীর্ণ ছিল যে আগুন লাগার পর হুড়োহুড়িতেই অনেকে আটকা পড়েন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দল ছুটে যায়। কিন্তু সিঁড়িতে জমে থাকা ঘন ধোঁয়ার কারণে ওপরের তলায় পৌঁছাতেই তাদের বেগ পেতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন কলকাতা পুলিশের এক কর্মকর্তা। প্রশ্ন উঠেছে—ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তরের এত কাছে থাকা একটি হোটেলে আগুন নিয়ন্ত্রণে এত দেরি হলো কেন? এখানে আরেকটি তথ্য বলে রাখা জরুরি। এই অগ্নিকাণ্ডের মাত্র দুই দিন আগে, গত ১৭ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের তারাপীঠে ‘হোটেল বিদেশিনী’ নামের আরেকটি হোটেলে আগুন লেগে মারা গিয়েছিলেন আটজন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মেঘালয়ের একই পরিবারের পাঁচজন। অর্থাৎ মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে পশ্চিমবঙ্গে পরপর দুটি হোটেলে আগুন লেগে ১৭ জন মানুষ পুড়ে মারা গেলেন। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি রাজ্যের হোটেল ব্যবস্থাপনায় এত বড় গাফিলতি থাকে কীভাবে? আসলে বাংলাদেশীদের সঙ্গে এমন আচরণ নতুন কিছু নয়। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশী পরিচয়টাই যেন একরকম সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের মার্চে লালমনিরহাটের বুড়িমারী সীমান্ত দিয়ে ভারতের চ্যাংড়াবান্ধায় ছেলের স্কুল থেকে ফিরতে গিয়ে হয়রানির শিকার হন ঢাকার এক বাসিন্দা। মিথ্যা অভিযোগ তুলে তাঁকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। তাঁকে ‘জামায়াতি সন্ত্রাসী’ বলে গালিগালাজ করা হয়। এমনকি ক্ষমা না চাইলে দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না বলেও শাসানো হয়। শেষমেশ বিকেলে তাঁকে ফেরত পাঠানো হয় ঠিকই, কিন্তু ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আসতে পারেননি তিনি। এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। সীমান্তবর্তী এলাকায় বাংলাদেশী পরিচয় পেলেই অকারণে জিজ্ঞাসাবাদ, দীর্ঘ সময় আটকে রাখা কিংবা অপমানজনক আচরণের অভিযোগ প্রায়ই উঠে আসে সংবাদমাধ্যমে। শুধু সীমান্তে হয়রানি নয়, এর আগে ঘোষণা দিয়ে হোটেলের দরজাও বন্ধ করা হয়েছে বাংলাদেশীদের জন্য। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার হোটেল মালিক সমিতি ঘোষণা দেয়, বাংলাদেশী পর্যটকদের কক্ষ ভাড়া দেওয়া হবে না। এক বছর পর, গত ডিসেম্বরে, সেই বয়কট আরও কঠোর রূপ নেয়। শিলিগুড়িসহ উত্তরবঙ্গের তিন জেলার হোটেল মালিক সংগঠন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়, তাদের আওতাধীন প্রায় ২৩০টি হোটেলে বাংলাদেশীদের জন্য থাকবে ‘নো এন্ট্রি’। দেয়ালে দেয়ালে সাঁটানো হয় নোটিশ। আগে চিকিৎসা কিংবা পড়াশোনার প্রয়োজনে আসা মানুষদের জন্য কিছুটা ছাড় থাকলেও সেই সুযোগও একে একে তুলে নেওয়া হয়। সংগঠনের নেতারা এর পেছনে কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন বাংলাদেশে ভারতবিরোধী বক্তব্য এবং ভিসা কেন্দ্র বন্ধের প্রসঙ্গ। এবার সেসব ছাড়িয়ে ভারতে গিয়ে প্রাণনাশ হচ্ছে বাংলাদেশীদের। খেলার মাঠেও বাংলাদেশীবিদ্বেষ চরমে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের নিলামে কলকাতা নাইট রাইডার্স প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি রুপি খরচ করে বাংলাদেশের তারকা পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে দলে নিয়েছিল। সেবারের নিলামে বাছাই হওয়া একমাত্র বাংলাদেশী ক্রিকেটার ছিলেন তিনি। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই ভারতের কট্টর একটি অংশের চাপে বিসিসিআই নির্দেশ দেয়, মুস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দিতে হবে। কারণ হিসেবে দেখানো হয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ ও পরিস্থিতির কথা। অথচ যুক্তিসংগত কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই একজন ক্রিকেটারকে এভাবে বাদ দেওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হয়েছে। ভারতের ক্রিকেট মহলেও অনেকে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশের একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা একটি দেশ পুরো একটি টুর্নামেন্টে বিদেশি দলগুলোর নিরাপত্তা কীভাবে দেবে? সংস্কৃতির অঙ্গনেও একই রকম অস্বস্তির খবর এসেছে বারবার। বাংলাদেশে আসতে চাওয়া ভারতীয় শিল্পীদের অনুষ্ঠান শেষ মুহূর্তে আটকে যাওয়ার ঘটনা যেমন ঘটেছে, তেমনি সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশী পরিচয় নিয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পরিচিত মুখদেরও নানা সময়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা, বাড়তি জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা সন্দেহের চোখে দেখার অভিজ্ঞতার কথা অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেছেন। একটার পর একটা ঘটনা মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এগুলো সব বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং একটি প্যাটার্ন। বাংলাদেশীরা ভারতে গেলে এতটা অনিরাপদ বোধ করবেন কেন? ইউরোপ কিংবা আমেরিকার পর্যটকদের ক্ষেত্রে তো এমন হোটেল বয়কট, সীমান্তে হয়রানি কিংবা খেলার মাঠ থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা ঘটে না। তাহলে বাংলাদেশীদের বেলায় ব্যতিক্রম কেন? নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে একটি হোটেল কীভাবে অতিথি নেয়, সেই জবাবদিহিতাও কারও কাছে নেই। আর কূটনৈতিক পর্যায়ে ভারত যখন বারবার তারেক রহমান ও বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে কথা বলছে, তখন সাধারণ বাংলাদেশী পর্যটক, শ্রমিক বা রোগীর নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব আসলে কার—সেই প্রশ্নেরও কোনো স্পষ্ট জবাব এখনো নেই। অতিথি যদি সত্যিই ভগবান হন, তাহলে কলকাতায় সেই অতিথির জীবনের দাম এত সস্তা কেন?
কলকাতা থেকে দিল্লি, কোথাও নিরাপদ নয় বাংলাদেশিরা-
কলকাতা থেকে দিল্লি, কোথাও নিরাপদ নয় বাংলাদেশিরা- ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারতে, বিশেষ করে কলকাতায়, বাংলাদেশীদের যাতায়াত কিছুদিন প্রায় বন্ধ ছিল। কয়েক দিন পরই দেখা গেল, বাংলাদেশী পর্যটক না আসায় হায়-হায় রব উঠেছে গোটা পশ্চিমবঙ্গে। হোটেল-মোটেল খালি, দোকান-মল বন্ধপ্রায়, এমনকি কর্মচারীদের বেতন পর্যন্ত দিতে পারছেন না কলকাতার ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশীরা আবার আসছেন—এমন খবর ছড়াতেই শুরু হলো উৎসব। চলল মিষ্টিমুখ করানো। অতিথিকে ভগবান মনে করা ভারতীয়রা বাংলাদেশীদের আমন্ত্রণ জানাতে কম কিছু করেননি। এরপর বাংলাদেশীরা যখন আবার কলকাতায় যাতায়াত শুরু করলেন, তখনই খবর এলো—কলকাতার নিউ মার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে মারা গেছেন নয় বাংলাদেশী। যে হোটেলে আগুন লেগে এতগুলো বাংলাদেশীর প্রাণ গেল, সেটি ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তর থেকে একেবারে ঢিলছোড়া দূরত্বে। এমন একটি জায়গায় আগুন কীভাবে এতটা ছড়িয়ে পড়ল, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিতও দিচ্ছেন। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, হোটেলটিতে জরুরি ভিত্তিতে আগুন নেভানোর মতো পর্যাপ্ত পানি কিংবা আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। সরু সিঁড়ি ও ঘিঞ্জি পরিবেশের মধ্যে পাঁচতলা ভবনের প্রতিটি তলায় আলাদা আলাদা হোটেল চালানো হচ্ছিল। অর্থাৎ একেবারে খোয়ারের মতো অবস্থা। বাংলাদেশী নামক ‘টাকার জাহাজ’রা আসবে, টাকা দিয়ে চলে যাবে—তাদের নিরাপত্তারই বা কী দরকার? ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় নয় বাংলাদেশী মারা গেছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, মৃতদের মধ্যে চার বছরের একটি শিশুও রয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি আছেন আরও ১৫ জন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, হোটেল থেকে ধোঁয়া বের হওয়ার পথ এতটাই সংকীর্ণ ছিল যে আগুন লাগার পর হুড়োহুড়িতেই অনেকে আটকা পড়েন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দল ছুটে যায়। কিন্তু সিঁড়িতে জমে থাকা ঘন ধোঁয়ার কারণে ওপরের তলায় পৌঁছাতেই তাদের বেগ পেতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন কলকাতা পুলিশের এক কর্মকর্তা। প্রশ্ন উঠেছে—ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তরের এত কাছে থাকা একটি হোটেলে আগুন নিয়ন্ত্রণে এত দেরি হলো কেন? এখানে আরেকটি তথ্য বলে রাখা জরুরি। এই অগ্নিকাণ্ডের মাত্র দুই দিন আগে, গত ১৭ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের তারাপীঠে ‘হোটেল বিদেশিনী’ নামের আরেকটি হোটেলে আগুন লেগে মারা গিয়েছিলেন আটজন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মেঘালয়ের একই পরিবারের পাঁচজন। অর্থাৎ মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে পশ্চিমবঙ্গে পরপর দুটি হোটেলে আগুন লেগে ১৭ জন মানুষ পুড়ে মারা গেলেন। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি রাজ্যের হোটেল ব্যবস্থাপনায় এত বড় গাফিলতি থাকে কীভাবে? আসলে বাংলাদেশীদের সঙ্গে এমন আচরণ নতুন কিছু নয়। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশী পরিচয়টাই যেন একরকম সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের মার্চে লালমনিরহাটের বুড়িমারী সীমান্ত দিয়ে ভারতের চ্যাংড়াবান্ধায় ছেলের স্কুল থেকে ফিরতে গিয়ে হয়রানির শিকার হন ঢাকার এক বাসিন্দা। মিথ্যা অভিযোগ তুলে তাঁকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। তাঁকে ‘জামায়াতি সন্ত্রাসী’ বলে গালিগালাজ করা হয়। এমনকি ক্ষমা না চাইলে দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না বলেও শাসানো হয়। শেষমেশ বিকেলে তাঁকে ফেরত পাঠানো হয় ঠিকই, কিন্তু ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আসতে পারেননি তিনি। এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। সীমান্তবর্তী এলাকায় বাংলাদেশী পরিচয় পেলেই অকারণে জিজ্ঞাসাবাদ, দীর্ঘ সময় আটকে রাখা কিংবা অপমানজনক আচরণের অভিযোগ প্রায়ই উঠে আসে সংবাদমাধ্যমে। শুধু সীমান্তে হয়রানি নয়, এর আগে ঘোষণা দিয়ে হোটেলের দরজাও বন্ধ করা হয়েছে বাংলাদেশীদের জন্য। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার হোটেল মালিক সমিতি ঘোষণা দেয়, বাংলাদেশী পর্যটকদের কক্ষ ভাড়া দেওয়া হবে না। এক বছর পর, গত ডিসেম্বরে, সেই বয়কট আরও কঠোর রূপ নেয়। শিলিগুড়িসহ উত্তরবঙ্গের তিন জেলার হোটেল মালিক সংগঠন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়, তাদের আওতাধীন প্রায় ২৩০টি হোটেলে বাংলাদেশীদের জন্য থাকবে ‘নো এন্ট্রি’। দেয়ালে দেয়ালে সাঁটানো হয় নোটিশ। আগে চিকিৎসা কিংবা পড়াশোনার প্রয়োজনে আসা মানুষদের জন্য কিছুটা ছাড় থাকলেও সেই সুযোগও একে একে তুলে নেওয়া হয়। সংগঠনের নেতারা এর পেছনে কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন বাংলাদেশে ভারতবিরোধী বক্তব্য এবং ভিসা কেন্দ্র বন্ধের প্রসঙ্গ। এবার সেসব ছাড়িয়ে ভারতে গিয়ে প্রাণনাশ হচ্ছে বাংলাদেশীদের। খেলার মাঠেও বাংলাদেশীবিদ্বেষ চরমে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের নিলামে কলকাতা নাইট রাইডার্স প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি রুপি খরচ করে বাংলাদেশের তারকা পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে দলে নিয়েছিল। সেবারের নিলামে বাছাই হওয়া একমাত্র বাংলাদেশী ক্রিকেটার ছিলেন তিনি। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই ভারতের কট্টর একটি অংশের চাপে বিসিসিআই নির্দেশ দেয়, মুস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দিতে হবে। কারণ হিসেবে দেখানো হয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ ও পরিস্থিতির কথা। অথচ যুক্তিসংগত কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই একজন ক্রিকেটারকে এভাবে বাদ দেওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হয়েছে। ভারতের ক্রিকেট মহলেও অনেকে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশের একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা একটি দেশ পুরো একটি টুর্নামেন্টে বিদেশি দলগুলোর নিরাপত্তা কীভাবে দেবে? সংস্কৃতির অঙ্গনেও একই রকম অস্বস্তির খবর এসেছে বারবার। বাংলাদেশে আসতে চাওয়া ভারতীয় শিল্পীদের অনুষ্ঠান শেষ মুহূর্তে আটকে যাওয়ার ঘটনা যেমন ঘটেছে, তেমনি সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশী পরিচয় নিয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পরিচিত মুখদেরও নানা সময়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা, বাড়তি জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা সন্দেহের চোখে দেখার অভিজ্ঞতার কথা অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেছেন। একটার পর একটা ঘটনা মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এগুলো সব বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং একটি প্যাটার্ন। বাংলাদেশীরা ভারতে গেলে এতটা অনিরাপদ বোধ করবেন কেন? ইউরোপ কিংবা আমেরিকার পর্যটকদের ক্ষেত্রে তো এমন হোটেল বয়কট, সীমান্তে হয়রানি কিংবা খেলার মাঠ থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা ঘটে না। তাহলে বাংলাদেশীদের বেলায় ব্যতিক্রম কেন? নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে একটি হোটেল কীভাবে অতিথি নেয়, সেই জবাবদিহিতাও কারও কাছে নেই। আর কূটনৈতিক পর্যায়ে ভারত যখন বারবার তারেক রহমান ও বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে কথা বলছে, তখন সাধারণ বাংলাদেশী পর্যটক, শ্রমিক বা রোগীর নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব আসলে কার—সেই প্রশ্নেরও কোনো স্পষ্ট জবাব এখনো নেই। অতিথি যদি সত্যিই ভগবান হন, তাহলে কলকাতায় সেই অতিথির জীবনের দাম এত সস্তা কেন?
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

TrendingBuzz24.com হলো একটি বাংলা ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল, যেখানে দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিনোদন, খেলাধুলা এবং ভাইরাল ট্রেন্ড দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়।
No comments
Post a Comment