মনিরুল ইসলামের দ্বিচারিতা, উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে

0


 মাসুদা ভাট্টির ইউটিউব চ্যানেলে দেখলাম সাবেক বিশেষ শাখার প্রধান মনিরুল ইসলামের সাক্ষাৎকার। সেখানে তিনি দাবি করেছেন, সেনাবাহিনী আওয়ামী লীগকে মাঠে নামতে দেয়নি। কার্ফু বাস্তবায়ন করলে আওয়ামী লীগের সমাবেশ বাধাগ্রস্ত হবে বলে সম্মেলন ডেকেও স্থগিত করা হয়। তার ভাষায়, “যদি আওয়ামী লীগ মাঠে থাকতো, তাহলে ৫ আগস্ট ঘটতো না।”

এই বক্তব্যের সূত্র ধরেই প্রশ্ন উঠছে—যদি সেনাবাহিনী এতটাই অবিশ্বস্ত বা বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সরকার পতনের দিনে মনিরুল নিজে কেন সেই সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নেন? আর কেনই বা পরে আত্মগোপনে চলে যান?

### আওয়ামী লীগ মাঠেই ছিল- 

বাস্তবতা ভিন্ন। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ সক্রিয় ছিল। পুলিশ, র‌্যাব ও আওয়ামী সমর্থকরা মিলে আন্দোলনকারীদের মোকাবিলা করেছে। গুলি, হামলা, গ্রেপ্তার—সবই ঘটেছে। মনিরুল নিজেই তখন এসবি প্রধান হিসেবে গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও অপারেশনের কেন্দ্রে ছিলেন। ছাত্র-জনতার বিস্ফোরণ যখন শহরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন শুধু “মাঠে নামা”র অজুহাত দিয়ে পতন ঠেকানো যেত না। বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নির্ভরতা এবং জনরোষের তীব্রতাই আওয়ামী লীগের পতন ত্বরান্বিত করে। আওয়ামী লীগ মাঠে থেকেও ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ঠেকাতে পারেনি—এটাই প্রকৃত ঘটনা।

### সেনাবাহিনীকে দোষ দিয়েও আশ্রয় কেন? 

মনিরুলের বক্তব্যে সেনাবাহিনীর “ডিপ স্টেট” বা অসহযোগিতার ইঙ্গিত রয়েছে। কিন্তু ৫ আগস্ট দুপুর-বিকেলের দিকে পরিস্থিতি ভেঙে পড়লে আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ মনিরুলকে সেনা হেলিকপ্টারে তুলে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। আইএসপিআর-এর প্রকাশিত তালিকায় স্পষ্ট—৬২৬ জনের মধ্যে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অন্যতম তিনিও সেনানিবাসে আশ্রয় নেন। প্রাণ রক্ষার মানবিক কারণ দেখানো হলেও, প্রশ্ন থেকেই যায়: যে বাহিনীকে তিনি এখন “কথা রাখেনি” বা বাধা হিসেবে চিত্রায়িত করছেন, সেই বাহিনীর ছায়ায়ই তিনি নিরাপত্তা খুঁজেছিলেন।

সেনাবাহিনী যেখানে গুলি না চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, সেখানে পুলিশ যদি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকতো তাহলে আরও কয়েক হাজার প্রাণহানি ঘটতে পারতো—এমন বাস্তবতাও উঠে আসে। মনিরুলের বক্তব্যে যেন সেনাবাহিনীর “গুলি না করার” বিষয়টিকেই দুঃখের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ নিজে সেই বাহিনীর আশ্রয়ে গিয়েছেন।

### মনিরুল কেন পালিয়ে গেলেন? 

সরকার পতনের পর মনিরুল প্রথমে জঙ্গি ভয়ে আত্মগোপনের কথা বলেন। পরে বিভিন্ন প্রতিবেদনে তার দেশত্যাগের খবরও আসে। তিনি নিজে দাবি করেন দেশেই আছেন, কিন্তু দীর্ঘদিন দৃশ্যমান ছিলেন না। যদি সেনাবাহিনীর ওপর অবিশ্বাসই এত গভীর হয়, তাহলে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে কেন আরও নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে হয়? উত্তর সহজ—জুলাই-আগস্টের দমন-পীড়নে তার ভূমিকা নিয়ে জবাবদিহিতার ভয়। গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে তিনি যেসব অপারেশন ও নির্দেশনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, ধরা পড়লে সেসব অপকর্মের জবাব দিতে হতো। 

মনিরুলের সাক্ষাৎকারে গোয়েন্দা সতর্কবার্তা, বিদেশি হস্তক্ষেপ বা অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের কথা এসেছে। কিন্তু সেসব সতর্কতা থাকার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার দায় শুধু সেনাবাহিনীর ঘাড়ে চাপানো যায় না। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিজস্ব ব্যর্থতাও ছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা—ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান কোনো একক বাহিনীর সিদ্ধান্তে থেমে যায়নি। এটি ছিল ব্যাপক জনরোষের ফল।

যে ব্যক্তি নিজে সেনাবাহিনীর ছায়ায় প্রাণ বাঁচিয়েছেন, তিনিই এখন সেই বাহিনীকে পতনের মূল কারণ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। এই দ্বিমুখী অবস্থানই ন্যারেটিভের দুর্বলতা প্রকাশ করে। এর মূল কারণ তারা যতটা না রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছিলেন তার থেকেও বেশি আওয়ামী লীগ হয়ে উঠেছিলেন। এজন্যই গণঅভ্যুত্থানের বিপরীতে আওয়ামী লীগের পতনের কথাই মাথায় আসছে। 

আওয়ামী লীগ মাঠে ছিল, পুলিশ সক্রিয় ছিল, তবুও ৫ আগস্ট হয়েছে। কারণ জনতার ঢেউ তখন রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। মনিরুলের বক্তব্য সেই বাস্তবতাকে আড়াল করতে চায়, কিন্তু তার নিজের আশ্রয় গ্রহণের ঘটনাই সেই আড়াল ভেঙে দেয়।

No comments

Post a Comment

© all rights reserved
made with by templateszoo