কারা অধিদপ্তরের নাম পরিবর্তন: শাস্তির কারাগার থেকে সংশোধনের প্রতিষ্ঠানে সরকারের যুগান্তকারী সংস্কার

0

কারা অধিদপ্তরের নাম পরিবর্তন: শাস্তির কারাগার থেকে সংশোধনের প্রতিষ্ঠানে সরকারের যুগান্তকারী সংস্কার

বাংলাদেশ জেল বা কারা অধিদপ্তরের নাম পরিবর্তন করে ‘কাস্টোডিয়াল অ্যান্ড কারেকশনাল সার্ভিস বাংলাদেশ’ করার উদ্যোগ বর্তমান সরকারের আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থা সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শুধু নাম বদল নয়। এটি কারা ব্যবস্থাপনাকে শাস্তিমূলক কাঠামো থেকে নিরাপদ হেফাজত, সংশোধন, দক্ষতা উন্নয়ন ও সমাজে পুনর্বাসনের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের ঘোষণা।

কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন ১৮ আগস্ট ২০২৬ কারা অধিদপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, কারাগারকে আর কেবল আটকের স্থান হিসেবে দেখা হবে না। নতুন দর্শনে জোর দেওয়া হচ্ছে নিরাপত্তা, মানবিকতা, প্রশিক্ষণ ও বন্দির সমাজে ফিরে আসার ওপর। এ লক্ষ্যে ‘কাস্টোডিয়াল অ্যান্ড কারেকশন সার্ভিস অ্যাক্ট’-এর খসড়াও অনুমোদনের জন্য পেশ করা হয়েছে।

সরকারের সংস্কার এজেন্ডার সঙ্গে সামঞ্জস্য: 

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেবামুখী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার ওপর জোর দিয়েছে। পুলিশকে ‘সার্ভিস নট ফোর্স’ হিসেবে দেখার ধারাবাহিকতায় কারা বিভাগকেও সংশোধনমূলক সেবায় রূপান্তরের এই পদক্ষেপ সময়োপযোগী।

কারা ব্যবস্থাপনায় যেসব বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে এই নাম পরিবর্তন অর্থবহ:

- জনবল সংকট মোকাবিলায় ১ হাজার ৮৯৯টি নতুন পদ অনুমোদন এবং আরও ১ হাজার ৫০০ পদের প্রস্তাব। নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হচ্ছে।

- ধারণক্ষমতা বাড়াতে দুটি কেন্দ্রীয় ও চারটি জেলা কারাগার চালু।

- মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে ক্যাশলেস ব্যবস্থা চালু করে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি।

- বন্দিদের ৩৯টি পেশায় প্রশিক্ষণ, ক্রীড়া-সংস্কৃতি, ধর্মীয় শিক্ষা ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সংশোধন ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ।

- পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে ভিডিও কল সুবিধা।

- প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা—এআই ভিত্তিক সিসিটিভি, বডি স্ক্যানার, লাগেজ স্ক্যানার, মোবাইল ডিটেক্টর ও জ্যামিং ব্যবস্থা।

- স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ।

- বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ উন্নয়নের কাজ।

এসব পদক্ষেপে সরকার শুধু প্রতীকী পরিবর্তন করেছে তা নয়, বরং কাঠামোগত সংস্কারেও মনোযোগ দিয়েছে। 

কেন এটি কৃতিত্ব হিসেবে গণ্য? 

পুরনো কারা ব্যবস্থা মূলত শাস্তি ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক ছিল। নতুন নাম ও আইনি কাঠামো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে মিল রেখে বন্দিকে সংশোধন করে সমাজে ফিরিয়ে আনার দিকে জোর দিচ্ছে। এতে পুনরপরাধ কমানো, বন্দির মানবিক মর্যাদা রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়।

প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিও বদলাবে। ‘জেল’ শব্দটি যে নেতিবাচক ধারণা বহন করত, ‘কাস্টোডিয়াল অ্যান্ড কারেকশনাল সার্ভিস’ সেটিকে সেবা ও সংশোধনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করে। কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত মর্যাদা ও দায়িত্ববোধ বাড়ানোর এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।

সরকারের বৃহত্তর আইনশৃঙ্খলা সংস্কারের অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। জনবল বৃদ্ধি, প্রযুক্তি ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও পুনর্বাসনমুখী কার্যক্রম একসঙ্গে এগোলে নাম পরিবর্তন কেবল কাগজে থাকবে না—বাস্তবেও কারা ব্যবস্থা বদলাবে।

এটি বর্তমান সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য সংস্কার উদ্যোগ। শাস্তির কারাগার থেকে সংশোধনের প্রতিষ্ঠানে উত্তরণের এই পদক্ষেপকে যুগান্তকারী বলা যায়।

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team