জালিয়াতির অভিযোগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের পদত্যাগ; ব্যক্তিগত অভিযোগের বাইরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির প্রশ্ন

0

জালিয়াতির অভিযোগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের পদত্যাগ; ব্যক্তিগত অভিযোগের বাইরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির প্রশ্ন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ২০২৪ সালের শুরুতে পাঁচ বছরের মেয়াদে এই পদে দায়িত্ব নেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাঁকে বেতনহীন প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানো হয়। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তিনি মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। Reuters সেই চিঠি দেখেছে।

পদত্যাগের আগের দিন, ৮ সেপ্টেম্বর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সদস্যরাজ্যগুলোর আঞ্চলিক কমিটি বদ্ধ দরজার বৈঠকে তাঁর নিয়োগ বাতিলের সুপারিশ করে। সেই সুপারিশ পরের ধাপে নির্বাহী বোর্ডে যাওয়ার কথা ছিল। অর্থাৎ পদত্যাগ এসেছে অপসারণের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হওয়ার পর। সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, নতুন আঞ্চলিক পরিচালকের মনোনয়ন অক্টোবরে ঘোষণা করে জানুয়ারিতে নির্বাচন করার পরিকল্পনা ছিল।

অভিযোগ কী, অস্বীকার কেন করছে সায়মা?

Reuters-এর প্রতিবেদন ও আইনজীবীদের ৩ জুলাই ২০২৬-এর চিঠি অনুযায়ী, WHO সায়মার বিরুদ্ধে তিন ধরনের অভিযোগ তুলেছে—চীন সফরসংক্রান্ত আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে ভুল তথ্য উপস্থাপন এবং বাংলাদেশে একটি জমির প্লট অবৈধভাবে অধিগ্রহণ।। চীন সফরের অভিযোগটি ৯০১ ডলারের ভ্রমণ বিলকে কেন্দ্র করে। সায়মার পক্ষ বলছে, এটি সহকারীর প্রশাসনিক ভুল। শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রশ্নে তিনি বলেন, এটি সম্মানসূচক ডক্টরেট এবং তিনি টেড্রোসকে জানিয়েছিলেন। জমির বিষয়ে তাঁর দাবি, WHO-তে যোগ দেওয়ার আগেই জমি পেয়েছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য আইনের আওতায় তিনি তার অধিকারী। তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

একই সময়ে বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশন ২০২৫ সালের মার্চে দুটি মামলা করে। একটি—WHO পদ পাওয়ার আবেদনে শিক্ষাগত ও পেশাগত তথ্যে মিথ্যা উপস্থাপন। দুদকের দাবি, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও ম্যানুয়াল পর্যালোচনার সঙ্গে যুক্ত থাকার যে দাবি করেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করেছে। অন্য মামলায় অভিযোগ, সুচনা ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন হিসেবে ব্যাংকগুলোর সিএসআর তহবিল থেকে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে। পূর্বাচল প্লট কেলেঙ্কারির মামলায় ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়।

পদত্যাগপত্রে সায়মা লিখেছেন, অঞ্চলের দেশগুলোকে সেবা দিতেই তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু মহাপরিচালক তাঁকে দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়ে চলেছেন বলে তিনি নেতৃত্বে আস্থা হারিয়েছেন। প্রায় এক বছর বেতন না পাওয়ায় আর্থিক অবস্থা অসহনীয় হয়ে উঠেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। Indian Express-কে তিনি টেড্রোসের বিরুদ্ধে হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ করেন এবং স্বাধীন তদন্ত না হওয়ার অভিযোগ তোলেন। অন্যদিকে Reuters-এর সূত্র বলছে, সংস্থা তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

হাসিনা কন্যা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে কলঙ্কিত করলো

ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্য বিব্রতকর—এতে সন্দেহ নেই। কারণ একজন বাংলাদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের স্বাস্থ্য সংস্থার তদন্ত এবং দেশের দুদকের তদন্ত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে পাশাপাশি উঠে এসেছে। ২০২৩ সালে এই পদে নির্বাচনের সময় থেকেই নেপোটিজম ও মায়ের প্রভাবের অভিযোগ ছিল। হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই অভিযোগগুলো আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফিরে এসেছে। ফলে প্রশ্ন কেবল একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণিত দুর্নীতি কি না—তা নয়; প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্রীয় প্রভাব দিয়ে আন্তর্জাতিক পদ পাওয়া এবং পরে সেই পদের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক দেশের ভাবমূর্তিকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করে।

তবে সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগ কেবল একটি আন্তর্জাতিক পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘটনা নয়। এটি গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত। আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশি প্রতিনিধির বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার দায় শেষ পর্যন্ত দেশের ভাবমূর্তির ওপরই পড়ে। হাসিনা কন্যার জন্য বাংলাদেশ আরও একবার হেয় হল। 

No comments

Post a Comment

© Trendingbuzz24.com all rights reserved
made with by Trendingbuzz Team